অভয়নগরে বিদ্যালয়ের জমি বেদখল করায় প্রধান শিক্ষকসহ ১১ জনের নামে মামলা

অপরাধ শিক্ষাঙ্গন সারাদেশ

অভয়নগর প্রতিনিধি : অভয়নগরে ঘোপের ঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ সংলগ্ন বিরোধীয় জমির প্রাচীর ও দোকান ভাংচুর এবং লুটপাটের অভিযোগে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা ও প্রধান শিক্ষক সহ ১১ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন ঐ জমির মালিকানা দাবিদার ইকরামুল কবির নামের এক ব্যক্তি। মামলায় বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষককে আসামী করা হয়েছে।
বিগত রোববার যশোর বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারী আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলা সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আলতাফ গাজীর ছেলে ইকরামুল কবির ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে মহাকাল মৌজার ঘোপেরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ১১২ দাগের পাঁচ শতাংশ জমি রুহুল আমিন গংয়ের নিকট থেকে ক্রয় করেন। যার দলিল নং- ৫১৪২। জমি ক্রয়ের পর টিনের প্রাচীর দেন এবং একটি দোকানঘর স্থাপন করে ব্যবসা শুরু করেন।
এদিকে অভয়নগর উপজেলার ঘোপেরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত জমি বিদ্যালয়ের দাবি করে অবৈধ দখলের অভিযোগ এনে যশোর জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল হুসাইন খাঁন খতিয়ে দেখছেন। উভয়পক্ষকে নোটিশ করে বিষয়টির ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০২১ সালের ২ জানুয়ারি শনিবার সকালে স্থানীয় এলাকাবাসী ও ঐ বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জমি অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে যশোরÑখুলনা মহাসড়কের চেঙ্গুটিয়া বাজারে মানববন্ধন করেন।
ঘোপেরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত-১৯২৮ সালে ইংরেজী। ঐ এলাকার তৎকালীন জমিদাতা শশী ভুষন সাহা মহাকাল মৌজার ৫৮ শতক জমি বিদ্যালয়ের নামে দান করেন। একই মৌজায় ২০৩ দাগের- ৯ শতক, ২০৪ দাগের- ২১ শতক ও ২১৫ দাগের- ২৮ শতক। মোট জমি ৫৮ শতক জমি ঘোপেরঘাট সরকারি ্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে দান দলীল করে দেন। মহাকাল মৌজার ২১৩ খতিয়ানের, জেএল নম্বর-১৯ এর ২০৩ দাগের- বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের ৯ শতক জমির মধ্যে ৫ শতক জমি নিয়ে এই বিরোধ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তৎকালীন জমিদাতা শশী ভুষন সাহা ১৯২৮ সালে বিদ্যালয়ের নামে ৩ দাগের ৫৮ শতক জমি দান দলীল করে দেন। ১৯৬৩ সালে শশী ভুষন সাহা বাংলাদেশ ত্যাগ করে পরিবারের সবাই ভারতে চলে যান। ১৯৬২ সালের এসএ রেকর্ড অনুযায়ী ৯ শতক জমির রেকর্ড ভুল হয়ে ৫শতক জমি রুহুল আমীন গং এবং ৪শতক জমি রজব আলী গং এর নিকট রেকর্ড হয়। ১৯৬৪ সালের একটি দলীল দেখিয়ে ঐ এলাকার ইকরামুল কবির নামের এক ব্যাক্তির নিকট ৩ লক্ষ টাকায় ৫শতক জমি বিদ্যালয়ের খেলারমাঠ হিসেবে বিক্রয় করেন। তারই সূত্র ধরে ইকরামুল কবির জমির মালিকানা দাবী করে বিদ্যালয়ের খেলারমাঠে কচা ও পাতলা টিন দিয়ে ঘিরে একটি কাঠের দোকান ঘর স্থাপন করে দখলে যায়। স্থানীয় এলাকাবাসী এবং ঐ বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা বিগত শনিবার সকালে মানববন্ধন শেষ করে খেলারমাঠে অবস্থিত অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে যে যার মতো নিয়ে চলে যায়। এই মানববন্ধনে ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রীতা পোদ্দার ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের অনুরোধে বক্তব্য রাখায় তাকে সহ মোট ১১ জনের নামে ইকরামুল কবির বাদী হয়ে যশোর বিজ্ঞ আদালতে একটি ভাংচুর ও লুটপাটের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন।
