ঢিমেতালে বাড়ছে সাক্ষরাতার হার

শিক্ষাঙ্গন

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে দেশ নিরক্ষরমুক্ত করতে হবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য থেকে অনেকটাই পিছিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত এক বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। সাক্ষরতা বাড়ানোর একমাত্র মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পটি অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সাক্ষরতার হার নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যেও এখনো বড় ফারাক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্টরা। অন্যদিকে প্রতিবছর সাক্ষরতার হার সংখ্যায় বাড়লে মান বাড়েনি বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। ফলে গতিহীন সাক্ষরতা কার্যক্রমে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার পরিকল্পনা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষ বিবেচনা করলে সাক্ষরতার ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী। তিনি বলেন, আমরা এখন যে তথ্য পাচ্ছি, সেটা খানা জরিপের তথ্য নয়। সাক্ষরতার হার ও সংজ্ঞা নিয়ে এখনো বিভ্রান্তি রয়েছে। ইউনেসকোর সংজ্ঞা অনুযায়ী যদি জরিপ করা যায়, তাহলে আমরা প্রকৃত চিত্র জানতে পারব। আমি বলব, সাক্ষরতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবদানই বেশি। প্রকল্প দিয়ে সাক্ষরতা বাড়ানোর চিত্র সন্তোষজনক নয়।
আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, সাক্ষরতা হচ্ছে পড়া, অনুধাবন করা, মৌখিকভাবে এবং লেখার বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা, যোগাযোগ স্থাপন করা এবং গণনা করার দক্ষতা। অর্থাৎ সাক্ষরতা বলতে লিখতে, পড়তে, গণনা করতে ও যোগাযোগ স্থাপন করার সক্ষমতাকে বোঝানো হয়। সাক্ষরতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের পঞ্চম শ্রেণি পাস করা শিক্ষার্থীর সমমানের হতে হবে বলে মানদ- নির্ধারণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মুখ থুবড়ে পড়েছে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প: ৭ বছর আগে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, দেশের কোনো মানুষ নিরক্ষর থাকবে না। এ লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা)’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় চার বিভাগের ২৫০ উপজেলায় ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষকে শিক্ষার আওতায় আনতে ব্যর্থ হন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। বাড়ানো হয় এক বছর মেয়াদ। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ছয় বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে চরম হতাশ সংসদীয় কমিটি ও আইএমইডি (পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ)। তারা এই প্রকল্পকে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংসদীয় কমিটি এই প্রকল্পের মেয়াদ আর না বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন নেওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ২১ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষর করতেই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাক্ষরতা প্রকল্পে পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিরা কেন তাঁদের পেশা বাদ দিয়ে সাক্ষরজ্ঞান নিতে আসবেন? এ ছাড়া আট থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রকল্পে’ মূলত নাম লিপিবদ্ধের মাধ্যমে সাক্ষরতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
শতাংশে বাড়লেও বাড়েনি মান: এদিকে সাক্ষরতার হার শতাংশে বাড়লেও মান বাড়েনি মান। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবিএস সাক্ষরতার হার নিয়ে জরিপ করার সময় মানুষের কাছে জানতে চায়, আপনি লিখতে পারেন কি না? সে বলল পারি। হয়তো সে সাক্ষর করতেও জানে। কিন্তু তাকে যদি এক পৃষ্ঠা লিখতে দেওয়া হয়, তাহলে সে পারবে না। আর বেসরকারি জরিপে একজন মানুষ লিখতে ও পড়তে পারে কি না, তা যাচাই করা হয়। ফলে সরকারি-বেসরকারি তথ্যে বড় ফারাক থেকে যাচ্ছে।