স্বপ্নের ফ্ল্যাট-প্লট কিনতে পা ফেলুন সাবধানে

অর্থনীতি

ভূল হলেই সারা জীবনের ভোগান্তি

 

কামাল মাহমুদ : নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সবার জন্য আবাস্থল জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে আবাসন অন্যতম। সব শ্রেণীর নাগরিকের জন্য এক জীবনে একটা বাড়ি বা নিদেনপক্ষে একটা দুই-তিন রুমের ফ্ল্যাট নিজ মালিকানায় আয়ত্ত করতে না পারলে জীবনের অন্য সাফল্যগুলোও ব্যর্থতার তালিকায় চলে আসে। রাজধানী ঢাকাতে এখন বাড়ি করাটা মধ্যবিত্তদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। যারা উচ্চবিত্ত তারা প্লট কিনছেন। প্রয়োজনে সেখানে ফ্ল্যাট বানিয়ে ভাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্তরা পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েছেন ফ্ল্যাটের দিকে। এই ফ্ল্যাট এবং প্লট কিনতে ভোগান্তির শেষ নেই।

দেশে অনেক নামি দামি আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ডেভেলপার কোম্পানিদের সরকার স্বীকৃত একমাত্র শক্তিশালী সংগঠন হচ্ছে রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। রিহ্যাব এর মেম্বার আছে হাজারের উপরে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো রিহ্যাব এর মেম্বার না। সবচেয়ে বেশি প্রতারণার ঘটনা ঘটাচ্ছে এই ননরিহ্যাব আবাসন কোম্পানিগুলো। কাজেই ফ্ল্যাট-প্লট কেনার জন্য রিহ্যাব এর সদস্যভূক্ত কোম্পানিগুলোর নিকট থেকে কেনা উচিত বলে আমি মনে করি। নাগরিকদের আবাসনের স্বপ্নকে সত্যি করতে অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান অ্যাপার্টমেন্ট/ফ্ল্যাট তৈরি করে সেগুলোর বাহারি বিজ্ঞাপন নিয়ে হাজির হচ্ছেন। বাড়ি তৈরিতে বেশি বিনিয়োগ করতে হয়, এছাড়া বাড়তি ঝামেলা তো আছেই তাই অনেকেই আবাসন প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্ল্যাট কিনছেন।

ফ্ল্যাট কেনার আগে অনেকগুলো বিষয় খেয়াল রাখতে হয়।প্লট কেনার আগে সাবধান হতে হয় আরো বেশি। কারণ ফ্ল্যাটের চেয়ে জমির মধ্যে ঝামেলা থাকে কয়েকগুন বেশি। প্লট-ফ্ল্যাট কেনার আগে বেশ কিছু বিষয় দেখে ও যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। বাসা বাড়ি ব্যবহার করার জন্য টিভি ফ্রিজ বা অন্য কোন পণ্য কিনে ঠকলে তা সামলে নেওয়া যায়। ফ্ল্যাট বা প্লট এর মত পণ্য কিনতে সাবধান হতে হয় হাজার গুণ। কারণ পণ্যটার দাম হয়তো কারো কারো সারাজীবনের সঞ্চয় বা সম্বল। স্বপ্নের ফ্ল্যাট-প্লট কিনতে পা ফেলুন সাবধানে কারণ ভূল হলেই সারা জীবনের ভোগান্তি।

বাড়ি, প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার সময় কারো উপর অতি নির্ভরতা বা প্রলুব্ধ হয়ে তাড়াহুড়ো করে কেনা বা চুক্তি করা উচিত নয়। আপনি যেহেতু আপনার সঞ্চিত অর্থ অথবা ঋণ করে একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়তে চাচ্ছেন, তাই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি দলিলপত্র, চুক্তিপত্রগুলো একজন আইনজীবীকে দেখিয়ে নেওয়া ভালো। যে কোম্পানির কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনছেন সেই প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদন আছে কি না, তার বা তাদের প্লানটা রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত কি না, কোম্পানিটি রিহ্যাবের সদস্য কি না-তা জেনে নিতে হবে। ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত সব শর্ত ভালো করে বুঝে ও দেখে নিতে হবে। এরপর ফ্ল্যাট বা প্লট বুকিং দিন।