আসামীরা হলেন, ঘোপেরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রীতা পোদ্দার, উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের মৃত আব্দুল লতিফ মোল্যার ছেলে স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা শফি কামাল, একই গ্রামের মৃত- সলেমন মোল্যার ছেলে আবুল হোসেন, আবুল মোল্যার ছেলে রিপন মোল্যা, মহাকাল গ্রামের নরেন্দ্র ঘোষের ছেলে মন্টু ঘোষ, একই গ্রামের আব্দুল্লাহ শিকদারের স্ত্রী তানিয়া বেগম, বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে খলিল মোল্যার ছেলে ফারুক মোল্যা, মৃত- কেরামত আলীর ছেলে আয়ুব আলী, মহাকাল গ্রামের নারায়ন সাহার ছেলে দেবাশীষ সাহা, একই গ্রামের রবিউল ইসলামের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, মিজান মোল্যা ও তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা এবং বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের হাই মোল্যার ছেলে টনি মোল্যার নেতৃত্বে ওই জমির উপর থাকা টিনের প্রাচীর ও দোকানঘর ভেঙ্গে ফেলার অভিযোগ করেন এবং ভেঙ্গে ফেলা দোকান ও টিনের প্রাচীরের সকল মালামাল কয়েকটি নসিমনে করে লুট করে নিয়ে যাওয়ার কথা মামলায় উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ইকরামুল কবিরকে প্রাণ নাশের হুমকি সহ মিথ্যা মামলার ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে মামলার বাদী দাবী করেন।
ঘোপেরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রীতা পোদ্দার বলেন, দীর্ঘদিনের বিদ্যালয়ের খেলাধুলা করার মাঠটি অবৈধভাবে দখল করে রাখার ফলে ছাত্রছাত্রীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারতো না। এই সমস্যার বিষয় ছাত্রছাত্রীদের থকে তাদের অভিভাবকরা এবং স্থানীয় এলাকাবাসী শুনে বিদ্যালয়ের সামনে একটি মানববন্ধন করে। মানববন্ধন শেষে হঠাৎ সকল উপস্থিতি উত্তেজিত হয়ে অবৈধ দখলটি ভাংচুর করে যে যার মতো নিয়ে চলে যায়। আমি এই বিষয়টি নিয়ে কাউকে কিছু বলিনিও। তারপরও আমার নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
এই বিষয় নিয়ে জমির মালিকানা দাবীদার ইরামুল কবির বলেন, ঐ জমিটি বিদ্যালয়ের না। সঠিক কাগজপত্র দেখে আমি জমি ক্রয় করেছি। এখন দখল স্বত্ত বুঝে নিতে জমিতে একটি কাঠের দোকান তৈরী করে ব্যবসা শুরু করি এবং সিমানা প্রাচীর হিসেবে টিন দিয়ে ঘিরে রাখি। কিন্তু কিছু স্বার্থানৈষী লোকজন বিদ্যালয়ের জমি বলে আমার দোকান ঘর এবং সিমানা প্রাচীর ভেঙ্গে লুটপার্ট করে নিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আনুমানিক ১লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবী করেন। আমি এই ভাংচুর ও লুটপাটের জন্যে ১১ জনের নামে যশোর কোর্টে একটি মামলা করেছি।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল হুসেইন খাঁন জানান, ঘোপেরঘাট স্কুলের জমি দখলের একটি অভিযোগ পেয়েছি। উভয়পক্ষকে ডাকার জন্য ইতোমধ্যে নোটিশও পাঠানো হয়েছে। দুই পক্ষকে ডেকে বিষয়টি মিমাংশার জন্য চেষ্টা করবো। শুনেছি ওখানে ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। ঐ জমির মালিকানা দাবিদার ও মামলার বাদি ইকরামুল কবির তার কাছে জমির কিছু দলিলপত্রাদি আছে, যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দেখাগেছে, ২০০০ সালের ৮৩৪ নং খতিয়ান যার জেএল নং ১৯ এ ১১২ দাগের ৫ শতক জমির মালিকানা দেখানো হয়েছে রুহুল আমিন নামের জনৈক ব্যক্তি। এবং জমির শ্রেণি উল্লেখ করা হয়েছে ‘ডাঙ্গা’ এবং যার হাল খতিয়ান যার নং ৬৯৬, জেএল নং-১৯ এ জমির মলিকানায় উক্ত ব্যক্তির নাম থাকলেও জমির শ্রেনি উল্লখ করা হয়েছে ‘খেলার মাঠ’ হিসেবে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।