বিয়ে নিয়ে প্রতারণা!

আইন ও আদালত এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন

ভুয়া কাবিনেই অধিকাংশ প্রেমের বিয়ে

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের সর্বক্ষেত্রে প্রতারকচক্র বেপরোয়া দাপুটে। এরা কখনো মন্ত্রী, সচিব, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বড় কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করছে। এদের প্রতারণার শিকার হয়ে বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষ সর্বশ্বান্ত। এবার ভুয়া কাবিনে বিয়ে’র প্রতারণার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনেক সময় দু’জন ছেলেমেয়ে নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করেন। বিয়ের কথা পরিবারের কাছে গোপন রাখেন। কিন্তু কিছুদিন পরই ছেলে বা মেয়ে বিয়ের কথা গোপন রেখে অন্য কোথাও পরিবারের ইচ্ছায় বিয়ে করেন। আবার দুজনের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলে কোনো পক্ষ ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে দাবি করা হয়। শুধু তাই নয়, বিয়ে হয়নি অথচ বিয়ে হয়েছে, বলে মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মতো সংসার করে। আবার মেয়েটিকে যখন ভালো না লাগবে অথবা মেয়েটি গর্ভবতী হলে তখন ছেলেটি বিয়ে অস্বীকার করে।
এসব ভুয়া কাবিনে বিয়ে, সর্বশ্বান্ত অনেক ভুক্তভোগী পরিচিত কিংবা অপরিচিত, কোনো নারী বা পুরুষের ছবি আর জাতীয় পরিচয়পত্র হলেই ফাঁসানো হচ্ছে ভুয়া কাবিনের ফাঁদে। কথিত কোর্ট ম্যারেজে ফেঁসে এরইমধ্যে সম্মান ও অর্থ খুইয়েছেন অনেকে। শুধু তাই নয়, বিয়ের ফাঁদে পড়ে অনেক ভুক্তভোগি সর্বশ্বান্ত হয়েছেন। সাবধানতা আর যাচাই-বাছাই ছাড়া সম্পর্ক ও বিয়ে করার কোনো বিকল্প নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। তারা বলেছেন, চেনা নাই জানা নাই শুধুমাত্র ছবি ও জাতীয়পরিচয় দিয়েই কি তাকে বিয়ে করা যায়? ওই আইনজীবী বলেন, তোমার ছবি ওর ছবি লাগবে। ঐটা দিবা। দু’জনের ভোটার আইডি কার্ড দিবা। ওই অনুসারে আমরা লিখবো। উনার স্থায়ী ঠিকানা যা আছে ওই অনুসারে লিখবো এবং কতটাকা কাবিন হবে সেটাও লিখতে হবে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই ভুয়া কাজীর মাধ্যমে বিয়ের ফাঁদে পড়ে অনেক নারী পুরুষ সর্বস্ব খুইয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী নারী জানান, দুইমাস সংসার করেছি। এক সাথে থেকেছি। হঠাৎ করে সে আমাকে অস্বীকার করে। পরে জানতে পারি কাজী-কাবিন সবই ভুয়া। এ ধরণের ঘটনায় বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। বিয়ে নিয়ে যদি প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধ ঘটে তাহলে দ-বিধি আইনে বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধের কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে বলে আইনঅজ্ঞরা জানিয়েছেন।
এছাড়া রাজধানীর আদাবর এলাকার এক নারীকে একজন মাওলানা মৌখিকভাবে বিয়ে করেন। পরে ওই নারী কাবিনের জন্য চাপ প্রয়োগ করলে তাকে মারধরসহ অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় আদাবর থানায় মামলা হয়। পরে মোহরানা উসুল দেখিলে এক কাবিননামা করা হয়েছে।
আইনজীবীরা জানান, দ-বিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৬ ধারা পর্যন্ত বিয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে, যার অধিকাংশ অপরাধই জামিন অযোগ্য। আর ধারা ৪৯৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করায়। কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে হয়নি। ওই নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ- এবং অর্থদ-ে দ-িত হবেন। আর ৪৯৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত হবেন এবং অর্থদ-েও দ-িত হবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আইনজীবী বলেন, কোর্ট ম্যারেজ সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ। কোর্ট ম্যারেজ সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানার কারণে পরবর্তী সময়ে অনেক আইনি ঝামেলার মধ্যেও পড়তে হয়। প্রেমিক-প্রেমিকা আদালতপাড়ায় আইনজীবীর চেম্বারে গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করতে চায়। আর অনেক আইনজীবীও কোর্ট ম্যারেজ বিষয়টি ব্যাখ্যা না দিয়ে বিয়ের একটি হলফনামা সম্পন্ন করে দেন। কিন্তু আইনে কোর্ট ম্যারেজ বলতে কোনো বিধান নেই। এটি একটি লোকমুখে প্রচলিত শব্দ। প্রচলিত অর্থে কোর্ট ম্যারেজ বলতে সাধারণত হলফনামার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ের ঘোষণা দেওয়াকেই বোঝানো হয়ে থাকে। এ হলফনামাটি ২০০ টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে নোটারি পাবলিক কিংবা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। এটি বিয়ের ঘোষণামাত্র।
বিয়ের নিবন্ধন জরুরি
মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্বাক্ষীদের উপস্থিতিতে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। ছেলে ও মেয়েকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। মুসলিম বিয়ে ও তালাক (নিবন্ধন) আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বিয়ে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে। কার সঙ্গে কার, কত তারিখে, কোথায়, কত দেনমোহর ধার্য, কী কী শর্তে বিয়ে সম্পন্ন হলো, স্বাক্ষী ও উকিলের নাম প্রভৃতির একটা হিসাব সরকারি নথিতে লিখে রাখাই হলো নিবন্ধন। আর এই নিবন্ধনের দায়িত্ব হচ্ছে ছেলের। বিয়ে সম্পন্ন করার ৩০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। অন্যথায় কাজি ও পাত্রের দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদ- অথবা তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় ধরণের সাজার বিধান রাখা হয়েছে। আবার স্ত্রীর দেনমোহর ও ভরণপোষণ আদায়ে কাবিননামার প্রয়োজন হয়। সন্তানের বৈধ পরিচয় নিশ্চিতে কাবিননামার প্রয়োজন হয়। কাবিননামা ছাড়া শুধু বিয়ের হলফনামা সম্পন্ন হলে বৈবাহিক অধিকার আদায় দুঃসাধ্য। হিন্দু বিয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই হিন্দু আইনের প্রথা মেনেই প্রাপ্তবয়স্ক পাত্র ও পাত্রীর বিয়ে সম্পন্ন করার বিধান। তবে হিন্দু ধর্মীয় মতে বিয়েতে নিবন্ধনের বিষয়টি ঐচ্ছিক করা হয়েছে।