নকল মাস্কে ছড়াছড়ি

এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন সাস্থ্য

বিশেষ প্রতিবেদক : করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এখন ফেসিয়াল মাস্ক কিনতে ব্যস্ত। ভালো চাহিদা থাকায় দেশব্যাপী ফার্মেসির বিক্রেতা থেকে শুরু করে ফুটপাতের বিক্রেতা, মুদি ও কাপড়ের দোকানের ব্যবসায়ীরাও দেদারসে বিক্রি করছেন মাস্ক। বাজার ছেয়ে গেছে লাল, নীল, বেগুনি, গোলাপি হরেক রং এবং সাধারণ কাপড়ে তৈরি মাস্ক ও এন৯৫ মাস্কে। কিন্তু মাস্কগুলো এতই নি¤œমানের যে এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করছেন। ব্যবহারকারীরাও জানিয়েছেন নিজেদের অসন্তোষের কথা।
অন্যদিকে মাস্কের গুণগত মান খতিয়ে দেখা এবং উন্নত মান নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব কেউ পালন করেনি। অথচ সুরক্ষাসামগ্রীটি এখন বাংলাদেশে নিত্যব্যবহার্য পণ্য হয়ে উঠেছে। পণ্য ও সেবার মান নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বলছে তাদের আওতাভূক্ত পণ্য না হওয়ায় মাস্কের মান পরীক্ষার কাজ করতে পারছে না তারা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বাজারে বিক্রি হওয়া মাস্কগুলোর বেশির ভাগই নকল। বিশেষ করে এন৯৫ মাস্কটি হুবহু নকল করে তা বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এসব ব্যবহারে একদিকে ভাইরাস প্রতিরোধ হওয়া নিয়ে যেমন সন্দেহ রয়েছে, তেমনি আছে স্বাস্থ্যঝুঁঁকি। বাজারে এখন যে মাস্কগুলো পাওয়া যাচ্ছে এর বেশির ভাগই বড়জোর ব্যবহারকারীকে ধুলাবালি থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম। কিন্তু এগুলো ভাইরাস প্রতিরোধে অকার্যকর। লক্ষ্য করে দেখা যায়, যেসব মাস্ক বিক্রি হচ্ছে সেগুলোতে যেদিক দিয়ে বাতাস ফিল্টার হয়ে ঢোকার কথা সেখানে ফিল্টার পেপার নেই। বরং সাদা বক্স বরাবর অংশে কাপড় দেওয়া। ফিল্টার পেপারের বদলে শক্ত ফোম দিয়ে মাস্ক তৈরি করা হচ্ছে। অথচ একটি ভালো মাস্কে যে ফিল্টার পেপার ব্যবহার করা হয় তা কমপক্ষে পিএম ২.৫ মানের। এটি দেখতে অনেকটা রাবারজাতীয় এবং এতে থাকা ছিদ্রকে মাইক্রোপোর বলে। বাতাসে থাকা ভাইরাস এই ছিদ্রের ফাঁকে আটকে যাওয়ার কথা। কিন্তু নকল মাস্কগুলোর ভাইরাস আটকানোর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ আছে। একশ্রেণির ব্যবসায়ী লাভের আশায় শপিং ব্যাগে ব্যবহৃত পেপার দিয়ে যেনতেনভাবে ভেন্টিলেশন ক্যাপ লাগিয়ে মাস্ক তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছেন। এই মাস্কগুলোর অনেকগুলো নন-ওভেন কাপড় দিয়ে তৈরি, যা অত্যন্ত নি¤œমানের আর এর সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে প্লাস্টিকের ফিল্টার। অথচ ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিশন কর্তৃপক্ষের মতে, সাধারণ সার্জিকাল মাস্ক এবং এন৯৫ মাস্কগুলো এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন এগুলো দিয়ে সহজে শ্বাস নেওয়া যায়। কিন্তু দেশে যেসব মাস্ক পথেঘাটে বিক্রি হচ্ছে তা দিয়ে ব্যবহারকারীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত ছিল বাজারের সব ধরনের মাস্ক ও স্যানিটাইজারের নমুনা পরীক্ষা করে গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য বিএসটিআইকে তাগিদ দেওয়া।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশনের মান উইং এর পরিচালক নিলুফা হক বলেন, যেসব পণ্যগুলো বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) এর আওতাভূক্ত সেগুলিকে আমরা ধরতে পারি। আওতার বাইরের কোন পণ্যকে আমরা ধরতে পারি না। যেহেতু মাস্ক এখনো আমাদের আওতার মধ্যে নেই সেহেতু আমরা পণ্যটি যাচাই-বাচাই করতে পারছি না।
এদিকে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রীর মান নিয়ে ব্যাপক আইনি মনিটরিং দরকার বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে এডভোকেট আব্দুল মোমিন শেখ বলেন, বর্তমানে নকল ও ভেজাল পণ্য রোধে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ও বিএসটিআই অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। বিএসটিআই আইন-১৯৮৫ সংশোধন করে ২০১৮ সালে নতুন আইন করা হয়। নতুন আইনেও জরিমানা দুই লাখ টাকা এবং সাজার মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই বছর নির্ণয় করা হয়। আইনে দুই লাখ টাকা জরিমানা তেমন কিছুই মনে করছে না অসাধু ব্যবসায়ীরা। এটা এক ধরনের দুর্বলতা। আইনের এই দুর্বলতা দূর করা দরকার। আইনটি হওয়া উচিত জামিন অযোগ্য। কারণ অপরাধীরা অপরাধ করে জামিন পেয়ে যায়। নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত আইন দিয়ে নকল ও ভেজাল পণ্য রোধে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল বা ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ করতে না পারলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তীব্র আকারে বাড়বে। সরকারকে যেভাবেই হোক এসব বন্ধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু পদক্ষেপ নিলে হবে না, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নকল পণ্য রোধে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নকল পণ্যের বিষয়ে সাধারণ ভোক্তা বা নাগরিককে সচেতন করতে হবে, যাতে তাঁরা ক্রয়ের সময় অধিকতর সতর্ক থাকে। সচেতনতা তৈরি হলে ভোক্তা নিজেই নকল পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকবে। নকল পণ্য ঠেকাতে সরকার এবং আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।