অস্থির বাজার

অর্থনীতি এইমাত্র জাতীয় বানিজ্য সারাদেশ

*মুহূর্তেই উধাও টনকে টন পেঁয়াজ!
*হিলিতে একদিনে দাম দিগুনেরও বেশী

পেঁয়াজ কিনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে জানতে চায় কত করে নিল ভাই?

 

মহসীন আহমেদ স্বপন : ভারতের রফতানি বন্ধ করার সংবাদে অস্থির হয়ে উঠেছে পেঁয়াজের বাজার। একদিনের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ দাম বেড়ে পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা হয়ে গেছে। কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ভারত সোমবার হুট করে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। এরপর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই দেশের বাজারে পেঁয়াজের এমন দাম বাড়ল। এ দিকে খাতুনগঞ্জে মুহূর্তেই খালি হচ্ছে গুদামে থাকা টনকে টন পেঁয়াজ। এ বছরও একইভাবে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় অস্থির দেশের বৃহত্তম এই পাইকারি বাজারে। আমদানি না হলে সামনের দিনগুলোতে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।
হু হু করে দাম বাড়ার খবরে মুহূর্তেই খালি পেঁয়াজের এক একটি গুদাম। ট্রাক ও ঠেলা ভর্তি করে পেঁয়াজ কিনে নিয়ে যাওয়ার রীতিমতো যুদ্ধে নেমেছেন ক্রেতারা। যেন পেঁয়াজ বেচাকেনার মহোৎসব। একদিনের ব্যবধানে কেজি ১৫-২০ টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভারত কোন ধরনের ঘোষণা ছাড়াই গত বছর পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে ২৯ সেপ্টেম্বর আর এ বছর ১৪ সেপ্টেম্বর। অজুহাত একটাই, অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি। দ্রুত অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা না করলে বাড়বে লাগামহীনভাবে। হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি সহ-সম্পাদক জাবেদ ইকবাল বলেন, স্থলবন্দর বন্ধ আছে, ১৫-২০ দিন অপেক্ষা করে আনতে হবে।
দিল্লিতে পেঁয়াজ রপ্তানি নিয়ে আলোচনায় বসে সেদেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেয় অনির্দষ্টকালের জন্য পেঁয়াজ রপ্তানি করবেনা ভারত। এসুযোগে এক দিনেই দিগুন মুল্যে পেঁয়াজ বিক্রয় করছে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা।
গত বছরও সেপ্টেম্বর মাসে কোনো ঘোষণা ছাড়াই ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। এতে হু হু করে দাম বেড়ে পেঁয়াজের কেজি ৩০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে।
এবারও সেই সেপ্টেম্বরেই ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিল। এতে পেঁয়াজের দাম আবারও অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে-এমন আশঙ্কায় কেউ কেউ বাড়তি পেঁয়াজ কেনা শুরু করে দিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা। আমদানি করা ভারতের পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। অথচ গতকাল দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, হঠাৎ করেই পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। সোমবার পাইকারিতে যে দেশি পেঁয়াজের কেজি ৫০ টাকা ছিল তা আজ ৭৫ থেকে ৮০ টাকা হয়ে গেছে।
পেঁয়াজের দামের বিষয়ে মালিবাগ হাজীপাড়া বৌ-বাজারের ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর বলেন, সোমবার দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি করেছি ৬০ টাকা। মঙ্গলবার পাইকারিতে দাম ৮০ টাকা। যে কারণে ৯০ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছি।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি যা তাতে মনে হচ্ছে পেঁয়াজের দাম আরও বাড়তে পারে। কারণ গতকাল ভারত রফতানি বন্ধ করার পর আজ পেঁয়াজ কেনার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ অবস্থা চললে বাজারে পেঁয়াজের এক ধরনের কৃত্রিম সংকট দেখা দিতে পারে। এতে আবারও গত বছরের মতো অবস্থা হবে কিনা বলা মুশকিল।
একই বাজারে ১০০ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করা মো. সোহেল বলেন, মঙ্গলবার ১০০ টাকা কেজি কিনতে পারছেন। আগামীকাল দেখবেন ১৫০ টাকা কেজি কিনে খেতে হবে। মঙ্গলবার বিকেলেই দাম আরও বেড়ে যায় কিনা দেখেন। ইতোমধ্যে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের ক্রেতা বেড়ে গেছে।
