বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা

জাতীয়

ইভা সাহা : মহান “বিজয় দিবসের” শুভেচ্ছা! সকল শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী সকল শ্রেনি পেশার সৈনিকদের প্রতি রইল আমার বিনম্র শ্রদ্ধা…… সেই সাথে ৭১ এর স্মৃতির পাতা থেকে আমার শ্রদ্ধেয়া “মা” অরুনা সাহা এর ( রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত কন্ঠযোদ্ধা) জীবনের কিছু সত্য কাহিনী বা ঘটনা তুলে ধরলাম! তার ত্যাগ ও মহিমার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে……..১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সময়ের কথা, আমার মা” তখন রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্রী।১৯৬৮ সাল থেকেই তিনি খুলনা বেতার ও ঢাকা বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হয়,মা তখন ফরিদপুরেই ছিলেন তার পরিবার সহ, সকল শিল্পীদের একটা লিস্ট তৈরি করা হলো, যেন দেখা মাত্রই এদের কে গুলি করে মেরে ফেলা হয়!১৪৪ ধারা জারি হলো ফরিদপুর শহরে,চারিদিকে পাকিস্তানি সেনারা ঘিরে রেখেছে, এই অবস্থায় আমার “মা” জীবনের মায়া ভুলে গিয়ে,পরিবারের মা, বাবা, ছোট ছোট আদরের ভাই বোনদের ফেলে, নাম লিখালেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসাবে!এ পথ খুব সহজ ছিল না, জীবন বাঁচাতে গভীর রাতে সবার অনুমতি নিয়ে ঘর ছাড়লেন মা, কিছু পথ পায়ে হেটে,কিছু পথ নৌকা করে, কিছু দূর গরুর গাড়িতে,কিছু পথ কাদামাটি পেরিয়ে একটু একটু করে বহু কস্টে, পাছে চিন্তা এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম,ধরা পড়লে ওরা কোথায় নিয়ে যাবে? তার থেকে ওরা গুলি যদি করে মরে যাবো দুঃখ নেই, তবু এখন থেমে থাকার সময় নয়!যেতে হবে বহুদুর জীবন বাজি রেখেই! এসব সত্যি কাহিনী “মা এর থেকে শুনেই বড় হোয়েছি! মা বলেছেন,এর পরে সে ভারতে পৌছাতে পেরেছেন, আরও বলেছেন, পরিবারের কথা, ভাই বোনদের কথা, নিজের বাবা, মায়ের কথা কিছুই তখন আর তিনি ভাবেন নি,ভেবেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভেবেছেন দেশের মানুষের জন্য! মুজিবনগর সরকারের প্রধান মন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদ ” স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্রের শিল্পীদের ভারতের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার নির্দেশ দেন! পরে ব্যারিস্টার ” বাদল রশিদের নেতৃত্বে, চিত্র পরিচালক দিলিপ সোমের “” বিক্ষুব্ধ বাংলা ” গীতি আলেখ্য নিয়ে,১৪ সদস্যের একটি ক্যালচারাল ট্রুপ নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফান্ড গঠন করার উদ্দেশ্যে ভারতের বোম্বে সহ,মহারাষ্ট্র, দিল্লী, গোয়া, পুনা, কানপুর, ইত্যাদি জায়গায় “” গণসংগীত “” পরিবেশন করেন,এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কম্বল, পুলওভার,শতরঞ্চি, ওষুধ সামগ্রী সহ শরণার্থীদের জন্য ১১ লক্ষ টাকা নগদ অর্থ দান করেন তৎকালিন সময়ে! মা যে ক্যাম্পে ছিলেন তার নাম ছিল “”গোবরা””” ক্যাম্প! এই ক্যাম্পের অনেক শিল্পীর তালিকা আছে, আমি কয়েক জনার নাম উল্লেখ করছি, এই ক্যাম্পের শিল্পীরা হলেন, শ্রদ্ধেয় শিল্পী আব্দুল জব্বার স্যার, আপেল মাহমুদ স্যার, নমিতা ঘোষ, রথীন্দ্রনাথ রায়, রমা ভৌমিক, আরও অনেক নাম জানা অজানা শিল্পী বৃন্দরা। এই সকল প্রোগ্রাম পরিচালনা করতেন বোম্বের চিত্রাভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমান, সংগীত পরিচারক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলীল চৌধুরী, সবিতা চৌধুরী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও যুগ্ম সচিব সলিল ঘোষ। মুক্তিযুদ্ধএর দিনগুলো কস্টের মধ্যেও ছিল আনন্দের, ছিল স্বাধীনদেশ গড়ার স্বপ্ন! দীর্ঘ ৯ মাস সবাই কে ছেড়ে শুধু দেশের মানুষের মুক্তির জন্য রোদ, বৃস্টি, ঝড় এর মধ্যেও খোলা, ছাদ নেই ট্রাকে ট্রাকে ঘুরে ঘুরেও মুক্তির গান গেয়েছেন রাস্তায় রাস্তায়, সেটা “মুক্তির গান” নামক সিনেমায় খুব ভালোভাবে বর্ননা করা আছে, এই মুক্তির গান গাওয়া শিল্পী দের নিয়ে, তারা কি করে গান করেছেন তারই ধারাবাহিকতায় নির্মিত হয় ছবিটি!! সেই সময়কার কিছু গান এর কথা লিখছি… প্রথম রেকর্ড হয় যখন তাতে আমার মা এর কন্ঠটিও দলিল হয়ে রয়ে যায় ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে,কেউ মনে রাখুন আর নাইবা রাখুন,কেউ জানুক বা নাইবা জানুক, তাতে কি?? “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে” জয় বাংলা,বাংলার জয় “” শোন একটি মুজিবর কন্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের ” সালাম সালাম “সোনা, সোনা, একটি ফুলকে বাচাবো বলে, জয় বাংলা বাংলার জয়” রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি” আরো গান আছে আমি সংক্ষিপ্ত করে লিখছি, তখন এই গানগুলো শুধু হারমনিয়াম ও তবলা দিয়ে সর্ব প্রথম রেকর্ড করা হয়। “মা ” সব সময় নিজেকে ধন্যমনে করতেন, নিজের দেশের জন্য কিছু কাজ করতে পেরেছিলেন বলে। মাঝে মাঝে না পাওয়ার বেদনা গুলো প্রকাশ করতেন, সরকারী স্বীকৃতি পেলেন বটে,কিন্ত ততক্ষনে বড্ড দেরী হয়ে গেছে,শুধু শেষ সম্মানটুকু নিয়েই চলে গেলেন অভিমান করে না ফেরার দেশে!! রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চীর বিদায় নিলেন ৭১ এর ” মুক্তির গান ” এর সম্মানীত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্রের শিল্পী কন্ঠ যোদ্ধা আমার মা” অরুনা সাহা………. ( মৃর্তু ১৪ই মার্চ ২০১৯)