দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র দেশ সিলেট 

অন্যান্য সারাদেশ সিলেট

শাহ ইসমাইল : সিলেট নামটি মনের কোণে উঁকি দেওয়ার সাথে সাথেই চোখের সামনে চলে আসে পাহাড়, টিলা ঝরনা, হাওর, নদী, বন-বনানীর এক সবুজ প্রান্তর। আর তার বুকে ঢেউ খেলানো ঘন সবুজ ঘাস আর আচ্ছ্বাদিত সাজানো গোছানো চা-বাগানের অনুপম দৃশ্য। এর গহীনে চা-বাগানের বাংলো কতই-না মনোহর। বাংলোর বারান্দায় শীতের রাতে চুটিয়ে আড্ডা শেষে সকালের রোদ উষ্ণতা দেয় মনে। সবুজ দুর্বা ঘাসের ওপর পড়া শিশির বিন্দু পায়ের পরশে মিশে যাওয়ার দৃশ্য আরো প্রাণস্পর্শী। সিলেটের জনপদকে নানা নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই জনপদের অপর এক নাম
” দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র দেশ ” সিলেট। গহীন জঙ্গল ও জন-মানবহীন প্রান্তরে কি যে দুর্বার আকর্ষণ ছিল তা-ই প্রায় দুইশ’ বছর আগে সাত সমুদ্র তের নদীর অপারের সাদা চামড়ার ব্রিটিশদের আকৃষ্ট করেছিল।
গহীন জঙ্গলের ভেতর সুন্দর চা-বাগান এবং এর ভেতরে বাংলোগুলো আকর্ষণীয় ও প্রকৃতিবান্ধব। এই স্থাপনাগুলো সবই ব্রিটিশ আমলের। যদিও অনেক বাংলোকে সংস্কার করা হয়েছে। বসবাসের জন্যও খুবই আরামদায়ক ও মনোরম। চা-বাগানের সুসজ্জিত বাংলোর পরিবেশ সত্যই আলাদা। এখানে শীতকালে এক ধরনের আর গরমকালে আরেক ধরনের আনন্দ অনুভূতি।
সিলেটের বাগানের চা অত্যন্ত সংবেদনশীল অর্থকরী ফসল। পৃথিবীজুড়েই এর কদর। চা-শিল্পের ইতিহাসও প্রাচীন। এই শিল্পের ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। প্রথমে মানুষ এটি ঔষধ হিসেবে পান করতো। পরে তা পানীয় হিসেবে, চা শিল্পের ইতিহাস নিয়ে এই উপমহাদেশে বেশ বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলছেন এর আবিষ্কারক চীন। আবার কেউ বলছেন ভারতীয় উপমহাদেশে। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় কেউ কেউ করেন আসামের পাহাড়ি অঞ্চলে ক্যামেলিয়া আসামিকা প্রজাতির চা হতো। ১৮২৪ সালে মেজর স্কট এবং ১৮২৩ সালে ক্যাপ্টেন সিএ ব্রুস বা লে. চার্লটন চা গাছ আবিষ্কার করেন। আবার কেউ কেউ চীনা ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস ও ক্যামেলিয়া আসামিকাকে একটি প্রজাতি ও এক উত্পত্তিস্থলের উদ্ভিদ মনে করেন। তাদের মতে, তিব্বতের মালভূমি থেকে এই প্রজাতির উত্পত্তি হয়ে চীন ও ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৭৭৪ সালে চীন থেকে প্রথম ভারতে বীজ আনা হয় এবং ১৭৭৮ সালে জোসেফ ব্যাংক হিমালয়ের পাদদেশে চা- আবাদের সম্ভাবনা ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে চায়ের আবিষ্কার নিয়ে বেশ মজাদার পৌরাণিক কাহিনিও রয়েছে।
১৮৩৩ সালে ভারতবর্ষে প্রথমে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি চায়ের আবাদ শুরু করে। ১৮৫০ সালে তৈরি করা হয় সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান হল বাংলাদেশের