এদিকে রামপুরায় ভ্যানে দেশি পেঁয়াজের কেজি ৮০ টাকা বিক্রি করছিলেন জয়নাল মিয়া। দুই মিনিটের মধ্যে তার সব পেঁয়াজ বিক্রি হয়ে যায়। এ বিষয়ে জয়নাল বলেন, আমার পেঁয়াজ গতকাল কেনা। কিছুটা লাভে ৮০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি।
তিনি বলেন, একজন এসে পেঁয়াজের দাম জানতে চাইলেন। আমি ৮০ টাকা বলতেই, তিনি পাঁচ কেজি পেঁয়াজ দিতে বলেন। এরপর কয়েকজন এসে সব পেঁয়াজ কিনে নিলেন। এমন হুড়াহুড়ি করে পেঁয়াজ আমি আগে কখনো বিক্রি করিনি। কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে ফেললাম কিনা জানি না।
এই ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে রামপুরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি করছেন ১০০ টাকা। ভারতের আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি বিক্রি করছেন ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। একই দামে পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা গেছে খিলগাঁও তালতলা বাজারে।
খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী মো. হিরু বলেন, সোমবার ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করায় আজ পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকার ওপরে। বাড়তি দামে কেনার কারণে আমাদের বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
এদিকে পেঁয়াজ কিনে কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে অনেকেই তার কাছে জানতে চাচ্ছেন, পেঁয়াজ কত করে নিল ভাই? রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও প্রতিটি অঞ্চলেই এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পড়া মালিবাগের বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, বাজার থেকে ১০০ টাকা কেজিতে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনেছি। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই বাসা। বাজার থেকে পেঁয়াজ হাতে বের হতেই অন্তত পাঁচজন পেঁয়াজের দাম জানতে চেয়েছেন। এতেই বোঝা যাচ্ছে পেঁয়াজ নিয়ে সবার মধ্যেই এক ধরনের আতঙ্ক রয়েছে।
পেঁয়াজের দামের বিষয়ে শ্যামবাজারের আজমেরী ভান্ডারের সোহেলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজের কেজি ৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
জানা যায়, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বন্যায় পেঁয়াজের ফসলের ক্ষতি ও অভ্যন্তরিন বাজারে পেঁয়াজের সংকট এবং মুল্য বৃদ্ধির কারন দেখিয়ে হঠাৎ করেই সোমবার থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত পেঁয়াজ রপ্তাতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সে দেশের সরকার। ফলে হিলি স্থলবন্দরসহ দেশের সকল বন্দর দিয়ে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ দিয়েছে। এসংক্রান্ত্র ভারত সরকারের বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বানিজ্য শাখার এডিশনাল সেক্রেটারী অমিত ইয়াদব স্বাক্ষরিত এক আদেশ জারি করা হয়। ফলে বিপদে পড়েছে পেঁয়াজ আমদানিকারকরা। হিলি স্থরবন্দরের আমদানি রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি মো. হারুন উর রশিদ হারুন বলেন, পেঁয়াজ বোঝাই শতাধিক ট্রাক সীমান্তের ওপারে আটকা পড়েছে। যা নষ্ট হয়ে গেলে অনেক টাকার লোকসান হবে। ইতোপূর্বে আমদানির লক্ষ্যে ১০ হাজার মে. টন পেঁয়াজ এলসি করা রয়েছে এগুলোর ভবিষ্যত কি হবে তা নিয়ে শঙ্খায় পড়েছে বন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা। এলসিকৃত পেঁয়াজ গুলো দেশে নিয়ে আসার জন্য উভয় দেশের সরকারের নিকট অনুরোধ জানিয়েছে ব্যবসায়ী নেতা ও আমদানি কারকগণ।
এদিকে সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ীরা এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত লাভে পেঁয়াজ বিক্রয় করছে বন্দরের আরত গুলোতে। আমদানি বন্ধের অজুহাতে পূর্বের আমদানিকৃত পেঁয়াজ দিগুন দামে বিক্রি করছে বন্দরের ব্যবসায়ীরা। হিলি স্থলবন্দরের আমদানি কারক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এর আগে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রয় করলেও আমদানি না থাকায় ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় করছি। এরপর হয়ত ১শ’ টাকা ১৫০ টাকা কেজিও বিক্রয় করতে হবে।