সুনীল অর্থনীতির বাস্তবায়ন চায় বাংলাদেশ

অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : আইনি লড়াইয়ে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলের ওপর বাংলাদেশ তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ বজায় রেখে সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত জীবিকা এবং কর্মসংস্থানের এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। দেশের উন্নয়নের এই উপাদান ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি নামে আখ্যায়িত।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত মহীসোপানের তলদেশে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার বিস্তৃত। মূল ভূখ-ের অবকাঠামোসহ সামুদ্রিক সম্পদ দেশটির জন্য আশীর্বাদ। যদি ১,১৮,৮১৩ কিলোমিটার এলাকার অব্যবহূত সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশেষত রফতানি, রেমিট্যান্স, সেবা, পর্যটন, সমুদ্র পরিবহন এবং জাহাজ নির্মাণ খাতে দ্রুত ত্বরণ সৃষ্টি হবে। সন্দেহ নেই, নতুন সমুদ্র অঞ্চল পেয়ে যথেষ্ট ভাগ্যবান দেশটি এবং এখানে বিনিয়োগ করার এখনই সময়।
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনাসমূহ পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে নিজস্ব সমুদ্র সীমার বাইরে বৈশ্বিক সমুদ্র-সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত অংশীদারিত্বের কথা তুলে ধরলো বাংলাদেশ।
শনিবার জাতিসংঘে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের জন্য আয়োজিত ‘সমুদ্রতলের সম্পদে টেকসই উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রাপ্ত সুবিধার ন্যায়সঙ্গত বণ্টন: স্বল্পোন্নত, ভূ-বেষ্টিত স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপ-রাষ্ট্রসমূহের সুযোগ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে একথা বলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা। সমুদ্র-তলদেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ ও স্বল্পোন্নত, ভূ-বেষ্টিত স্বল্পোন্নত এবং ক্ষুদ্র দ্বীপ-রাষ্ট্রসমূহের জোটের সভাপতিরা এই ব্রিফিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
সেখানে গভীর সমুদ্রে খনন নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক আইনগত কাঠামোর উন্নয়ন, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য চুক্তিবদ্ধকরণ এবং বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে স্বল্পোন্নত, ভূ-বেষ্টিত স্বল্পোন্নত ও ক্ষুদ্র দ্বীপ-রাষ্ট্রসমূহের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারে এমন সক্ষমতা বিনির্মাণে আইএসএ যে পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়ন করেছে তা সদস্য দেশসমূহের সামনে তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক সমুদ্রতলদেশ কর্তৃপক্ষের সেক্রেটারি-জেনারেল মাইকেল ডব্লিউ লজসহ ব্রিফটির অন্যান্য প্যানেলিস্ট।
রাষ্ট্রদূত ফাতিমা বলেন, বাংলাদেশ সমুদ্র সম্পদের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে আর সুনীল অর্থনীতি এক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সক্ষমতা বিনির্মাণ, জ্ঞান বিনিময়, বিশেষ করে প্রশিক্ষণ, বিকল্প কারিগরি কর্মী তৈরি, গবেষণা ও অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টিসহ এসব বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে সহযোগিতা পায় তার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি।
উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে সমুদ্র-সম্পদ আহরণ করে তাদের কাজে লাগাতে পারে সে লক্ষ্যে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, সমুদ্র অর্থনীতির ধারণায় সাগর ও মহাসাগর হলো ‘উন্নয়ন অঞ্চল’, যেখানে সম্পদ সংরক্ষণ, জীবিত সম্পদের টেকসই ব্যবহার, তেল ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন, জৈব সম্ভাবনা, টেকসই জ্বালানি উৎপাদন এবং সমুদ্র পরিবহনকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত পরিকল্পনা করা হয়। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ ২০১৪ সালে সমুদ্র সম্পদকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করে। সামুদ্রিক অঞ্চলের ব্যবহার নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ, টেকসই প্রবৃদ্ধির সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান হয়নি। যদিও আমাদের পর্যাপ্ত মানবসম্পদ রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণে সক্ষমতা আছে। আছেন বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা শ্রেণি। এ ছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে।
বিশ্বখ্যাত ইকোনমিস্ট সাময়িকীর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (২০১৫) মতে, ব্লু-ইকোনমি হলো টেকসই সমুদ্র অর্থনীতি, যেখানে সমুদ্রকে প্রাণবন্ত ও সুস্থ রাখতে সহায়তা করতে এর ইকো-সিস্টেমের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার সঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ভারসাম্য রাখতে হয়। বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতি এর ব্যতিক্রম নয়। এর সাগরের নীল পানির নিচে রয়েছে ব্যাপক সম্পদ। এই সম্পদের ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য দরকার জরুরি নীতি সহায়তা। বর্তমানে আমাদের আমদানি ও রফতানির ৯৫ শতাংশই হয় দুটি সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে। দুটি বন্দরই বঙ্গোপসাগরের পাশে, যা পৃথিবীর ৬৪টি সাগরের মধ্যে বৃহত্তম। প্রায় ১৪০ কোটি লোক বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলে বাস করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বসবাস সমুদ্র উপকূল অঞ্চলে এবং প্রায় তিন কোটি মানুষ মৎস্য আহরণ ও পরিবহনের সঙ্গে জড়িত।
বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন (২০১৮) অনুযায়ী আমাদের সমুদ্র দেশের অর্থনীতিতে মোট মূল্য সংযোজনে ৬.২ বিলিয়ন ডলার বা জিডিপিতে ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। এ অর্থনীতি মূলত পর্যটন ও বিনোদন (২৫ শতাংশ), মৎস্য আহরণ ও অ্যাকুয়াকালচার (২২ শতাংশ), পরিবহন (২২ শতাংশ) এবং তেল ও গ্যাস উত্তোলন ( ১৯ শতাংশ) নিয়ে গঠিত। মৎস্য আহরণ ও অ্যাকুয়াকালচারে পূর্ণ ও খ-কালীন মিলিয়ে ১৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। অন্যদিকে লবণ উৎপাদন ও জাহাজ ভাঙা শিল্পে নিয়োজিত আছে প্রায় ৬০ লাখ লোক। বৈশ্বিক ঋণদাতা এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেশকে সমুদ্র অর্থনীতিমুখী করতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কৌশলগত উদ্যোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সমুদ্র সম্পদ আহরণের পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
আমাদের দরকার বিস্তৃত গবেষণা এবং অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ জনবল। পাশাপাশি যথোপযুক্ত নীতি সহায়তা ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন। বর্তমানে সমুদ্র বিজ্ঞান ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ওপর সরকারের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে সুযোগ কাজে লাগানো বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে সুবর্ণ সুযোগ। বাংলাদেশ সমুদ্র অর্থনীতিকে দেশের টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হতে দেশকে এগিয়ে নেবে সমুদ্র অর্থনীতি।