নকল ওষুধের থাবায় কুপোকাত জনগণ

অপরাধ এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন সাস্থ্য

বাজারে ৬২ প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নবিদ্ধ ওষুধ!
৩২ ওষুধ কম্পানির নিবন্ধন বাতিল

বিশেষ প্রতিবেদক : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) নীতিমালা অনুসরণ করে মানসম্পন্ন উপায়ে ওষুধ প্রস্তুত না করাসহ আরো কিছু অভিযোগে ৩২টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সাময়িক বাতিল করেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এ ছাড়া মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত স্থগিত করা হয়েছে।

এর আগে সংসদীয় কমিটির তদন্তপূর্বক সুপারিশের ভিত্তিতে ৬২টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার। এর মধ্যে নিবন্ধন সাময়িক বাতিল হয়েছে মাত্র ১২টি প্রতিষ্ঠানের। দুটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে উচ্চ আদালত থেকে নিবন্ধন বাতিল আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ পেয়েছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশে নিবন্ধন পাওয়া অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬৫। এর মধ্যে ৩২টির নিবন্ধন সাময়িক বাতিল করা হয়েছে এবং আরো কয়েকটির বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে। ২৮টি প্রতিষ্ঠান অচল রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, ‘সংসদীয় কমিটি তদন্তসাপেক্ষে যে সুপারিশ আমাদের দিয়েছে, আমরা সে অনুসারে ওই সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছি। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর তাদের বিধিবিধান অনুসারে এখন কাজ করছে।’

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘অধিদপ্তর আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সক্রিয়। যেসব প্রতিষ্ঠান জিএমপি নীতিমালা অনুসরণ করবে না, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে আরো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।’

৬২টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ কার্যকর হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বন্ধ করাটা মুখ্য বিষয় নয়, তালিকাভুক্তরা যদি এর মধ্যেই জিএমপি নীতিমালা অনুসরণ করে কারখানাকে তৈরি করতে পারে, তবে তো আর সমস্যা থাকেবে না। এটা যারা না করবে, তাদেরটা বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

নিবন্ধন বাতিল হওয়া ৩২ প্রতিষ্ঠান :
১। সিরাজগঞ্জের ওয়েসিস ল্যাবরেটরিজ ও
২। রাসা ফার্মাসিউটিক্যালস,
৩। ঢাকার শ্যামলীর ট্রপিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যালস ও
৪। সালটন ফার্মাসিউটিক্যালস,
৫। উত্তরার রিলায়েন্স ফার্মাসিউটিক্যালস,
৬। চট্টগ্রামের ম্যাফনাজ ফার্মাসিউটিক্যালস ও
৭। ইউরেকা ফার্মাসিউটিক্যালস,
৮। বরিশালের প্যারাডাইস ফার্মা,
৯। ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস ও
১০। জেপিআই লিমিটেড,
১১। দিনাজপুরের বেঙ্গল টেকনো ফার্মা,
১২। সিলেটের জালফা ল্যাবরেটরিজ,
১৩। কুমিল্লার হক সন্স ল্যাবরেটরিজ,
১৪। খুলনার ইসলামী ফার্মাসিউটিক্যালস,
১৫। গাজীপুরের জেসিআই বাংলাদেশ,
১৬। রাজধানীর মিরপুরের জেমস ফার্মাসিউটিক্যালস,
১৭। সাতমসজিদ রোডের কেডিএইচ ল্যাবরেটরিজ,
১৮। মগবাজারের ম্যাক্সবর্ণ ফার্মাসিউটিক্যালস,
১৯। গোপীবাগের সনি ফার্মাসিউটিক্যালস,
২০। বগুড়ার মিগ ফার্মাসিউটিক্যালস,
২১। গাজীপুরের বসকো ল্যাবরেটরিজ,
২২। ফরিদপুরের ফনিক্স কেমিক্যাল ল্যাবরেটরিজ,
২৩। গাজীপুরের পাইওনিয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস,
২৪। পাবনার পিপ লিমিটেড,
২৫। চট্টগ্রামের পিউর ড্রাগ অ্যান্ড কেমিক্যাল,
২৬। নরসিংদীর রিলায়েবল ড্রাগস অ্যান্ড কেমিক্যালস,
২৭। গাজীপুরের রিম্যাক্স ফার্মাসিউটিক্যালস,
২৮। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিড ফার্মা,
২৯। কুমিল্লার শর্মা কেমিক্যাল ওয়ার্কস,
৩০। ঢাকার বায়োকেম ফার্মাসিউটিক্যালস,
৩১। কেয়ার ফার্মা ও
৩২। বাটালি ফার্মা।
এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত ৬২টির মধ্যে রয়েছে। বাকি ২০টি প্রতিষ্ঠান ওই তালিকার বাইরে রয়েছে।

ওষুধ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নিবন্ধন বাতিল করা ৩২ কম্পানির মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতের মাধ্যমে লাইসেন্স বাতিলের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়েছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সিরাজগঞ্জের ওয়েসিস ল্যাবরেটরিজ এবং বরিশালের ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস। দুটি প্রতিষ্ঠান গত ৮ মে উচ্চ আদালত থেকে নিবন্ধন বাতিল আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ পায়। এ ছাড়া পাবনার ইউনিভার্সেল ফার্মাসিউটিক্যালসের কেবল বায়োলজিক্যালের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। ফলে তাদের নন-বায়োলজিক্যালের অনুমোদন বহাল আছে। এর বাইরে রংপুরের মিডকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন স্থগিত করা হয়েছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন আগেই বিভিন্ন কারণে বাতিল হয়েছে। তবে গত এক-দুই মাসে আমাদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় তুলনামূলকভাবে বেশিসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তারা আদালতে গেলে আমরা আমাদের যা করণীয় তা-ই করব। আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব।’

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান দেখার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নাজমুল হাসান এমপিকে প্রধান করে ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই সংসদীয় উপকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সংসদ সদস্যের বাইরে আরো তিনজন বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই কমিটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে গত বছরের ৩ জুলাই সংসদীয় কমিটির ১৬তম বৈঠকে প্রতিবেদন পেশ করে। এতে ৬২টি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করছে বলে চিহ্নিত করা হয়। এর ভিত্তিতে মূল কমিটি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে ওই ৬২ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।

এ ছাড়া ওষুধ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর চার সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। গত ২২ মার্চ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ওই কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে সংসদীয় কমিটির গত ১০ এপ্রিলের বৈঠকে চিহ্নিত ৬২টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ উৎপাদন বন্ধ এবং বাজারজাত করে থাকলে তা প্রত্যাহার ও বাজেয়াপ্ত করার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে।