দুর্নীতি করে বিপুল সম্পদ প্রকৌশলী মোজ্জাম্মেলের

অপরাধ জাতীয়

বিশেষ প্রতিবেদক : সরকারি চাকুরিতে থেকেও নাশকতামূলকত কর্মকান্ড পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে ঢাকা ওয়াসার এক নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ (আরএন্ডডি) বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তার নাম মোজাম্মেল হক। গুরুত্বপূর্ণ এই পদে থেকে ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে কামিয়েছেন বিপুল অর্থ। ঢাকার কলাবাগানে কিনেছেন অভিজাত ফ্ল্যাট। কেরানীগঞ্জে কিনেছেন জমি। নাশকতামূলক কমর্কান্ডে সম্পৃক্তার অভিযোগে ঢাকা ওয়াসা তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তার বিরুদ্ধে চলমান রয়েছে ৩টি বিভাগীয় মামলা। ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানান।
তিন মামলা ও সাময়িক বরখাস্ত থাকার পরও তার বেপরোয়া ও সরকার বিরোধী কর্মকান্ড থামছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কে এই মোজাম্মেল? তার এই অপশক্তির উৎস কোথায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওয়ান ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগের দায়িত্ব থেকে শেখ হাসিনাকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে লিফলেট ছেড়ে ছিলেন ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক। ওই সময় লিফলেটে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি পরিচয় দেন। এতে তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, দলের অবমানকর অবস্থার জন্য দলীয় কর্মীরা নয়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতাই দায়ী। মোটা দাগে দলের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে চাটুকারতন্ত্র, আঞ্চলিকতা ও ক্ষেত্র বিশেষে আত্মীয়করণের মতো রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির কালোছায়া। অপরাজনীতির এই কালো শিকল যেনো আওয়ামী লীগকে বন্দী করে রেখেছে।’ এছাড়াও মোজাম্মেল হক শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবন্দৃকে নিয়ে নানাভাবে কটুক্তি করেন। তিনি লিফলেটে লিখেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি নেতৃত্বের মনমানসিকতার সংস্কার চাই।’
সেই সংস্কারপন্থী মোজাম্মেল হক এখন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল লীগ ঢাকা ওয়াসা শাখার নেতা। তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতি, অসদাচরণসহ নানা কারণে ড্রেনেজ (আরএন্ডডি) বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে ৩টি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল¬ী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সাঈদ-উর-রহমান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তার বিষয়ে ৩টি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। গত বছরের ২১ অক্টোবর বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ওয়াসা ভবন পরিদর্শনে গেলে তার নেতৃত্বে বহিরাগত ও ওয়াসার কিছু শ্রমিক কর্মচারী মন্ত্রীকে স্বাগত না জানিয়ে উল্টো বিক্ষোভ করেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে অফিসে প্রবেশের নিয়ম লঙ্ঘন, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ ও কর্তৃপক্ষ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া ওয়াসার প্রতিবেদনে মোজাম্মেল হকের অতীত কর্মকান্ডের বিবরণ ও বিভিন্ন শাস্তির বিবরণ তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ২০০৯ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির কাছে তৎকালীন ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেন। যদিও অভিযোগ স্বীকার করে মুচলেকা দেওয়ায় তখন দুটি ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বারবার শৃঙ্খলা ভঙ্গেরও অভিযোগ আনা হয়। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (মামলা নম্বর ৩৩/২০১৯) তদন্তে গত ৩ মার্চ অফিস আদেশ জারি করে ওয়াসা। এতে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের পরিচালক মো. মোহসেন আলী মিয়াকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু তিনি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেননি বলে জানা গেছে।
শুধু অশালীণ আচরণই নয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজদ করে মোজাম্মেল বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছে। অভিজাত ফ্ল্যাট কিনেছেন কলাবাগান ৪/বি লেক সার্কাসের ৭৫ বাড়িতে। তার আয়কর টিন নম্বর ৫২২৮৬৩৬৪৯৩৪৬। সেখানে এটি তার বেতন ভাতার। এর বাইরে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে-বেনামেও রয়েছে বিপুল সম্পদ।
ওয়াসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মোজাম্মেল হক দীর্ঘ ড্রেনেজ সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। ঢাকা দফায় দফায় ডুবলেও তিনি কোন পদক্ষেপ নেননি। অথচ ড্রেনেজ সমস্যা দূর করতে একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, দুজন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ৫০জন দক্ষ জনবল নিয়ে ড্রেনেজ সার্কেল গঠন করা হয়েছে। তারা প্রায় বছরে দৃশ্যমাণ কোন সফলতা দেখাতে পারেনি। শুধু ওয়াসায় বসে কাল্পনিক প্রকল্প তৈরি করে সরকারি অর্থের অপচয় করতেন। টেন্ডার করে ঠিকাদারের যোগসাজসে ওইসব আত্মসাৎ করেন।
হাজারীবাগ কালুনগর এলাকায় ওয়াসার ইউ চ্যানেল তৈরির কাজে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজস করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। ওয়াসার মাস্টার প¬ানে থাকা ইউ চ্যানেলের কাজ নিয়ে অনিয়ম করায় সিটি কর্পোরশনের সঙ্গে ওয়াসার বিরোধ দেখা দেয়।
স্বেচ্ছারিতা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, আমি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছি। আমি কোন ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নয়। যেটি লিফলেট বলা হচ্ছে সেটি লিফলেট ছিল না বরং ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে আমার বিশ্লেষণ। আর ইউ চ্যানেল ও বা ড্রেনেজের অন্য কোন দুর্নীতি আমার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। ওয়াসার মাস্টার প্লান অনুযায়ী ইউ চ্যানেলের কাজ হয়েছে।
মোজাম্মেল হকসহ কয়েক প্রকৌশলীর স্বেচ্ছাচারিতা ও শৃংখলা বিরোধী আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে দেরি হয় সত্য। আমাদেরকে বিধি মেনে তদন্ত করতে হয়। এতে কখনো কখনো দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। তবে ওয়াসা কাউকে বিনা অপরাধে সাজা দেয় না, তেমনি অভিযুক্তকেও ছাড়ার পক্ষে নয়। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হুমকি-ধমকি দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এমন কিছু কিছু অভিযোগ আমিও শুনছি। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।