গ্যাসবাজারে সিন্ডিকেট আধিপত্য!

অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে এবার পুরনো পাইপলাইন সরিয়ে নতুন করে পাইপ স্থাপনে বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের মতো আর যেন বড় ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্যই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হবে। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ প্রতিবেদককে জানান এসব তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘ প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপলাইনেই চলছে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সরবরাহ। ফলে সংযোগ লাইনে হচ্ছে লিকেজ। ঘটছে দুর্ঘটনা। কিন্তু তার সমাধান না করেই তিতাসের কর্মকর্তারা যথাযথভাবে লিকেজ মেরামত ও সংস্কার না করেই হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অংকের টাকা। বর্তমানে তিতাসের বিতরণ এলাকায় এক হাজার ৬২২টি লিকেজ রয়েছে। তার মধ্যে সংস্কার করে ঠিক করা হয়েছে ৭৮১টি। এখনো অরক্ষিত রয়েছে ৮১৪টি। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো এখন গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজের কারণেও দুর্ঘটনা বাড়ছে। ওসব লিকেজ থেকে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়াও চোরাই পথে গ্যাস বিক্রির একটি সিন্ডিকেট রয়েছে ঢাকাসহ সারাদেশের তিতাস অফিসগুলোকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারি থেকে শুরু করে অনেক দালাল চক্র এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করে। আর এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চোরাইপথে গ্যাস পাচার হয়ে যাওয়ায় সরকার বঞ্চিত হয় বড় অংকের রাজস্ব থেকে। গ্যাস সরবরাহ খাতে সরকার লসে থাকলেও রিষ্টপুষ্ট তিতাসের শতশত কর্মকর্তা-কর্মচারি। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে স্বাস্থ্যের ড্রাইভার মালেক, আবজালের মতো শত সহ¯্রাধিক ব্যক্তির নাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকা জেলা শহরে গ্যাস সরবরাহের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৭-৬৮ সালে ডেমরা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত ১২ ইঞ্চি এবং ডেমরা থেকে পোস্তগোলা ১৪ ইঞ্চি ও ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। চাপ প্রশমন করে ২ ইঞ্চি থেকে ৬ ইঞ্চি ব্যাসের বিতরণ নেটওয়ার্ক স্থাপন করে গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়। তারপর থেকে নব্বই দশকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে ৫০ পিএসআই (প্রতি বর্গফুটে গ্যাসের চাপ) চাপের বিভিন্ন ব্যাসের বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। আর ওই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহর এলাকা ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কও সম্প্রসারণ করা হয়। ৫০ পিএসআই চাপের বিভিন্ন ব্যাসের বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। ওই পাইপলাইনগুলোর মেয়াদকাল ছিল ৩০ বছর। কিন্তু এখনো সেই পাইপলাইন ব্যবহার হচ্ছে। অনেক আগেই বেশির ভাগ পাইপলাইনেরই মেয়াদ ফুরিয়েছে। ওসব পাইপলাইন একবার বসানোর পর নিয়মিত দেখভালেরও অভাব রয়েছে। গ্রাহক লিকেজ খুঁজে পেলে তিতাসকে ফোনে জানালে তিতাস ব্যবস্থা নেয়।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে দুর্ঘটনার পর তিতাস প্রমাণ করে দিয়েছে পাইপলাইনের লিকেজ খুঁজে বের করা গ্রাহকের দায়। গ্রাহক জানার পরও তিতাসকে না জানানোটাই অপরাধ। আর তিতাসের জানাশোনার বাইরে দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তিতাসের কোনও দায় নেই। অথচ অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই ভুক্তভোগিরা ওই এলাকার বিভিন্ন গ্যাস লাইনে লিকেজের অভিযোগ করেছেন। এক মাসের মধ্যে গ্যাসের লিকেজ মেরামত কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয়নি।
এ প্রসঙ্গে তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) রানা আকবর হায়দারি জানান, তিতাসের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে লিকেজের তালিকা করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী জোন ভাগ করে ওই জোনের ডিএমডি এবং জিএমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আশা করা যায় আগামী এক মাসের মধ্যে বেশিরভাগ লিকেজ মেরামত করা সম্ভব হবে। যেসব লিকেজ মেরামতের ক্ষেত্রে অনেক টাকার প্রয়োজন সেগুলা বাছাই করে হেড অফিসে পাঠাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কাজ শুরু করতেও বলা হয়েছে। যাতে করে যা বিল আসে তা বোর্ডে পাস করে দ্রুত ছাড় দেয়া যায়।
এদিকে, বিপজ্জনক হয়ে উঠছে যানবাহন ও গৃহস্থালি জ্বালানির গ্যাস সিলিন্ডার। নি¤œমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার, পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সিএনজিচালিত তিন লাখ যানবাহনের সিলিন্ডারের মধ্যে রিটেস্ট করা হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় এক একটি গাড়ি চলন্ত বোমা হয়ে ওঠে। এ জন্য এর সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। এদিকে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহূত বেশকিছু এলপিজি সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়েছে। নিরাপদ রান্নাঘর হয়ে উঠেছে বিস্ফোরণের বিপজ্জনক জায়গা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলরত প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ট্রাক, অটোটেম্পো, বাস-মিনিবাস, হিউম্যানহলার