রাজনৈতিক এক নেতাকে খুনের পরিকল্পনায় বোমা বিস্ফোরণ

অপরাধ আইন ও আদালত এইমাত্র রাজধানী

পল্লবী থানার পুলিশসহ আহত ৫
তিন ভাড়াটে খুনি গ্রেফতার

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর পল্লবী থানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশসহ পাঁচজন আহত হয়ছেন। আহতদের মধ্যে দুইজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। আর অপর তিনজন বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
বুধবার সকাল থেকেই পল্লবী থানা ভবনের ভেতরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যালেনে লাইভ সংবাদ পরিবেশন করা হয়। এরপর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে থানার ভেতরে বিস্ফোরণের ঘটনাটি জঙ্গি হামলা হতে পারে বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সাধারণ মানুষ আলোচনা করতে থাকে।
এদিকে থানা ভবনে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। বুধবার গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, এই ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা আছে। যাদের আটক করা হয়েছে তারা ডাকাত দলের সদস্য। তাদের কাছে থাকা কিছু একটার বিস্ফোরণ হয়েছে। তারপরও তদন্ত হবে। এরপর বিস্থারিত বলা যাবে।’
বুধবার সকাল সাতটার দিকে থানার ভেতর এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। আর বিস্ফোরণে আহত ব্যক্তিরা হলেন পল্লবী থানার পরিদর্শক (অভিযান) ইমরানুল ইসলাম, উপ-পরিদর্শক (এসআই) সজীব খান, উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুমি বেভরেজ হায়দায়, শিক্ষানবিশ সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) অঙ্কুর কুমার ও বেসামরিক ব্যক্তি রিয়াজুল ইসলাম। ইমরানুল ইসলামের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী।
ঢামেক হাসপাতাল ও পল্লবী থানা সূত্রে জানা গেছে, ইমরানুল ইসলামের বা পায়ের মাংস থেঁতলে গেছে। বোমা বিস্ফোরণে প্রচন্ড শব্দের কারণে কানে শুনতে পাচ্ছেন না সজীব খান। অঙ্কুশ কুমার বাঁ চোখে আঘাত পেয়েছেন। রুমি বেভরেজ হায়দায়ের শরীর ঝলসে গেছে। রিয়াজুল ইসলামের বা হাতের কবজি জখম হয়েছে। রুমি ও রিয়াজুল ইসলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর ইমরানুল ও সজীব ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। আহত অঙ্কুশ কুমার জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ব্লকের আবাসিক সার্জন আলাউদ্দিন গতকাল সকালে জানান, রুমির বাঁ হাতে স্পিøন্টারের আঘাত রয়েছে। রিয়াজুল ইসলাম হাতে আঘাত আছে। তার শরীরও ঝলে গেছে। ইমরানুলের পায়ে স্পিøন্টারের আঘাত ও সজীবের কানে শব্দের আঘাত লেগেছে। এ ছাড়া অঙ্কুশ কুমার চোখে আঘাত লেগেছে। তাকে জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। আহত সবাই আশঙ্কামুক্ত।
উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন বলেন, গত মঙ্গলবার রাতে পল্লবী থানার পুলিশ পল্লবী-কালশী কবরস্থান এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানে তিন ব্যক্তি গ্রেফতার হন। তাদের কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, চারটি গুলি ও একটি ডিজিটাল ওয়েট মেশিনের মতো ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। সেগুলো থানার ডিউটি অফিসারের রুমে রাখা হয়। বুধবার সকালে ডিজিটাল ওয়েট মেশিনের মতো ডিভাইসটি বিস্ফোরিত হয়। বোমা বিস্ফোরণে থানার দ্বিতীয় তলার একটি ঘরের জানালার কাচ ভেঙে যায়। ডিজিটাল ডিভাইসটির মধ্য বোমা রাখা ছিল। দুটি তাজা বোমা ছিল। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, শহীদুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন (২৬) ও রফিকুল ইসলাম।
ডিএমপির এক সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃত তিনজন শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত বাহিনীর সহযোগী। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, স্থানীয় এক রাজনীতিককে হত্যার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, গ্রেফতারকৃতরা জঙ্গি না এরা স্থানীয় সন্ত্রাসী। এ ঘটনায় জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমের স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের অতিরিক্ত উপকমিশনার রহমত উল্লাহ বলেন, বিস্ফোরণের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছেন। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) জাতীয় কিছু বিস্ফোরিত হয়েছে। অপরদিকে বিস্ফোরণের ঘটনার পর পল্লবী থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কয়েক ঘণ্টা পর থানায় জিডি বা মামলা নেওয়াসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানান পল্লবী থানার কর্তব্যরত উপ-পরিদর্শক আকলিমা খানম।
থানা কম্পাউন্ডের ভেতরে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়ে চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচ জন আহত হওয়ার পর আরেকটি অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয় করছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের উপ-কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আরেকটি আইইডি রয়েছে। আমরা সেটি নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছি। আগের আইইডিটি আমাদের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট আসার আগেই বিস্ফোরিত হয়েছে। আইইডির আদলে তৈরি হাতবোমাগুলো খুবই সাধারণ মানের। সন্ত্রাসীরা এসব কেন, কী উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিল তা জানার চেষ্টা করছে গোয়েন্দারা।
এর আগে থানায় বিকট শব্দে বোমা সদৃশ স্কচটেপ মোড়ানো বোতল দেখে রাজধানীর গুলিস্থানে বঙ্গবন্ধু স্কয়ারের পূর্ব পাশে পুলিশ বক্সের সামনে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বোমা সন্দেহে ওই এলাকা ঘিওে রেখে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেয়। ঘটনার দিন শনিবার সকাল ৯টার দিকে পুরো এলাকায় উত্তেজনার সৃস্টি হয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, পল্লবী থানা পুলিশ দু’টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ তিন সন্ত্রাসীকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। সন্ত্রাসীদের কাছে ওজন মাপার মেশিনের মতো একটা যন্ত্র ছিল। ওই যন্ত্রটি ডিউটি অফিসারের কক্ষে রাখা হলে তা বিস্ফোরিত হয়। আর আটক হওয়া সন্ত্রাসীরা ভাড়াটে খুনি। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল তারা পল্লবীর স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করবে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের পর বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, সাধারণ কোনও অপরাধীর এই ধরনের বোমা তৈরি করার কথা নয়। এসব বোমা জঙ্গি সদস্যরা তৈরি করে থাকে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে আসল রহস্য বের হয়ে আসবে।