গ্রান্ড ক্যানিয়ন দর্শন/২০১১

অন্যান্য বিনোদন

কাজি আরিফ : ভোরবেলা ঘুম ঘুম চোখে হোটেলের ডাইনিং এ নিজেকে দাখিল করলাম।
বিদেশ বিভূই গিয়ে হোটেলের ফ্রি ব্রেকফাস্ট মনটাকে ভালো করে দেয়। বিদেশে যত খরচ বাঁচানো যায়। তাই নাস্তা দিয়ে যতটা বেশী পেট ভরে রাখা যায় এমন উদ্ভট চিন্তা মাথার মধ্যে কাজ করে। যেন উটের পানি রাখার মত পেটে একটা জায়গা থাকলে ভাল হত। এমন পেট ভরে রাখার চিন্তায় প্লেটে ছোটখাটো পাহাড় তৈরী করতে গিয়েও নিজেকে সামলালাম ।
কেননা পেছনে সুন্দরী আধা স্বর্ণকেশী ললনা । ললনাদের সামনে বাঙালীর হিসেবী ভাবনা থাকেনা। তখন উদার, দানবীর , সাহসী হওয়ার ব্যাপার চলে আসে।
‘গুড মর্নিং , আপনি আগে নিন’ আমি তাকে সামনে দিলাম।
সে মিষ্টি করে হাসল তাবৎ পৃথিবীর সুন্দরীরা এমন ট্রিটমেন্ট পেয়ে বোধকরি অভ্যস্ত। মুখে বিনে পয়সার হাসিটুকু ঝুলিয়ে রাখল। একটা কথাও খরচ করল না । আমিও বাপু মুজতবা আলীর ঝান্ডুদার দেশের লোক । কথা বলিয়ে ছাড়ব-
আমি অবাক হয়ে দেখলাম আধা স্বর্ণকেশী মেয়েটি প্লেটে খাবারের ছোট ছোট পাহাড় বানিয়ে ফেলেছে অনায়াসে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারিনী মেয়েটির জিহ্বায় টেষ্ট আছে বলা যায়। আর আমি কিনা এই মেয়ের সামনে সামান্য কিছু খাবার এনে স্মার্ট হবার চেষ্টা করছি।
‘হ্যোয়ার আর ইউ ফ্রম ?’
‘হ্যোয়াট ডু ইউ থিংক? একটু মুখ খোলাতে মুক্তো দাঁতের ঝিলিক চোখে পড়ল।
‘আমার মনে হয় তুমি রাশিয়ান বেল্টের । কাজাকস্থান, উজবেকিস্থান, ইউক্রেন, এর কোথাও’
‘নাহ । আরো ভাবো।‘
‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’
এবার বেশ বড় করে মাথা দুলিয়ে বলল ‘ইউনিয়ন ত আর নেই, ভেঙে গেছে । আমি রাশান। সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়ে । নাম শুনেছ তো’
‘ওহ তাই বল, ,আই এম আরিফ।‘
‘আমি সাসা’
‘শোন সাসা, ছোটবেলা থেকে আমরা সেভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া নিয়ে গল্প পড়ে এসেছি। ‘রুশদেশীয় উপকথা’ আমার শৈশবের প্রিয় একটা বই। লালঝুটি মোরগের, আইভানের, সিভকা বুর্কার গল্প আমার মুখস্ত। তোমাদের পুশকিন, গোগল, চেখভ, দস্তোয়ভস্কি, টলস্টয় আমাদের খুব প্রিয়’
এইবার মেয়েটি খেতে খেতে চমৎকার করে হাসল । এই হাসির জন্য আমেরিকার এই লাসভেগাস শরটা দিয়ে দেয়া যায়। আমাদের কথা হচ্ছিল লাস ভেগাসের এমজিএম হোটেলের ডাইনিং এ । মেয়েটা কপালে চোখ তুলে তাকালো। আমি বললাম,
‘সেন্ট পিটাসবার্গের আগের নাম ছিল পোর্টগ্রাদ, পরে লেলিনগ্রাদ যা বাল্টিক সীর সাথে দাঁড়ানো একটি বন্দর নগরী। তাইতো’
‘ বাব্বাহ , তুমি ত অনেক জানো। কিন্ত তুমি কোন দেশের ? এশিয়ান ত বটেই । সাউথ এশিয়ান ।কান্ট্রি কোনটা তোমার?
‘বাংলাদেশ, নাম শুনেছ ?’