ও ডেলিভারি ভ্যানসহ বেশিরভাগ গাড়ি সিএনজিতে কনভারশন করা। জ্বালানি তেলের চেয়ে খরচ কম ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় গাড়িগুলো সিএনজিতে কনভারশন করা হয়। ২০০২ সাল থেকে দেশে সিএনজি চালিত গাড়ি চলাচল শুরু করে। সিএনজি গ্যাসের সিলিন্ডার কোরিয়া ও ইতালি থেকে আনা হয়। কোরিয়ার সিলিন্ডারগুলো ১৫ এবং ইতালির সিলিন্ডার ৩০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও অনেক পরিবহন মালিক টাকা বাঁচাতে গাড়িতে জাহাজের বাতিল গ্যাস ও অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগাচ্ছেন। এ ছাড়া সিলিন্ডারগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনঃপরীক্ষাও করা হচ্ছে না। এমনকি নামসর্বস্ব অনেক কনভারশন কারখানায় অক্সিজেন সিলিন্ডারকে সিএনজি সিলিন্ডার বানানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারের আয়ু ১০ থেকে ১৫ বছর হয়ে থাকে। এই সময় পরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। তাই আয়ু শেষ হলে সেগুলো বাতিল করা উচিত, এটা সাধারণ কা-জ্ঞানের বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই কা-জ্ঞানের ঘাটতি অত্যন্ত প্রকট। কত বছর ধরে একটি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে, ব্যবহারকারীদের কাছে সেই হিসাবও থাকে না। বছর তিনেক আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ১১ হাজার গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা করেছিল। তারা দেখতে পেয়েছিল, আট হাজার সিলিন্ডারই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, তাই সেগুলো তখন বাতিল করা হয়। এ থেকে অনুমান করা যায়, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকির মাত্রা কত ব্যাপক।
অপরদিকে, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে সুনাম থাকলেও দেশে অটোগ্যাসের কাক্সিক্ষত প্রসার ঘটছে না। যদিও এ পণ্যটির ব্যবসায় সরকারের নীতিসমর্থন রয়েছে। ব্যবসায়িক দিক থেকেও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত গাড়িতে যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করা হয় তাকেই অটোগ্যাস নামে অভিহিত করা হয়। এ গ্যাসের ক্লিন বা গ্রিন ফুয়েল হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। উন্নত দেশগুলোয় গাড়ির প্রধান জ্বালানিই অটোগ্যাস। উন্নয়নশীল অনেক দেশও তাতে ঝুঁকছে। এর ওজন সিএনজির চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ কম। পাশাপাশি সিলিন্ডারে চাপ কম থাকায় বিস্ফোরণের ঝুঁকিও অনেক কম। পরিবহনযোগ্য হওয়ায় দেশের যে কোনো প্রান্তেই অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন করা সম্ভব। ওসব বিষয় বিবেচনায় রেখে সরকারও এখন গাড়ির জ্বালানি হিসেবে সিএনজির বদলে অটোগ্যাসকেই প্রাধান্য দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ২০০৫ সাল থেকে দেশে পরিবহনে এলপিজির ব্যবহার শুরু হয়। আর ২০১৬ সালে এ সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করা হয়। কিন্তুগাড়ির জ্বালানি হিসেবে অটোগ্যাসের ব্যবহার শুরুর পর দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় চাহিদা বৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক প্রসার ঘটছে না। বর্তমানে দেশে কতোগুলো গাড়িতে অটোগ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে সে সম্পর্কে কারো কাছে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে ওই সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি হবে না। অথচ দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ৪৫ লাখেরও বেশি। আর পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর তথ্যানুযায়ী দেশে চলাচলরত গাড়ির সংখ্যা ৩০ লাখের মতো। জ্বালানি হিসেবে ওসব গাড়ি মূলত ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজি ব্যবহার করা হয়। সরকারের রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) হিসেবে দেশে সিএনজিতে চলা গাড়ির সংখ্যা সাড়ে ৫ লাখ।
এ প্রসঙ্গে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সভাপতি ও ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক আজম জে চৌধুরী জানান, অটোগ্যাস ইনস্টলেশনে যেসব জিনিসপত্র প্রয়োজন সেগুলো বিদেশ থেকে আনতে হয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাছাড়া যেখানে বা যেসব ফিলিং স্টেশনে অটোগ্যাস ইনস্টলমেন্ট দেয়া হয়, সেগুলোর সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তাও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে তার চেয়েও বড় কারণ হলো সুবিধা ও ইঞ্জিনের স্থায়িত্বের দিক থেকে এলপিজি-সিএনজির পার্থক্য সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে না পারা। মূলত ওসব কারণেই অটোগ্যাসের ব্যবসা আগাচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, অজ্ঞাত কারণেই এলপিজিতে সুবিধার কথা বলা হলেও অনেকে আগ্রহী হচ্ছে না। দেশে এখন অত্যাধুনিক গাড়ি আসছে। ব্যাটারিচালিত গাড়িও বাজারে এসেছে। এমন অবস্থায় কনভারশন সিস্টেমের প্রতি সরকার উৎসাহিত করলেও বাজারে অনেক অত্যাধুনিক মডেলের গাড়ি রয়েছে, যেখানে ডুয়েল-ফুয়েল সিস্টেম রয়েছে। ফলে বিশেষ একটি সিন্ডিকেট বাজারে নিয়মিত আধিপত্য ধরে রেখেছে। বিপদজনক ও পুরোনোপন্থার সিস্টেমকেই এখনো ধরে রেছেছে ঘারে জুড়ে। ফলে, সাধারণ মানুষ সহজলভ্য বিষয়টিকেই লুপে নিতে বাধ্য হচ্ছে যদিও এতে বিপদ আছে এমনটা জানার পরও। এসব বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করেছে পুরোনো সিস্টেমের এসব ব্যবসায়িরাও।