অধরা সাহেদ সমীকরণ!

অপরাধ আইন ও আদালত এইমাত্র জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভিআইপি প্রতারক সাহেদ এখনো অধরা। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যাকে ধরতে সব কৌশলেই প্রয়োগ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রতারক সাহেদের বিরুদ্ধে গত ৬ জুলাই রাতে অভিযান পরিচালনা করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা র‌্যাব। প্রতারণা করে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার কারণে তাঁর মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা করা হয়েছে, তাঁর অফিস সিলগালা করা হয়েছে এবং গত বৃহস্পতিবার তাঁর ব্যাংক একাউন্টও জব্দ করা হয়েছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বলছে যে, তাঁর দেশত্যাগের ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু অধরা সাহেদ কোথায় আছে এই নিয়ে নানারকম প্রশ্ন এবং সমীকরণ চলছে। অবশ্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, সাহেদকে ধরার সর্বাত্মক চেষ্টা তাঁরা করে যাচ্ছেন এবং যেকোন সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।
সহায়-সম্পদ ও নিজেকে রক্ষায় হাইপ্রোফাইল তদবির করেছিলেন প্রতারক সাহেদ। মন্ত্রী থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের কাছে ফোন করে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলেন। তবে কোন তদবিরই কাজে আসেনি। উল্টো ফেঁসেই গেছেন তিনি। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার তোলা ছবি ভেসে আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। চলছে নানামুখী আলোচনা সমালোচনা। অভিযানের সাত দিন অতিবাহিত হলেও প্রতারক সাহেদ এখনো রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গোয়েন্দা তদন্তে বেরিয়ে আসছে সাহেদের নানা প্রতারণা। তবে সাহেদকে সমাজসেবক ভাবতেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
জানা গেছে যে, সাহেদ সর্বশেষ হাসপাতালে অভিযানের রাতে ফোন করেছিলেন তাঁর স্ত্রীকে এবং সেসময় তিনি তাঁর স্ত্রীকে বলেছেন যে, রাতে ফিরবো না, যেখানে আছি সেইফ আছি। ৬ জুলাই রাতে যখন রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখায় অভিযান চালানো হয় সেইসময় সাহেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে টেলিফোন করেছিলেন বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে বলেছেন যে এই ব্যাপারে তাঁর কোন করণীয় নেই। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মূলধারার গণমাধ্যমে সাহেদের বেশকিছু ছবি ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, সাহেদ অনেক হোমরাচোমরা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন এবং তাঁদের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, প্রতারকরা এই সমস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে অন্যদেরকে প্রভাবিত করেন এবং প্রভাবশালীরা বড় কোন অনুষ্ঠানে এরকম কোন ছবি তুলতে অনুরোধ করলে না করেন না। সাহেদও প্রতারণার জাল বিস্তীর্ণ করার জন্য তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন, তাঁদের ব্যবহার করেছেন।
বিশেষ করে বঙ্গভবনের বড় অনুষ্ঠানে সাহেদ আমন্ত্রিত হয়েছেন এবং সেখানে একজন নেতা বা একজন উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা কিভাবে বুঝবেন যে, এই ব্যক্তি একজন প্রতারক। তবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারাও অবাক হয়েছেন যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় তাঁকে একজন প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং এই প্রতারক থেকে সাবধান থাকার অনুরোধ করেছিল। সেই প্রতারক কিভাবে সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াল তাও এক বড় প্রশ্ন। তবে এইসব প্রশ্ন ছাপিয়ে সবথেকে বড় প্রশ্ন হচ্ছে সাহেদ এখন কোথায়? যেখানে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা অতিদ্রুততার সঙ্গে দুর্ধষ অপরাধীদের প্রেপ্তার করে। আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রভাবশালী ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট বা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার মতো নেতারা যেখানে চোখের নিমেষে গ্রেপ্তার হলেন সেখানে সাহেদকে গ্রেপ্তারে এত বিলম্ব কেন সেই প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারক সাহেদের অনেক পরিচয়। কখনো অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। কোথাও ক্যাডেট পাস করা সেনা পরিবারের সদস্য। কোথাও তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস (সহকারী একান্ত সচিব)। কোথাও তিনি সচিব। কোথাও গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ। আবার অনেকের কাছে তিনি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। কখনো তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। গত কয়েক বছর ধরে এমন নানা পরিচয়ে রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পরিচয়ের মতোই নামেও রয়েছে তাঁর বৈচিত্র্য। জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর নাম সাহেদ করিম থাকলেও কারাগার থেকে বেরিয়েই হয়ে যান মো. সাহেদ। আগে কারো কাছে তিনি ছিলেন মেজর ইফতেখার করিম। কারো কাছে পরিচয় দেন লে. কর্নেল মুহাম্মদ শহীদ নামে। এমন একাধিক নাম ও পরিচয়ের আড়ালে ‘সুশীল সমাজের’ মানুষ বনে যাওয়া এই প্রতারক মো. সাহেদই আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান। রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাহেদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৩২টি মামলা হয়েছে। কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি (কেকেএস) এবং ‘বিডিএস ক্লিক ওয়ান’ নামে এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) কম্পানি খুলে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ধানম-ি থানায় মামলা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খাটেন সাহেদ। জেল থেকে বেরিয়ে হাতিয়ে নেওয়া টাকায় রিজেন্ট গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে পাল্টে যান তিনি। নাম বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মিশনে নামেন তিনি। বিভিন্ন পরিচয়ে ধামাচাপা দেন অনেক অভিযোগ। আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা খুলে এবং কয়েকটি টিভির টক শোতে অংশ নিয়ে নিজেকে বড় সাংবাদিক বলে পরিচয়ও দিতে থাকেন।
র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের গাড়িতে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ও স্বাস্থ্য অধিপ্তরের স্টিকার লাগানো ছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনের চোখে ধুলো দিতেই ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্টিকার ব্যবহার করা হতো।’
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিএনপির আমলে হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ সাহেদ ভোল পাল্টে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। অনেক অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের অনেক অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যায়। কয়েক বছর ধরে তিনি একটি অপ্রচলিত সংবাদপত্রের মালিক ও সম্পাদক হয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে টিভি টক শোতে অংশ নিতে শুরু করেন।
রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এক জীবনে কোনো ব্যক্তি এত প্রতারণা করতে পারে তা অবিশ্বাস্য! বহুরূপী শাহেদ তার সাম্রাজ্য শাসনে ব্যবহার করেছেন সুন্দরী নারীদেরও। শাহেদের রক্ষিতা হিসেবে কাজ করে এমন পাঁচজন সুন্দরী নারীর তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। এর মধ্যে তিনটি নাম ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। তারা হলেন- তরুণী লিজা, সাদিয়া ও হিরা মণি।
সম্প্রতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তবে বাবার মরদেহ নিতে যাননি সাহেদ কিংবা পরিবারের কেউ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শাহেদের স্ত্রীর ফোন নম্বরে মারা যাওয়ার খবর জানান। পরে দুজন ব্যক্তি এসে মৃতদেহ নিয়ে যান। দুজনের কেউই তাদের পরিবারের সদস্য নন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শাহেদ বা তার প্রতিষ্ঠানের কাউকে খুঁজে না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছে। সমস্যা এড়াতে তারা জিডি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-এর মুখপাত্র সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, বাংলাদেশের হর্তা-কর্তা ব্যক্তিদের সাথে সে ছবি তুলেছে। এটা আসলে তার একটা মানসিক অসুস্থতা। এই ছবি তোলাকে কেন্দ্র করেই সে প্রতারণা করতো। মো: সাহেদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে র‌্যাব মুখপাত্র বলেন, প্রতারকদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তারা যখন যার নাম পারে তখন সেটা বেচে নিজের জীবনকে অগ্রগামী করার চেষ্টা করে। র‌্যাব কর্মকর্তা কাশেম বলেন, প্রতারণার মাধ্যমে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো: সাহেদ বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতারণাই ছিল তার প্রধান ব্যবসা।