গ্যাস সংকটে রাজধানীবাসী

অর্থনীতি এইমাত্র রাজধানী

বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ

 

বিশেষ প্রতিবেদক : শীত আসতে না আসতেই রাজধানীতে চরম আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। বিশেষ করে রাজধানীর নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেলায় থাকছে না গ্যাসের চাপ। তবে বেশ কিছু এলাকায় গভীর রাতেও পাওয়া যাচ্ছে না গ্যাস। এতে বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে দৈনন্দিন রান্নাবান্নার কাজ সারতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
আর এতে একদিকে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম দেওয়ার পাশাপাশি পরিশোধ করতে হচ্ছে নির্ধারিত গ্যাসের বিলও। ফলে নগরজীবনে খরচের এমন বাড়তি চাপে নাভিশ্বাস করোনা পরিস্থিতির থাকা বাসিন্দাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর-বছিলা, রায়ের বাজার, লালবাগ, কেরানীগঞ্জ, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, কাজীপাড়া, কাঁঠালবাগান এবং বাড্ডাসহ বেশক’টি এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার বাসিন্দা জিল্লুর রহমান জানান, শীতের শুরু থেকে দিনের বেলায় গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। ৫ তলায় বসবাসকারী এই বাসিন্দা বলেন, রাত ১টার দিকে গ্যাস আসলেও তা নিচের তলায় যতটা চাপ থাকে আমরা যারা ওপরে থাকি তারা সেটাও পাচ্ছি না।
একই এলাকার চন্দ্রিমা মডেল সিটির এক ভবনের কেয়ারটেকার মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, এক মাস আগে থেকেই আমাদের এলাকায় গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে। গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ ভাড়াটিয়ার মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অবশেষে বাড়িওয়ালা প্রত্যেক ভাড়াটিয়ার জন্য সিলিন্ডার কিনে দিয়েছেন। এখন শুধু ভাড়াটিয়াদের তা রিফিল করতে হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের আরো একজন বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম জানান, প্রতিবছরই এই সমস্যা হয়। কিন্তু সমস্যা সমাধান হতে দেখি না। কেউ কথাও বলে না। এটা আমাদের জন্য নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল ৯টার আগেই গ্যাস চলে যায়। তাড়াহুড়া করে রান্না শেষ করতে হয়। আর দুপুরে চুলা জ্বলে না। যদি দরকার হয় তবে আলাদা সিলিন্ডার কিনে রাখা আছে সেটা দিয়ে কাজ সারতে হয়। কিন্তু এতে আমাদের খরচ বেড়ে যায়। কারণ প্রতি মাসে গ্যাস বিল তো দিতেই হয়।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শীতে রাজধানীর একটি বড় অংশের বাসিন্দাদেরই গ্যাস সংকটের কারণে দুর্ভোগে পড়তে হয়। রান্নার কাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, কখন চুলায় গ্যাস আসবে, গ্যাসের চাপ বাড়বে, আবার চাপ কমার আগেই রান্নার কাজ শেষ করতে হয়। এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয় গৃহিণীদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মূলত শীতপ্রধান দেশে গ্যাসের সঙ্গে থাকা কনডেনসেট স্বাভাবিক রাখতে হিটার বা উত্তপ্তকরণের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নেই। এটি সরবরাহ স্টেশনগুলোতে থাকে। তবে সেগুলো দূরে থাকায় শীতের সময় গ্যাস গ্রাহকদের নলে আসতে আসতে আবার কনডেনসেট জমে যায়। এ ছাড়াও মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং চাহিদার তুলনায় সাপ্লাই কম থাকার কারণেই এ সংকট তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তিতাসের জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণ শাখা (উত্তর) ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আনোয়ার পারভেজ জানান, গ্রাহকদের সংখ্যার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ থাকায় এমন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় গ্রাহক বেশি সেসব এলাকায় এমন সংকট তৈরি হয়েছে। এখন একসঙ্গে তুলনামূলক বেশি গ্রাহদের সেবা দিতে গেলে এই সমস্যা হতে পারে। মিরপুর ১২ নম্বরসহ আরো কিছু এলাকায় এটা বেশি হয়। গ্যাসের চাপ কমে যায়। আবার কোনো কোনো সময় গ্যাস চলেই যায়।
বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ : আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ গঠিত অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ জন্য তিতাসহ অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনা চাওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ বিষয় টাস্কফোর্সের প্রধান জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবুল মনসুর বলেন, ‘আমরা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারবো বলে আশা করছি। সারাদেশে তিন লাখ ১৭ হাজার ২৭৫টি অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করেছিল বিতরণ কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই লাখ ৫২ হাজার ৪৪৩টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এ সময় ৩৪৪ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগের পাইপ লাইন উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে এখনও এ ধরনের ২৬৩ কিলোমিটার পাইপ লাইন রয়ে গেছে; যা দিয়ে অবাধে গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে। এখনও ৬৩ হাজারের মতো অবৈধ গ্রাহক রয়ে গেছে।’
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) টাস্কফোর্সের সভায় কোম্পানিগুলো তাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করে।
জানা যায়, এখনও দেশে গ্যাসের বিতরণ পর্যায়ে ছয় ভাগেরমতো সিস্টেম লস রয়েছে। গ্যাস যেহেতু পাইপ লাইনে পরিবহন হয়, তাই এত বেশি পরিমাণ সিস্টেম লস হয়। কিন্তু এটি গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মাত্র ২ ভাগ সিস্টেম লস গ্রহণ করে। তাহলে বাকি ৪ ভাগ সিস্টেম লসের কী হবে। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো এই সিস্টেম লসকে কায়দা করে অন্য গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়। এতে করে সামগ্রিকভাবে গ্যাসের বিলও বেশি আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার এখন দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করছে। উচ্চ দরে এসব এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। আমদানি খরচ তুলতে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু গ্যাস চুরি হওয়ায় সরকারের পাশাপাশি বৈধ সংযোগধারীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। তাই অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে বিতরণ কোম্পানি যে তথ্য তুলে ধরেছে তাতে বলা হচ্ছে, এখন যা অবৈধ সংযোগ রয়েছে তার পুরোটাই নারায়ণগঞ্জে। ফতুল্লা এলাকায় অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করতে গিয়ে প্রায় ৬০০ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। বৈঠকে অবৈধ সংযোগ বিছিন্ন করার ক্ষেত্রে নানামুখী চাপ উপেক্ষা করে কাজ করতে হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।