চোখ কান খোলা রেখে আকাশচুম্বি দামী এই পণ্য কিনুন। প্লট কেনার ক্ষেত্রে কেউ কম দামে দিতে চাইলেই সেদিকে দৌঁড় দিবেন না। আজ অল্প দামে বুকিং দিয়ে ৮-১০ বছর পরে প্লট ক্রয় পরিহার করুন। কারণ অনেক ল্যান্ড কোম্পানির জমি আছে ১০০ কাঠা কিন্তু বিক্রি করে হাজার কাঠা বা তারও বেশি। কিন্তু তারা পরে ঠিকমত প্লট গ্রাহককে না বুঝিয়ে দিয়েই লাপাত্তা হয়। কাজেই প্লট ক্রয় করার ক্ষেত্রে সাবধান হন।

একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো চুক্তি। আইনজীবীর সাথে কথা বলে চুক্তির শর্তগুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ভবন নির্মাণে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হবে তা চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে। আপনি কোন ফ্ল্যাট, কোন পজিশনে কিনছেন তা চুক্তিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করুন। গ্যারেজ এর বিষয়টিও চুক্তিতে উল্লেখ করুন। আবার আপনার বিনা অনুমতিতে ফ্ল্যাট পরিবর্তন করতে পারবে না সেই বিষয়েও চুক্তিতে বলে রাখুন। শর্তের বাইরে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে ক্রেতা বাধ্য নন, সেটিও চুক্তিতে উল্লেখ করুন। যদি কোনো উন্নত মানের সরঞ্জাম সংযোজনের প্রয়োজন হয়, তবে দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে তা করতে হবে, তা চুক্তির শর্তে উল্লেখ থাকতে হবে। শুধু ডেভেলপারকে দোষ না দিয়ে ক্রেতা হিসেবে আপনাকেও সাবধান হতে হবে।

প্লট বা জমিটি কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধকি আছে কিনা সেটাও যাচাই করুন। যদি কিস্তির মাধ্যমে কেনার কথা থাকে, তাহলে কয় কিস্তি এবং হস্তান্তর কবে হবে, এ বিষয়ে সুস্পষ্ট করে চুক্তিনামায় লেখা থাকতে হবে। যদি কোনো কারণে না কেনা যায়, তাহলে এটি কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা-ও স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। ফ্ল্যাটটি এর আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়েছে কি না, খোঁজ নিতে হবে। সব ধরনের চার্জ, রেজিস্ট্রেশন ফি এবং দায়দায়িত্ব স্পষ্ট করে জেনে নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা না হয়। মনে রাখবেন একটি ভুল সারা জীবনের কান্না।

যে প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তির ফ্ল্যাটটি কিনতে যাচ্ছেন তার আগের কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি না, অতীতে ওই প্রতিষ্ঠানের দ্বারা কেউ প্রতারিত হয়েছেন কি না, তা রিহ্যাবসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জেনে নিতে হবে। অনেক সময় ফ্ল্যাটে ঢুকেও ভোগান্তির শেষ নেই। দেখা গিয়েছে, নিম্ন মানের কারণে লিফট চলছে না, নেই জেনারেটর। এমনও ঘটেছে যে, ফ্ল্যাট অসম্পূর্ণ রেখে বিক্রেতা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছেন। অনেক সময় দেখা যায় রাজউক অনুমোদন দিয়েছে ৭-৮ তলার, কিন্তু ভবন হয়েছে ১০ তলার। এ ধরনের সমস্যা থাকলে ফ্ল্যাট না কেনাই ভাল। কম দামে দিলেও কেনা উচিত না। মনে রাখতে হবে সস্তার তিন অবস্থা। দাম বেশি দিয়ে হলেও ভাল মানের এবং ভাল কোম্পানির কাছে থেকে ফ্ল্যাট-প্লট কিনুন।