২১ শে ফেব্রুয়ারীর গল্প . .

অন্যান্য বিবিধ

কাজি আরিফ : আমাদের পাড়ার বড়ভাই সিদ্দিক ভাইয়ের হাহুতাসের দিন শেষ হয়ে গেল।
ভাই বিবাহের মত এক শঙ্খনীল কারাগারে যাবজ্জীবন বন্দী হওয়ার জন্য যেভাবে একটার পর একটা সিনক্রিয়েট করে যাচ্ছিলো তাতে তাকে বিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় পাওয়া যায়নি ইহধামে।

ভাই মোটামুটি শ’খানেক মেয়ের পিছনে স্যান্ডেল জুতার তলা সব ক্ষয় করেও প্রেমের তরী বা বিয়ের নৌকা পানিতে ভাসাতে না পেরে শুকনো মরুভুমিতে শুধু গড়াগড়িই খাচ্ছিলেন ।তাকে দেখে আমাদের মায়া হতো । অবশ্য এসব প্রেমের ব্যাপারে তাকে আমরা ব্যাপক উৎসাহিত করে যাচ্ছিলাম। প্রেমের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে তাকে ভীষনভাবে উদ্বুদ্ধ করতাম ফলে সিদ্দিকভাই আমাদের নিয়ে চিকেন তন্দুরী খাওয়া ছাড়া উপায় খুঁজে পেতেন না। সহাস্য বদনে আমাদের খাওয়াতেন।আমাদের বিবিধ তরিকা বা পরামর্শ শুনে ভাই তার পকেটের টাকা দেদারসে খরচ করে ফেলতেন।তাতে অবশ্য আমরা কোন আপত্তি করিনি। প্রেমের নানা কসরত করেও যখন কামিয়াব হতে পারছিলেন না তখন আমাদের সামনে ভাইকে খুব চিন্তিত লাগত।

‘আচ্ছা , আমার চেহারাতো খারাপ না।তাইলে মেয়েরা পছন্দ করে না ক্যান?’

কেউ হয়ত বললাম,
‘ভাই, আপনি মনে হয় কন্যা রাশি না, বৃষ রাশি নাকি?মনে হয় বৃষ রাশি।না হলে তো আমাদের এইসব অব্যর্থ পরামর্শ কাজে লাগার কথা’

‘শোন ,দরকার হয় আমি রাশি চেইঞ্জ কইরা কইন্যা রাশি হয়ে যাবো’

‘জ্বি ভাই , এইটা একটা দামী কথা কইছেন।ওই ,তোরা শুনে রাখ, ভাই এখন থেকে কিন্ত কন্যা রাশি ,বুঝলি তোরা?’

ভাইয়ের এইসব অসহায়ত্ব আর সরলতার সুযোগ নিয়ে না হয় আমরা কিছু খানাপিনা, সিনেমা দেখার টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়েছি কিন্ত আমরা চেষ্টার তো কোন ত্রুটি করিনি। সত্যি বলছি। আপাশ্রেণীর কতজনের পায়ে পড়েও বললাম,
‘আপা একটু প্রেমের অভিনয় করেন ,আমাদের ইজ্জতটা বাঁচান’

তাতেও কেউ রাজি হয়না ।কেন ভাইর কি চেহারা খারাপ? তাও না । ভাইয়ের ইলিয়াস কাঞ্চন টাইপ চেহারা।নায়কের মত তবে একটু ধামড়া টাইপের এই যা।চেহারা দেখলেই মনে হবে

‘এই ধামড়াটা দড়ি ছিড়ে এখানে এলো কি করে!’

ভাই ধামড়া হলে কি হবে ধামড়ার প্যান্টের বড় পকেটে ব্যবসায়ী বাবার থেকে মেরে দেয়া অনেক টাকা থাকে আর সে টাকায় আমরা চায়ের দোকানে, তন্দুরির হোটেলে বসে গুলতানি মারতে পারি।এমন ধামড়া সমাজের জন্য উপকারী ।গাভী দুধ দিলেও এই বড় ভাইটা আমাদের চা-সিংগাড়া-চিকেন তন্দুরী দেয়।খারাপ কি।

মোটেও খারাপ না ।তারপরেও ভাইকে বলি,

‘চলেন,ঐ পাড়ার সুলতানাকে একবার ট্রাই দেই?’