‘উ ম ম, বাংলাদেশ,এটা ঠিক কোন দিকে . কেমন একটা অসহায় দৃষ্টি দিলো ।সুন্দরীরা অসহায় হলে সুন্দর লাগে আরো বেশী।
কিন্ত আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। পাশের আরেকটা বড় দেশ দিয়ে নিজের দেশ দিয়ে চেনাতে ইচ্ছে করছিল না ।কিন্ত উপায়ও পাচ্ছিলাম না । সে আমার চেহারা ভাল করে দেখে বলল,
‘তুমি আফগানিস্থান,পাকিস্থান অথবা ইন্ডিয়ার হবে হয়ত’
রাশানরা আফগান দের ভাল করেই চেনে ।চেনার কারন আফগানে তাদের অনুপ্রবেশ এবং উইথড্রল। এবার আমি হাসি ঝুলিয়ে রেখে মেয়েটাকে অস্থির করছি । কিন্ত আমাদের কথোপকথনে পানি ঢেলে দিয়ে একটি লোক ডাইনিং এ এসে উচ্চস্বরে জানালো
‘ যারা যারা গ্রান্ড ক্যানিয়নে যাবার প্যাকেজ নিয়েছেন তারা যেন নেক্সট দশ মিনিটের পার্কিং এ চলে যান।ওখান থেকেই বাস স্টার্ট করবে ।‘
মেয়েটা দ্রুত শেষ করে চলে গেল। মনে হল বেচারা মনে হয় কিছু ফেলে এসেছে । রুমে দৌড়াচ্ছে। নাকি ওয়াশ রুমে যাবে কে জানে । প্লেটে তখনো তার একটা পাহাড় অবহেলায় পড়ে আছে। ওর প্লেটে খাবার নেয়া দেখে মনে হচ্ছে রাশিয়ায় আর যা হউক খাদ্যে বা অন্য ব্যবস্থাপনায় আমেরিকার ধারে কাছে যেতে পারেনি। অনেক ব্যাপারে ওরা আমাদের মত মানসিকতার রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন কমুনিজম অনেক স্বাধীনতা হরণ করেছে ওদের। আমি সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়ে সাসার চলে যাওয়া দেখছি আর কফি খাচ্ছি আরামসে ।
লাসভেগাস থেকে যাব গ্রান্ড ক্যানিয়ন। নেভাদা রাজ্য থেকে অ্যারিজোনা রাজ্য। পথ প্রায় তিনশ কিলোমিটার। চারঘন্টা লাগবে বাসে। পথের মধ্যে পড়বে অ্যারিজোনার মরুভূমি, বড় বড় ক্যাকটাস, হুভার ড্যাম, লেক মেদ ,বিখ্যাত রুট ৬৬। এগুলো দেখা হবেনা ।পরে দেখার প্লান করতে হবে বিশেষ করে লেক মেদ এবং হুভার ড্যাম। জানালা দিয়ে হুভার ড্যাম দেখার ব্যর্থ চেষ্টা না করে ইলাস বভুল বাসে ঘুমালাম।আগে মিলিয়ন বছরের গ্রান্ড ক্যানিয়ন দেখে আসি।
কোটি কোটি বছর আগে এই গ্রান্ড ক্যানিয়ন নাকি সমুদ্র এলাকা ছিল। পৃথিবীর অভ্যন্তরে দুইটা প্লেট নাকি একটার উপর একট উঠে যাওয়াতে এমন ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্রময় ক্যানিয়নের সৃষ্টি হয়েছে ।কিছু তথ্য জেনে নেয়া যেতে পারে এ বিষয়ে –
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত একটি গিরিখাত। এই গিরিখাতের মধ্য দিয়ে কলোরাডো নদী বয়ে গেছে।এই গিরিখাতের দৈর্ঘ্য ২৭৭ মাইল(৪৪৬ কি.মি.) এবং প্রস্থে ০.২৫ থেকে ১৮ মাইল পর্যন্ত এবং প্রায় ১৮০০ মিটার গভীর। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দৈর্ঘ্যে ২৭৭ মাইল, প্রস্থে সর্বোচ্চ ১৮ মাইল এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ১ মাইলেরও অধিক। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গঠনের ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এবং সময় ভূতাত্ত্বিকদের নিকট বিতর্কের বিষয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায় যে কলোরাডো নদী এই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মধ্য দিয়ে. প্রবাহিত হওয়া শুরু করে কমপক্ষে ১৭ মিলিয়ন বছর আগে। তখন থেকে কলোরাডো নদী তার প্রবাহ এবং ভূমি ক্ষয়ের মাধ্যমে এই ক্যানিয়নের বর্তমান রূপ দিয়েছে। প্রাকৃতিক যে সব বিস্ময় মানুষকে যুগে যুগে মুগ্ধ করেছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন তারই একটি। ৪৪৬ কিলোমিটার লম্বা, ৬.৪ থেকে ২৯ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্থ আর ১.৮৩ কিলোমিটার গভীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পৃথিবীর ২০০ কোটি বছরের ইতিহাসকে সামনে তুলে আনছে। ভূগর্ভস্থ টেকটনিক প্লেটের নানান ক্রিয়াকলাপের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন।
সারাদিন এ পাহাড় ও পাহাড়ে সাফা মারওয়া করলাম। লাঞ্চ করলাম। সাউথ রীমে সময় কাটালাম। দেখলাম প্রকৃতির অবাক বিস্ময়। নীচে সুতোর মত কলেরেডো নদীকে বড় নিরীহ মনে হলে ও সে খুব স্রোতস্বিনি। নদীতে র‍্যাফটিং খুব জনপ্রিয়। হটাৎ সাসার সাথে দেখা । সাথে আরেক দম্পতি।