বাজারে বিপজ্জনক যৌনপণ্যে মৃত্যু ঝুঁকিতে তরুন-তরুনীরা

এইমাত্র অপরাধ সাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিপজ্জনক বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার অন্যতম উপাদান ‘ফরেন বডি’সহ অন্যান্য পণ্য বাজারে হাতের নাগালেই পাওয়া যাচ্ছে! কেবল তাই নয়, অনলাইনে অর্ডার করলে মৃত্যু ঝুঁকিতে ফেলা এসব পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে কাস্টমারের বাসায়। বিশেষ করে অল্প বয়স্কদের ‘সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি’ উপভোগে এসব পণ্য মৃত্যু ডেকে আনছে। সম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগানে মাস্টার মাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের এই ছাত্রী আনুশকা (১৭) হত্যার বিষয়ে অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে এসব তথ্য। আনুশকা হত্যার ঘটনায় ইংলিশ মিডিয়ামের ‘এ’ লেভেলের ছাত্র ফারদিন ইফতেখার দিহানকে (১৮) গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনার অনুসন্ধানে ‘ফরেন বডি’র ক্লু পাওয়া যায়। যে ফরেন বডির কারনে যোনিপথ ও রেক্টাম থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে আনুশকা। ওই প্রতিবেদনের পর থেকেই গোটা দেশে ‘ফরেন বডি’ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি কল করেই যে কেউ অনলাইনের বিভিন্ন নামি-বেনামি প্রতিষ্ঠান থেকে মারাত্মক ক্ষতিকর এসব পণ্য হাতে পেয়ে যাচ্ছেন। এসব পণ্যের ভেতর রয়েছে যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রা ট্যাবলেটও। এই ট্যাবলেট কিনতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বাধ্যতামূলক হলেও যে কেউ ফার্মেসিতে বা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কিনতে পারছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের যৌনপণ্য আমাদের তরুণ সমাজকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ। সম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগানে ধর্ষণের পর রক্তক্ষরণে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আনুশকা নামের ঐ ছাত্রীর দেহে ‘ফরেন বডি’র আলামত মিলেছে। আনুশকা নূরের ময়নাতদন্ত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, স্বাভাবিক পেনিস দ্বারা রেক্টাম ও যৌনাঙ্গ ব্যবহার করলে এতোটা ভয়াবহ পরিণতি হওয়া কথা নয়। শরীরের নিম্নাঙ্গে ‘কোন ফরেন বডি’ কিছু একটা ব্যবহার করা হয়েছে। এক কথায় সেখানে বিকৃত যৌনাচার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার পোস্টমর্টেম জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, স্বাভাবিক পেনিস (পুরুষাঙ্গ) দ্বারা এই ইনজুরি মোটেও সম্ভব না। ওটা পেনিসের বাইরে অন্য কিছু ছিল।’
ডা. সোহেল মাহমুদ আরও বলেন, যৌনিপথ ও পায়ুপথ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ তার (আনুশকার) মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এই প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় সে ‘হাইপো ভোলেমিক’ শকে মারা গেছে। মানুষের মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা দেহ থেকে অতিরিক্ত তরল বের হয়ে গেলে হৃদপিণ্ড স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়। এ কারণে হৃদযন্ত্র শরীরে রক্ত সরবরাহ করতে পারে না, মানুষ মারা যেতে পারে।
বিকৃত যৌনাচারের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যোনিপথ ও পায়ুপথ দুই রাস্তা থেকেই আমরা রক্তক্ষরণের আলামত পেয়েছি। আমরা জোর জবরদস্তির কোনো আলামত পাইনি। তবে যোনিপথ ও পায়ুপথে কিছু ইনজুরি আমরা পেয়েছি। মূলত সেই ইনজুরিগুলোর জন্যই সেখান থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। কিন্তু বডির অন্য কোথাও জোরাজুরির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।’