ভাই উদাস হয়।আমরা রাত জেগে তার চিঠি লেখার নাম করে খানাখাদ্য খাই ।কখনো কখনো শেষমেষ একটা চিঠির মত কিছু দাঁড় করিয়ে ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাই।
ভাই চিঠির ড্রাফট পড়েন

‘প্রিয়তমেষূ – – —

এসব নানান ফন্দিফিকিরে যখন ভাল ফলাফল আসছিল না তখন ভাই একদিন ঘোষনা দিলো,

‘না রে , এই প্রেম ফ্রেম করার টাইম নাই আমার।শোন,এবার আমি বিয়ে করব’

সেই বিয়ে নিয়েও ঝক্কি শুরু হয়ে গেল ।এক মেয়ে দেখতে গিয়ে মেয়ের খালাম্মাকে পছন্দ করে ফেলল।ভাইয়ের এক কথা ,করলে উনাকেই বিয়ে করব। খোঁজ নেয়া হল ।খালাম্মা বিবাহিত এবং তার সাত বছরের স্কুলগামী একটা ছেলে আছে।্ভাইয়ের মাথা থেকে খালাম্মাকে নামাতে প্রায় চার মাস লেগেছিল।

আরেকবার একজনকে দেখতে গিয়ে দেখা গেল কোন একসময় মেয়ের বড়বোনকে ভাই প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে পত্র লিখেছিল।সেই বোন সশরীরে বাগড়া দিয়ে প্রায় অপমান করেই তাড়িয়ে দিল সবাইকে।

বলল, ‘ছেলের বদ খাসলত।’

সাধারনত ভাইয়ের কোন কিছু স্বাভাবিক ভাবে ঘটেনা ।শেষবারেও ঘটল না।

শেষবার যে মেয়েটাকে দেখতে গেছে তার সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল। দেখতে গিয়ে মেয়ের মা বাবার পুলিশীটাইপ জেরার ফলে ভাইয়ের সিগারেটের তৃঞ্চা পেয়ে গেলে এক ফাঁকে ভাই বাইরে এসে পাশের বাড়ির জাম-জামরুল গাছের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাতে গেছেন। তখনই তার চোখে পড়ল বাড়ির জানালায় অপরুপা এক সুন্দরী মেয়ে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে ।

সেসময় কোন মেয়েকে কোন ছেলে দেখতে আসলে পাত্রীর নিজের সুন্দরীর ছোটবোন বা পাশের পাড়ির সুন্দরী মেয়েদের আড়াল করে রাখা হতো পাত্র পক্ষের থেকে।যাতে যে মেয়েটাকে দেখানো হচ্ছে তাকে পছন্দ করতে এসে অন্যকাউকে পছন্দ না করে ফেলে।

কিন্ত ভাইই সেই কাজটি করে ফেললেন।এই এক দেখাতেই ভাই সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করে ফেললেন-এই জানালায় দেখা হাসি হাসি মুখের মেয়েটাকেই বিয়ে করবেন, রাখে আল্লাহ মারে কে?

ভাই আর সিগারেট ধরালেন না।
সেদিনের মত মেয়ে দেখে চলে এসে মা-কে জানালেন তার ইচ্ছাটা।

ওদিকে পাশের বাড়ির হাসি হাসি মুখের মেয়েটার খবর নেয়া শুরু হল। এও এক অপারেশন ।খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী।নাম – ভাষা ।

সবই ঠিক ছিল মেয়ে অতিসুন্দরী, ফ্যামিলী ভাল কিন্ত একটা বড় সমস্যা আছে। মেয়ে বাক প্রতিবন্ধী। প্রায় বোবা। সাধারন লোকেরা বলে-গুঙি।
আল্লাহর কি খেলা।ভাষার মুখেই ভাষা নেই।আশ্চর্য!!

এসব শুনে সিদ্দিক ভাইয়ের ফ্যামিলীর মাথায় হাত।
কেউ রাজি হয়না।ভাইয়েরও একই গোঁ। বিয়ে করলে এই মেয়েকেই বিয়ে করবে ।নইলে করবেই না সারাজীবনে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে একদিন ভাই সেই মেয়েকেই বিয়ে করে এসে বললেন,

‘শোন, ভাষার জন্য শহীদ হয়ে গেলাম, হা হা হা’

সেদিন অবশ্য ২১ শে ফেব্রুয়ারী ছিলোনা।

এর পরের গল্প আনন্দ আর বেদনার দুটোই।
বেদনার গল্পটা হল, আমাদের চিকেন তন্দুরী খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে গেল একেবারে।

আর আনন্দের বিষয় হল,

ভাষা ভাবীর একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে নাম রেখেছে –বর্ণমালা।

ভাষা ভাবীর ভাষাহীন হাসি হাসি মুখে ভাই খুঁজে পেয়েছেন বর্নমালার ছোয়া ।।