অশনি সংকেত

অন্যান্য বিবিধ

লিপি নারগিস জাহান : আমি তখন ভাবনা চিন্তা একদম ছেড়ে দিয়েছি। আমার দম ধরে রাখাই তখন কাজ। আমি ক’জন কে নিয়ে ভাববো? বড় মেয়ে পি ই সি দেবে আর মাত্র একমাস। অনাগত সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে মাত্র ক’টা দিন হাতে। সমস্ত কলের মুখে ছাক্নীসহ ঢাকনা লাগানো হলো। এবার পানি ময়লা এলেও কেঁচো গুলো ওই ঢাকনা’র ভিতর নাচত। আমি একা ঘরে চীৎকার করে কাঁদতাম।মেয়েদের নিয়ে আসলাম পানি ধরেতে যেন আমার সাহায্য হয়। পানি ছাড়লে পাগলের মত ছুটতাম। হাঁড়ি পাতিল বালতি টেনে এদিক ওদিক ভরতাম। এর মাঝেই অশনি সংকেত শুন তাম অন্তর থেকে। পাশের ভাবিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম বিষয় টা কি?উনি বললেন, ওখানে ৩৬টি ফ্ল্যাট। আট-ন’জন বাদে সবাই ফ্ল্যাট মালিক।যেহেতু মালিকদের মধ্যে সমন্বয় করা যাছছেনা,তাই কাজ হছছেনা। পুরাতন শেওলা ধরা পাইপের ভিতর ছোট কেঁচোর বাস।কাজেই সব পাইপ বদলে নতুন লাগাতে হবে।খরচ পড়বে লাখ খানিক টাকা। আমি তখন মতিয়া হয়ে গেছি সব কিছু নিয়ে।
১৪ই সেপ্টেম্বর কেন যেন শরিরটা এক্টু ভালো লাগছিলো। প্রায় কেজি খানেক ময়দা’রপরোটা বানালাম।গরু মাংস দিয়ে স্যার ও বাচ্চাদের খেতে দিলাম। স্যার বললেন,যদি বিকালে আসেন তবে আমরা ডাক্তারের কাছে যাবো। ফাইনাল হলো ২৪তারিখ সীজার করা হবে।কেননা ওই দিন স্যারের ও জন্মদিন। বেলা ১২টা বাজে ছোট মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গেলাম।বড় মেয়ের ছুটি হতে আরো দেড় ঘন্টা।পথেই স্যারের ফোন উনি আমায় কোন কিছুনা জানিয়েই হাসপাতালে অবস্থান করছে।উনি আমার মা’কে ফোন দিয়ে বলেছেন যেন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।ছোটাছুটি করে বড় মেয়ের টিচারএর কাছ থেকে ছুটি নিলাম। আমি দুই মেয়েকে নিয়ে বাসায় এসে দেখি অসহায়ের মত আমার মা বাসার নিচে দাঁড়িয়ে। ঘেমে ক্লান্ত আমার মেয়েগুলোর হতাশা আরো বেশি।আজ তো এমন টা হওয়ার কিছু নেই।পাশের ভাবিকে বললাম, আমি আম্মার সাথে আমাদের বাসায় যাছছি।উনি কি বুঝলেন কে জানে!কারন মাতৃত্বের বিন্দু মাত্র চিহ্ন ও আমার শরিরে ছিলো না।স্যার ফোনের উপর ফোন দিয়েই যাছছে।সকাল থেকে অনেক ভালো ছিলাম আমি এখন ঘাড়ের রগ চিন চিন শুরু হলোবুঝতে পারছি খাদের কিনারে এসে গেছি।দুই রিক্সায় মা-মেয়ে চারজন মা’এর বাসায় এলাম।তিনতলায় উঠে মেয়েদের এক্টু আদর করে প্রায় দুই মাস আগে গুছিয়ে রাখা জরুরি ব্যাগ নিয়ে নিচে এলাম।মা এবং আমি রিক্সা ডেকে হাসপাতালে গেলাম।ব্যাগ টেনে নিজেই উঠে গেলাম তিন তলায়। ১৩হাজার টাকা পেমেন্ট করে ডোনার কে বললাম, চলেন ভাইয়া।উনি জিজ্ঞাসা করলেন,কোথায় যাবো পেশেন্ট কোথায়?আমি বললাম আমিই পেশেন্ট চলেন ক্রস ম্যাচ করি।উনি একব্যাগ রক্ত দিতে দিতে আমি জোহর নামাজ পড়ে নিলাম কেবিনে।আয়া এসে তাড়া দিলেন চলো বইন।ওটিতে গিয়ে দেখি বয়স্ক ডাক্তার ভদ্রমহিলা তসবী পড়ছেন।প্রেশার তখন উপরে ২০০আর নিচে কত তা মনে নেই। এনেস্থিসিয়া, ওটি সব পরপর। বেলা ২টা। মরিয়া হয়ে খুঁজে ও ডাক্তার কিছু পেলেন না।হতাশ হয়ে একটা টুলে বসে আয়াকে বললেন দেখোত, কি অবস্থা? প্রায় পাঁচ মিনিট খুঁজে আমার সোনা মানিক একমাত্র ছেলে নাজাতকে পাওয়া গেলো। অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছেলে টা আমার বোধহয় এ পৃথিবীটাকে আগেই ঘৃনা করতে শুরু করেছিলো। সরু লিক লিকে হাত পা, এতটুকু গলা আর এক রাশ চুল নিয়ে জন্মেছিলো ও।একফোঁটা মা’এর দুধ ওর কিসমতে ছিলো না।রাত দেড়টায় আমার মা’ পাগলের মত নিয়ে গিয়েছিলেন শিশু হাসপাতালে বিভিন্ন জটিলতায়।হাসপাতালে চারদিন স্যারকে তেমন পাওয়া যায়নি।মা’য়ের বাসায় এসেছিলাম বড় বোন আর ভাইয়ের কাঁধে। ক্ষুদার্থ বাচ্চাটা সারারাত কাঁদত।আম্মা বারবার আমার রুমে আসতেন।ছোট ফিডার, ছোট নিপল টানার মত শক্তিও ছিলো না বাচ্চাটার।
আরো ক’দিন পর এমন একটা শরৎ রাতে স্যার আমায় বললেন উনি ক’জন বন্ধু সহ সাজেক যাছছেন।আমি তখন আকাশে উড়ছি।পড়ে যাবার ভয় আর নেই।নিষেধ করেছিলাম।শোনেনি।এখন আমার মা’এর বাসায় পাঁচ জন মানুষ। আমি আমার দুই মেয়ে আমার মা।পুরুষ বল তে কয়েকদিন বয়সী আমার ছেলে। একরাতে ওর ডিহাইড্রেশন বেড়ে ওর অবস্থা অনেক খারাপ হলো।আমি আর আমার মা মুখ চাওয়া চাওয়ি ক রতে লাগলাম।চামুচে বারবার পানি খাইয়েএক্টু পর দেখি ও যেন এক্টু শান্তি পাছছে। বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।আমি বুঝে গেছি ঝড় উঠেছে। ২০১৪, ১৪ই সেপ্টেম্বর।