কৃত্রিম সঙ্কটে আহাজারি!

এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন সারাদেশ সাস্থ্য

আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় বাড়তি সতর্কতা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর রোগীদের অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে শ্বাসকষ্ট অন্যতম। যেসব রোগীর শ্বাসকষ্ট সহনীয় মাত্রায় থাকে, তাঁদের শ্বাস গ্রহণের জন্য অক্সিজেন নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যাঁদের শ্বাসকষ্টের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তাঁদের শ্বাসযন্ত্র সচল রাখতে বাইরে থেকে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হয়। এটি কেবল করোনায় আক্রান্ত রোগী নন, আরও অনেক গুরুতর রোগীর জন্য অক্সিজেন সরবরাহ জরুরি হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত তিন হাজারের বেশি রোগীর আইসিইউ সহায়তা দরকার, কিন্তু শয্যা আছে মাত্র ৩৯৯টি। আছে অক্সিজেন সরঞ্জামেরও অভাব।
অক্সিজেন এবং করোনাকালীন ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে লিগ্যাল নোটিস দেয়া হয়েছে। গত বুধবার সুপ্রিম কোর্ট বারের অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান লিংকন এ নোটিস দেন। নোটিসের প্রাপক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি), ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) মহাপরিচালককে (ডিজি)।
নোটিসে দেশের এই দুর্যোগকালে অক্সিজেনসহ ওষুধের সরবরাহ বন্ধ রেখে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এতে বলা হয়, আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে মেডিক্যাল অক্সিজেনসহ ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে এবং এর কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেনÑ অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান লিংকন বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে। দিনে দিনে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই রোগীদের বিভিন্নভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা দেয়ার জন্য সরকার সার্বিক প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমাদের দেশে অধিক জনসংখ্যার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। তার ওপর করোনা দুর্যোগে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুনভাবে সংক্রমিত হচ্ছে তাদের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো হিমশিম খাচ্ছে।
সংবাদ মাধ্যমের তথ্য হচ্ছে, করোনা চিকিৎসার জন্য বহুল ব্যবহৃত মেডিক্যাল অক্সিজেন এবং এই সংক্রান্ত ওষুধের বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছে। ওষুধগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। যা করোনায় বিপর্যস্ত মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা বহুগুণে বাড়ছে।
করোনা মোকাবেলা এবং করোনা মহামারী রোধে সরকারের সার্বিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এক শ্রেণীর মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী তাদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এই দুর্যোগকালীন সময়ে ওষুধের বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। তাদের ওষুধের দাম বৃদ্ধি করার কারণে এই করোনা দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষ অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
কৃত্রিম শ্বাস নেয়ার সর্বশেষ পন্থা আইসিইউ। করোনাভাইরাস সংক্রমণে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের কদর বহুগুণ। মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে ভেন্টিলেটরযুক্ত আইসিইউ শয্যার জন্য সে কী আকুতি-আহাজারি, গত দুই মাস ধরে প্রত্যক্ষ করছে চট্টগ্রামবাসী। নগরীর মাত্র দুটি সরকারি হাসপাতালে রয়েছে এই আইসিইউ সুবিধা। এরমধ্যে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১০টি আর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র। তবে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে চমেক হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার দ্বারই খোলা ছিল না। একইভাবে নগরীর ১৫টি হাসপাতাল শতাধিক আইসিইউ শয্যা থাকলেও করোনা আক্রান্ত সন্দেহে তাদের দরজা এখনো পর্যন্ত বন্ধ। আইসিইউ সংকটে শ্বাসকষ্ঠ নিয়ে করোনা আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর মিছিল শুরু হলে মে মাস থেকে করোনা চিকিৎসার জন্য ১০০টি শয্যা বরাদ্দ দেয়া হয় চমেক হাসপাতালে।
এরমধ্যে ৫টি আইসিইউ শয্যাও রয়েছে। নগরীর প্রভাবশালী শিল্প প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলম করোনায় আক্রান্ত হন মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। শ্বাসকষ্ঠ নিয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ২২ মে রাতে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। একইভাবে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে যাদের ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর ব্যবহার করতে হয়েছে, তাদের কাউকেই বাঁচানো যায়নি বলে জানিয়েছেন জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডের ডা. গোলাম মোস্তফা জামাল। তিনি বলেন, সাধারণত গুরুতর রোগীদেরই আইসিইউতে নেয়া হয়। জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করছেন এমন একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ পর্যন্ত যতজনকেই ভেন্টিলেটর লাগাতে হয়েছে তাদের একজনও ফিরেননি। এক্ষেত্রে আইসিইউতে যাদের আমরা হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানোলা দিয়ে অক্সিজেন দিতে পেরেছি এবং পাশাপাশি অন্যান্য সাপোর্টিং চিকিৎসা দিতে পেরেছি তারাই সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু যাদের অবস্থা এই পর্যায়ের চেয়ে অবনতি হয়েছে তাদের আর বাঁচানো যায়নি। কাজেই অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারাটাই এখনকার জন্য সবচেয়ে বড় সমাধান। শুধু অক্সিজেন সরবরাহ নয় বরং নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এই রোগে আক্রান্তদের সেবা দেয়া অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, একটা রোগীকে সারিয়ে তুলতে তাকে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে। কথা হলো সেটা কিভাবে করবেন আপনি? সিলিন্ডার দিয়ে করা যায়, আবার সেন্ট্রাল লাইন দিয়েও করা যায়। তবে সিলিন্ডারের অক্সিজেন দিয়ে বেশি চাপে অক্সিজেন দেয়া সম্ভব না।