ইস্তাম্বুল-২

অন্যান্য

কাজি আরিফ: ইস্তাম্বুল শহরের মাটিতে আমার পা পড়েছে দুবার।
এবার আমার হোটেলটা পড়েছে ইস্তাম্বুলের তাকসিম স্কয়ার এলাকায়। এটা ইউরোপিয়ান অংশে ।হোটেল থেকে অনেক নীচে শহর দেখা যায় । সেখানে রোদ পড়লে দারুন দেখা যায় সেটা ঘুম ভেঙ্গেই দেখতে পেলাম। হোটেলের পাশে রয়েছে বিখ্যাত ইস্তিকলাল এভিনিউ বা রোড। এখানে সর্বদা বিদেশী টুরিস্টদের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ করা যায় কারন সব ব্রাণ্ডের দোকানগুলো এখানেই অবস্থিত । তার উপর রয়েছে উদ্দাম মিউজিক, সারারাত খোলা রেস্টুরেন্ট বার। সারারাত এই রাস্তা ঘুমায়না , রাত গভীর হলে মানুষ আরো উৎফুল্ল হয় আরো জেগে ওঠে, ললনারা সল্প আর টাইট বেশে ঘুরে বেড়ায়। তুরস্কের রাতের সুন্দরীরা যে কি ভীষন সুন্দর তা না দেখলে বিশ্বাস হবেনা। কি তাদের ত্বকের রঙ , কি তাদের ত্বকের মোহনীয় কোমলতা। মনে হবে হুরপরী ঘুরছে আশেপাশে।
সেদিন মিনি সাইজের দুপুরের ভাত ঘুম দিয়ে বের হলাম।
হোটেলের নীচে বুকসপ। দেখি ,সেখানে একখানা বইয়ের উপর বসে আছেন একনিষ্ঠ এক পাঠক। বেশ রাজকীয় আসন। দেখে বাড়ির নিরীহ বেড়ালের কথা মনে পড়লেও আমার বাড়ির বিড়ালটা এমন শিক্ষিত যে ছিলনা সে আমি নিশ্চিত । আমাদের বিড়াল মুর্খ কিন্ত ইস্তাম্বুলের বিড়াল শিক্ষিত জ্ঞানী হতেই পারে। ঘুরে টুরে বেড়িয়ে ফিরে আসার সময়েও দেখেছিলাম তিনি আছেন বসে তবে এবার অবশ্য বসার বইখানা চেঞ্জ করেছেন।
কি জানি , পড়ার বদলে শুধু বইয়ের উপর বসলেই তার পড়া হয়ে যায় কিনা কে জানে !
তার কি হয় জানিনা তবে আমার বইয়ের সঙ্গ সব সময় ভাল লাগে। নিশ্চই তারও। তা না হলে এতক্ষন ধরে বইয়ের উপর বসে থাকবে কেন??
ইস্তাম্বুলের ইস্তিকলাল রোডে প্রথমেই আয়লার সাথে আমার দেখা ।
তুর্কী রমনী আয়লা । তার সৌন্দর্য হেরেমের কোন সুন্দরীর কারো থেকে কম না । সুলতানের আমল হলে তাকে হয়ত হেরেমে নিযুক্ত হতে হত। সারাজীবন হেরেমের খাস বাঁদী হয়ে কাটাতে হত অথবা সুলতানদের কোন পুত্রের প্রেমে পড়ত । কিন্ত এখন সে স্বাধীন ব্যবসা করছে । সে মাছ ঝিনুক আর সাথে খাবার বিক্রি করছে রাস্তার পাশে। বিরানীর মত খাবার ঝিনুকের মধ্যে ঠেসে দেয়া ।
আমাকে ঝিনুক ঠাসা বিরানী রাইস বা ভাত খেতে হল হাসিমুখে । তারপর তার সাথে আলাপচারিতা।
তার সহাস্য মুখখানিতে একরাশ মায়া আর কোমলতা ঠেসে দেয়া থাকলেও তাকে নিপূনতার সাথে কাস্টমারকে সামলাতে হচ্ছে । আমাকে আলাদা করে খাতির করার মত সময় কই তার।তবুও সময় দিলো খানিকটা।
আমি বললাম, তুমি কেন এটা করছ ? পরিবারের আর লোকজন নেই?