সিলেট জেলায় অবস্থিত এই চা বাগান। এটি উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন চা বাগান। মালনীছড়া চা বাগান বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের বৃহত্তম এবং সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত চা বাগান। ১৮৫৪ সালে লর্ড হার্ডসন ১৫০০ একর জায়গার উপর এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই চা বাগানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত।
পাক-ভারতীয় উপমহাদেশের সিলেটেই প্রথম চা উৎপাদন শুরু হয়। চায়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে ব্রিটিশ আর বাংলাদেশিরা। সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান থেকেই উপমহাদেশে চা চাষের গোড়াপত্তন। এরপর দেড় শতাব্দীর মালনীছড়া বহু ইংরেজ, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি ব্যবস্থাপকের হাত ঘুরে ১৯৮৮ সাল থেকে এখনও ব্যক্তিগত মালিকানায় রয়েছে। সিলেটের এই চা বাগান থেকেই চা চাষের গোড়াপত্তন। যা এখন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস প্লেন থেকে নেমে বাগানের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে বলেছিলেন, পৃথিবী এতো সুন্দর যে মালনীছড়া বাগান না দেখলে তা বোঝা যাবে না। শুধু হ্যারি কে টমাস নয়, সিলেটের চা বাগানের সবুজ মায়ায় প্রতিদিন জড়ো হন হাজার হাজার দেশি বিদেশি পর্যটক।
মালনীছড়া চা বাগান, সিলেট
সিলেট শহরের খুব কাছেই এই চা বাগানটি সবুজ ঘেরা অনিন্দ্যসুন্দর। প্রায় আড়াই হাজার একর ভূমিস্বত্ব সীমানায় উঁচু-নিচু টিলার পর টিলায় ভরা চা বাগানটি। রয়েছে এক হাজার দুইশ একর জমি, রাবার আবাদের জন্য সাতশ একর জমি এবং কারখানা, আবাসন, বৃক্ষ, বনজঙ্গল জুড়ে বাকি জমিটুকু। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশে এসে যারা খুব অল্প সময়ে খুব সুন্দর কোনো সবুজের গালিচায় হারিয়ে যেতে চান তাদের জন্য অনন্য মালনীছড়া চা বাগান। দেশের মোট চায়ের ৯০ শতাংশই উৎপন্ন হয় সিলেটে। এজন্য সিলেটকে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ ও বলা হয়। চ্বাাগানের ওপরে বড় বড় ছায়া বৃক্ষ। নিচে আধো আলো আধো ছায়ার সবুজ চাদর। যেন শৈল্পিক কারুকাজ। সিলেটের চা-বাগানের এ প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকের মন ছুঁয়ে যায়। এই বাগানের পাশেই বিশ্বের অন্যতম সুন্দর স্টেডিয়াম, যেখানে ২০১৪ সালের বিশ্ব টি-২০ খেলা অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে সিলেট জেলায় মোট চা বাগানের সংখ্যা : ২০ টি (১টি রুগ্ন)।
সিলেট সদর উপজেলাধীন: ১. লাক্কাতুরা,
২. মালনীছড়া,
৩. আলীবাহার,
৪. ডালিয়া,
৫. খাদিম,
৬. বুরজান,
৭. তারাপুর (মোট ৭টি)।

জৈন্তাপুর উপজেলাধীন: ১. লালাখাল,
২. হাবিবনগর,
৩. আফিফানগর,
৪. শ্রীপুর,
৫. খান বাগান,
৬. দি মেঘালয় টি এস্টেট (মোট ৬টি)।

গোয়াইনঘাট উপজেলাধীন: ১. ফতেহপুর,
২. জাফলং (মোট ২টি)।

কানাইঘাট উপজেলাধীন : ১. লোভাছড়া,
২. ডোনা (মোট ২টি)।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলাধীন: ১. মনিপুর,
২. মোমিনছড়া,
৩. ডালুছড়া (মোট ৩টি)।