জেকেজির প্রতারণা

অপরাধ আইন ও আদালত সাস্থ্য

বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিনামূল্যে বুথ থেকে করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করার কথা থাকলেও অনুমোদন ছাড়াই বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগে আটক করা হয় জেকেজি হেলথ কেয়ারের সিইও আরিফুল হক চৌধুরীসহ পাঁচজনকে। এরপর একে একে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে।
সূত্রমতে, এপ্রিল মাসে দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার জন্য অনুমতি পায় জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা বা জেকেজি হেলথ কেয়ার। নমুনা পরীক্ষায় টেকনোলজিস্ট ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণের জন্য তাদের রাজধানীর তিতুমীর কলেজে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জায়গা করে দেয়া হয়। ১২ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জেকেজির প্রস্তুতি দেখতেও যান তিতুমীর কলেজে। তিতুমীরে ছিলেন জেকেজির অন্তত ২০০ কর্মী।
অভিযোগ রয়েছে, তিতুমীরে আসার পর শুরু থেকেই মাদকের আকড়া গড়ে তোলেন আরিফুল ও সহোযোগীরা। চলতো উচ্চ শব্দে নাচ-গান। মুসলিম প্রধান দেশেও তারা রমজানের কোনো বিধিনিষেধ না মেনে রোজার সময়ে কমপক্ষে দশটি সাউন্ড বক্স বাজিয়ে গানের সাথে সাথে নানান ভঙ্গিতে অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শন করতো। যা নিয়ে স্থানীয়রা কয়েকবার অভিযোগ করলেও আরিফুলের ভাড়াটে ক্যাডারদের ভয়ে তারা কিছু করতে পারেননি। প্রশাসনকে সে সময় জানালেও মহামারির দোহাই দিয়ে তারা মাপ পেয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে জেকেজির কথিত স্বাস্থ্যসেবা দিতে আসা মেয়েরা অশালীন পোশাক পরে ঘুরে বেড়াতো। তিতুমীরের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীরা এ বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো তাদের ওপর হামলা চালায় আরিফুল চৌধুরীর ভাড়াটে ক্যাডার বাহিনী।
গ্রেপ্তারের পর আরিফুল হক চৌধুরীকে ছাড়িয়ে নিতে তার এই ভাড়াটে ক্যাডারটা থানায়ও হামলা চালায়। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের লাঞ্চিত করে। এছাড়া আরিফ রিমান্ডে থাকা অবস্থায় নেশার জন্য ‘ইয়াবা’ চান আরিফ।
সূত্রমতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি জায়গায় বুথ করার কথা থাকলেও মাত্র ৭টি জায়গায় বুথ স্থাপন করে জেকেজি। অভিযোগ রয়েছে এসব বুথ থেকে কোনো ধরনের নমুনা নিতেন না তারা। তাদের কোনো ল্যাবও ছিলোনা। বরং তারা আলাদা ৬টি টিম করে বিভিন্ন সময়ে বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহ শুরু করে। এই টিমের সদস্যা দিনে ১০০ থেকে ১৫০ নমুনা সংগ্রহ করতো বাসা থেকে। এর জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেয়া হতো ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। আর প্রবাসীদের কাছ থেকে নেয়া হতো ১০০ ডলার।
অভিযোগ রয়েছে আরিফুল চৌধুরীর স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর বিরুদ্ধেও। সূত্রমতে, স্বামীর সব ধরনের অপকর্মে শুরু থেকে সহায়তা করে আসছিলেন এই নারী কার্ডিয়াক সার্জন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি কথিত এই স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এছাড়া তিতুমীরের হামলায় সময়ে আরিফুলের ক্যাডারদের হামলায় উৎসাহ দিয়েছেন তিনি।
তবে, সাবরিনা আরিফ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি জানান এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত দুই মাস ধরে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, আমাকে জড়িত করা হবে কেনো? আমি তো অনেকদিন ধরেই এর সাথে নেই।
অভিযোগ রয়েছে সেবা দিতে আসলেও মাঝে মাঝেই নাঁচ-গানের আসর জমাতো জেকেজির স্বাস্থ্যকর্মীরা। উচ্চশব্দে বাজতো সাউন্ড বক্স। স্থানীয়রা এ বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ দিলেও কোনো লাভ হয়নি।
অথচ এ মাসের শুরুর দিকে যখন তিতুমীরের ৪র্থ শ্রেণির কর্মীদের ওপর আরিফুলের ক্যাডাররা হামলা চালায় তখন নিজেকে জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতেন সাবরিনা আরিফ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেকেজি হেলথকেয়ারের অনুমতি পাওয়া থেকে শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকা-েও জড়িত এই চিকিৎসক। এ বিষয়ে খোদ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নানা রকম অভিযোগ করেছেন।