সে বলল, এটা আমার পরিবারের ব্যবসার একটা অংশ, এখন আমি করছি । রাত্রি বেলায় আমার স্বামী বসবে।
আমি কোন দেশ থেকে এসেছি শুনে বাংলাদেশটাকে সে চিনল। আমারও বেশ লাগল ।
সেটা সম্ভবত গার্মেন্টেসের কারনে । তার সপের পাশেই বিখ্যাত ইস্তিকলাল রোড। সেখানে পৃথিবীর সব ব্রান্ডের দোকানগুলো আছে । ব্রান্ডের অনেক পোশাকে বাংলাদেশের নাম ঝকঝকে ট্যাগে ঝকঝকে অক্ষরে লেখা থাকে।
তবে ইন্ডিয়ার নায়ক নায়িকারা তার কাছে বেশ পরিচিত।
তারও ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে। তাকে ঘুরে বেড়ানোর ব্যাপারে প্রশ্ন করায় বলল,
‘সারা পৃথিবীর মেয়েরা কিন্ত পুরুষের তুলনায় বেশী কাজ করে। কাজ করে পাশাপাশি বাচ্চাদের বড় করে যা তোমরা করোনা। ঘোরার সময় কই ?’ তবে বাচ্চারা বড় হলে , স্বাবলম্বী হলে সেও নাকি আমার মত ঘুরে বেড়াবে।
আমি বললাম, যখন ঘুরতে বের হবে প্লিজ বাংলাদেশকে তোমার লিস্টে রেখ।
সে হেসে বলল, ‘অবশ্যই’।
আইলাকে রেখে ইস্তিকলাল এভিনিউতে হাটতে হাটতে প্রথমে তাকসিম স্কয়ার ও পরে গাতালা টাওয়ার দেখবার প্লান মাথায়। কিন্ত তার আগে ইতিহাস জেনে নেব।
গাতালা টাওয়ার ঃ ১৩৪৮ সালের দিকে ইস্তাম্বুলের গোল্ডেন হর্নের উত্তর দিকে কনস্টান্টিনোপলের সময় রোমানীয় স্থাপত্য কায়দায় টাওয়ারটি তৈরী করা হয়। প্রায় ৬৭ ( ২০০ ফুট) মিটার উঁচু এই গালাতা টাওয়ারকে গ্রেট টাওয়ারও বলা হয় । যে সময় এটা তৈরী হয় তখন আর কোন সুউচ্চ টাওয়ার বা স্থাপনা শহরে ছিলনা তাই গালাতা টাওয়ারটি শহরের একমাত্র বড় ল্যান্ডমার্ক হিসাবে বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করে। যদিও ধারনা করা হয় টাওয়ারটির প্রথম গোড়াপত্তন হয়ে ছিল বাইজেন্টাইন এম্পেরর জাস্টিনিয়ানের আমলে ৫০৭ সালে। ১৫০৯ সালে অটোমান শাসক এটার সংস্কার করেন। তার অনেক পরে টাওয়ার থেকে সিটিতে স্পট লাইট ফেলার কাজে ববহার করা হত। কখনো জেলখানা হিসাবে ব্যবহার হত, কখনো মহাকাশ দেখার কাজেও ব্যবহার করা হত। অটোমান বা উসমানীয় আমলে হেজারফেন নামে এক ক্ষ্যাপাটে ভদ্রলোক নাকি প্রতিদিন টাওয়ারে আসত । এসে দুহাতে ডানা লাগিয়ে উড়ার চেষ্টা করত এবং ব্যর্থ হত । কিন্ত একদিন সত্যি সত্যি এই টাওয়ার থেকে হাতে ডানা লাগিয়ে ঝাঁপ দিয়ে উড়তে থাকে। এবং উড়ে উসকুদার নামন স্থানে পৌছায়। তারপর কিছুদিন মানুষ এই টাওয়ারটিকে হেজারফেন টাওয়ার নামে ডাকত।
গাতালা টাওয়ারের আশে পাশে জমে উঠেছে আড্ডা। নারী পুরুষের উচ্ছাস , কলধ্বনিতে মুখর চারিদিক।
ইস্তিকলাল এভিনিউঃ দেশী বিদেশীদের দারুন রকম উৎফুল্লতা লক্ষ করা যায় ইস্তিকলাল এভিনিউতে । প্রতিদিন প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ এই রাস্তায় ভ্রমন করে। সব মিলিয়ে দেড় কিলোমিটারের এই রাস্তায় রয়েছে এম্বেসি ,চার্চ মসজিদ, বুটিক, মিউজিকাল সপ,আর্ট গ্যালারী, থিয়েটার, লাইব্রেরী, নাইট ক্লাব, হোটেল, পাব এবং আছে লাইভ মিউজিক। রাস্তার চারপাশে সব অটোমান আমলের সুদৃশ্য বিল্ডিংস যা নিও-ক্লাসিকাল বা গথিক স্থাপত্য রীতিতে তৈরী। গালাতা টাওয়ার এই রাস্তাতেই পড়ে। এখানে সর্বত্র হাফ ইউরোপিউয়ান হাফ এশিয়ান কালচার চোখে পড়ার মত।
এবার আসি তাকসিম স্কয়ারে ।
তাকসিম স্কয়ার : স্কয়ারের কেন্দ্রে রিপাবলিক মনুমেন্ট নামক একটা বিখ্যাত মনুমেন্ট রয়েছে যা ১৯২৮ সালে স্থাপিত হয়। মূলত এই জায়গাটাতে অনেক আগে মানে অটোমানদের সময়ে বড় জলাধার ছিল এবং সেখান থেকে পানি শহরের এই এলাকার সবখানে বন্টন করা হত । আসলে তাকসিম শব্দের অর্থই হল ‘বন্টন বা বিতরন বা ডিস্ট্রিবিউশন’। এই কারনেই যে নামকরন তা বোঝা যায়। এখানে এই স্কয়ারে ২০১৩ সালে পার্কের বদলে দোকানপাট স্থাপনের বিরুদ্ধে একটা মুভমেন্ট হয়েছিল যা ‘তাকসিম দখল’ মুভমেন্ট নামে পরিচিতি পেয়েছিল। স্থানটি এখন আমাদের দেশের পল্টনের মত।