রাজধানী ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনা পর্যবেক্ষণে চিকিৎসক ‘ফরেন বডি’র কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে আলোচনায় উঠে এসেছে বিকৃত যৌনরুচি মেটাবার বিভিন্ন উপাদান বা পণ্যের কথা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অনলাইনে খোঁজ করলেই হাতের মুঠোয় চলে আসছে বিকৃত যৌনাচারের বিভিন্ন পণ্য। এছাড়াও ফেসবুকে হরহামেশাই পপ আপ বিজ্ঞাপনে উঠে আসছে বিভিন্ন যৌনসামগ্রী। এইসব যৌনসামগ্রী পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে বৈধ হলেও বাংলাদেশে অবৈধ। তবুও আড়ালে আবডালে এসব পণ্য কিনতে সক্ষম হচ্ছেন যেকোন বয়সের ক্রেতারা। দোকানিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা দাবি করেন শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্করাই তাদের ক্রেতা।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, যৌনপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এই পণ্যগুলোর কিছু বৈধ আর কিছু একেবারেই অবৈধ। যেমন ‘ম্যাজিক কনডম’ নামের একটি বিশেষ কনডম বাজারে রয়েছে যা এক হাজারেরও বেশিবার ব্যবহার করা যায় বলে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। বিক্রেতাদের দাবি, এটি একটি বৈধ পণ্য। এর ড্রাগ লাইসেন্সও রয়েছে।

এ বিষয়ে এশিয়ান স্কাই শপের এক্সিকিউটিভ অফিসার মেহেদি হাসান জানান, ম্যাজিক কনডমটা আমরা বিক্রি করি। এটা বৈধ, তবে অন্যান্য আরো পণ্য আছে যা বৈধ নয়। যেমন ‘ডিলডো’, ‘ফ্লাশলাইট’, বিভিন্ন ‘যৌন উত্তেজক ক্যাপসুল’, ‘স্প্রে’ ইত্যাদি।

সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে পেজ খুলে ও ইউটিউবে চ্যানেল খুলে বহু কালোবাজারি এসব বিক্রি করছে। তাদের অন্যতম পণ্য হচ্ছে, ডিলডো (পুরুষের যৌনাঙ্গের ন্যায় প্লাস্টিক বা সিলিকন দিয়ে তৈরি বস্তু), প্লাস্টিক বা সিলিকনের তৈরি ম্যাজিক কনডম, যৌন পুতুল (সেক্স ডল), স্প্রে ও ভায়াগ্রা। এসব পণ্যের বিভিন্ন রং, প্রকার ও আকার রয়েছে।

তাহলে এই ‘অবৈধ’ পণ্যগুলো বিক্রি হচ্ছে কীভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমরা কেউ কোন পণ্য চাইলে তাকে কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেই। বিভিন্ন নামিদামি অনলাইন শপের মাধ্যমে আমাদের পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয়। তবে আমরা ‘ডিলডো’, ‘ফ্লাশলাইট’ বা যেকোন ‘যৌন উত্তেজক পণ্য ডিসপ্লেতে’ রাখি না।

অবৈধ হলেও এসব পণ্য দেশে ঢুকছে কী করে তা খোঁজ করে জানা যায়, এয়ারপোর্ট এলাকায় শাজাহান নামের এক নেতার হাত ধরে ‘ডিলডো’ ও ‘টয় ভ্যাজাইনা’ বাংলাদেশে ঢুকছে। সেখান থেকেই অন্যান্য দোকানিরা তাদের অনলাইন শপের জন্য পাইকারি হারে কিনছেন এসব পণ্য। পরে তা অনলাইনে মুখরোচক বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। টেলিমার্কেটিংয়ের এই যুগে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে এসব পণ্যের বিস্তার।

এছাড়াও বাজারে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ইরেকটাইল ডিসফাকশনের ওষুধ ভায়াগ্রা (সিলডেলাফিল) ট্যাবলেট। এসব ট্যাবলেট সেবন করা হয় দীর্ঘক্ষণ যৌনক্রিয়ার লক্ষ্যে। উৎসুক মন থেকে বা আগ্রহ থেকে প্রায়ই তরুণরা আকৃষ্ট হয়ে কিনছে এসব ট্যাবলেট। বিধিনিষেধের মুখোমুখি হতে হয় না বলে যে কেউই এই ট্যাবলেট কিনতে পারছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধের ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াল ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে জানা যায়।