সূত্র মতে, আরিফ খারাপ ব্যবহার করলেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই মামলা তদন্ত করছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন হুমায়ুন নামে জেকেজির এক কর্মকর্তা। নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) জাল সনদ বানানো, নমুনা সংগ্রহ করে তা ফেলে দেয়া ও বাসায় গিয়ে অনৈতিকভাবে নমুনা সংগ্রহ করার তথ্য তিনি এরইমধ্যে স্বীকার করেছেন।
জেকেজির আরেক কর্মকর্তা সাঈদ চৌধুরী আরিফুল হকের মাদকাসক্ত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে জানিয়ে সূত্র বলে, আমরা অভিযানে গিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ারের কার্যালয়ে করোনা সনদ জাল করার বিভিন্নরকম প্রামাণিক দলিল ছাড়াও ইয়াবা খাওয়ার সরঞ্জামাদি পাই। তার আচরণ এতটাই ঔদ্ধত্যপূর্ণ যে তার সঙ্গে সেলে যদি কাউকে রাখা হয় তবে তার সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন।
এ বিষয়ে তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদ বলেন, আমরা যাদের প্রথমে আটক করি তারা বাসায় গিয়ে অনৈতিকভাবে নমুনা সংগ্রহ করার বিষয়টি স্বীকার করে। এ ব্যবসা করতে গিয়ে তারা যে করোনার জাল সনদ বানাতো তাও স্বীকার করে। তারা এ বিষয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তারা বলে আরিফুল হক চৌধুরীর অফিসে তারা গ্রাফিক্সের কাজ করত। সেখান থেকেই তারা জাল সনদ বানাতো।
তিনি বলেন, তাদের আটক করার পর থেকেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে থাকে। প্রথমে ছয় থেকে সাতটা মাইক্রোবাস এসে তারা সিনক্রিয়েট করার চেষ্টা করে। অপরাধী তো অপরাধীই। তাই এসব বিষয় আমরা তেমন গুরত্ব দিচ্ছি না। তারা যে ধরনের প্রতারণা করেছে সেটি নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আর এজন্য তাদের আমরা রিমান্ডে নেয়ার জন্য আবেদন করি। সেই রিমান্ডে এসেও আরিফুল হক চৌধুরী হাজতখানার লাইট ভেঙে ফেলে, সিসি টিভি ভেঙে ফেলেছে। তাও আমরা ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
তদন্তের স্বার্থে ইয়াবা চাওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও হারুন অর রশীদ বলেন, ‘যেহেতু এটা একটা তদন্তাধীন বিষয় তাই এই মুহূর্তে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে সে মাদকাসক্ত এ বিষয়টি তার এক সহকর্মী স্বীকার করেছে।’
তিনি বলেন, ‘তারা করোনা পরীক্ষা করবে বলে অনেকের কাছ থেকে ল্যাপটপ, কম্পিউটার নিয়েছে। সেগুলো আর ফেরত দিচ্ছে না। তারাও আমাদের কাছে বিচার দিয়েছে। আমরা সেগুলো নিয়েও কাজ করছি, তদন্ত করে যাচ্ছি।’
জেকেজি হেলথকেয়ারের এই অনৈতিক কাজে যাদের যাদের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া হবে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান হারুন অর রশীদ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই কার্ডিয়াক সার্জন ও ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর উদ্যোগেই মূলত জেকেজি হেলথকেয়ার বুথ স্থাপনের কাজ পায়। তবে পরবর্তীতে তাদের সম্পর্ক নিয়ে আরিফুল চৌধুরী আপত্তি জানালে সেখানেই শুরু হয় টানাপোড়েন। আর এসব বিষয়ে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই একাধিক অভিযোগ যায়।
কিন্তু সরকারি চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, আমরা যারা সরকারি হাসপাতালে চাকরি করি তারা কোনোভাবেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে থাকতে পারি না। কিন্তু হাসপাতালের একজন রেজিস্ট্রাড চিকিৎসক হয়ে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী কিভাবে এই পদের পরিচয় দিতেন বা চেয়ারম্যান পদে থাকেন তা বোধগম্য না।
ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর কাছে তিতুমীর কলেজের হামলার সময় তিনি সেখানে ছিলেন কিন্তু দুইমাস ধরে নেই কেন দাবি করছেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিতুমীরের ঘটনার পর থেকে আমি আর এর সঙ্গে নেই। আমার স্বামীর এর অন্যতম কর্ণধর হলেও আমি এর সাথে নেই। আমি যে এর সাথে নেই সেটা সংশ্লিষ্ট অনেকেই জানেন। আমি অনেককে এটা জানিয়ে রেখেছি। আমি দুইমাস ধরে আমার বাবার বাসায় অবস্থান করছি। আমি আসলে দুইমাস ধরেই নাই। কিন্তু তিতুমীরে যখন ঘটনাটা ঘটে আমি সেখানে যাই। কারণ এই স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে আমি ট্রেনিং দিয়েছিলাম। তাই তাদের সাথে একটা ঘটনা শুনতে পেরে আমি ছুটে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখনও আমি আমার বাবার বাসায় ছিলাম।