পরিবর্তন আসছে বইমেলায়

এইমাত্র জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনা মহামারীর কারণে এবারের ‘অমর একুশে বইমেলার’ তারিখ পরিবর্তনের পাশাপাশি বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবারে মেলার প্রথমদিকে বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ ‘শিশুপ্রহর’ থাকছে না। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তীতে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে যুক্ত করা হতে পারে শিশুচত্বর।
এছাড়া মেলায় প্রবেশ করতে হলে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। প্রত্যেক প্রবেশপথে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া মেলার ভেতরেও মাস্কের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া বৃষ্টিতে কেউ যেন ভিজে না যায়, সেজন্য চারটি আশ্রয়স্থল নির্মাণ করা হয়েছে।
এবার মেলার স্টলগুলো উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভকে কেন্দ্র করে ঢেলে সাজানো হয়েছে। মেলার কারুকাজ ও আলোকচিত্রে থাকবে স্বাধীনতার চেতনার প্রকাশ। স্বাধীনতার পাঁচটি দশককে পাঁচটি আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হবে মেলায়। এছাড়া স্বাধীনতা স্তম্ভের চারদিকে বর্ণমালা দিয়ে নির্মাণ করা হবে হরফ স্থাপনা।
এ বছর মেলার জন্য নির্ধারিত স্থান ১৫ লক্ষ বর্গফুট, যা আগের বছরের চেয়ে ছয় লক্ষ ৫০ হাজার বর্গফুট বেশি। করোনার কারণে জনসমাগম এড়াতে এর আয়তন বৃদ্ধি করে স্টলের সারিগুলোর দূরত্ব বাড়ানো হয়েছে।
এবারের বইমেলার মূল থিম ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’। ১৮ মার্চ বঙ্গবন্ধুর রচিত ও বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘আমার দেখা নয়াচীন’ এর ইংরেজি অনুবাদ ঘঊড ঈঐওঘঅ-১৯৫২ এর আনুষ্ঠানিক গ্রন্থ উন্মোচনের মাধ্যমে বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২০ প্রদান করা হবে।
উদ্বোধনের পর ১৯ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত রোববার থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বইমেলা সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলা ও অনুষ্ঠানমালা-২০২১ উপলক্ষে আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন করে বাংলা একাডেমি। এতে বইমেলার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ও মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদ।
বইমেলা ও অনুষ্ঠানমালা নিয়ে বাংলা একাডেমির সংবাদ সম্মেলন
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী, এনামুল কবির নির্ঝর প্রমুখ।
মেলায় নতুন সংযােজন-
১. এবার বইমেলার মূল থিম বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। জাতির পিতার জীবন ও কর্ম-অধ্যয়ন এবং স্বাধীনতার মর্মবাণী জাতীয় জীবনে যাতে প্রতিফলিত হয় তার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।
২. মেলার বিন্যাসে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৩টি প্রবেশপথ থাকবে। ৩টি প্রবেশপথ বিবেচনায় রেখে স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলাে এমনভাবে বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে কোনাে এলাকা প্রান্তিক বা অবহেলিত বলে প্রতীয়মান না হয়।
৩. দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন হয়েছে রমনা প্রান্তে একটি প্রবেশপথ ও পার্কিং এর ব্যবস্থা করার মাধ্যমে।
৪. ঝড়ের আশংকা থাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাঠামাে নির্মাণ করা হয়েছে।
৫. বৃষ্টি ও ঝড়ের আশঙ্কা বিবেচনায় রেখে সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
৬. এবার বৃষ্টির পানি মেলা প্রাঙ্গণ থেকে দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকবে।
৭. লেখক বলছি মঞ্চ ও গ্রন্থ উন্মোচনের স্থান বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।
৮. নামাজের ঘর, টয়লেট ব্যবস্থা সম্প্রসারিত ও উন্নত করা হয়েছে। নারীদের জন্য সম্প্রসারিত নামাজ ঘর থাকবে।
৯. প্রতি বছরের মতো এবারও হুইল-চেয়ার সেবা থাকবে। তবে গতবারের চেয়ে বেশি সংখ্যায় স্বেচ্ছাসেবী এ কাজে নিয়ােজিত থাকবেন। এবার হুইল চেয়ারের সংখ্যা বাড়বে।
১০. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটি ফুডকোর্ট থাকবে।
এবারের বইমেলার সামগ্রিক তথ্য-
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৪টি এবং সােহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৮০টি ইউনিট; মােট ৫৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া মেলায় থাকবে ৩৩টি প্যাভিলিয়ন।
এবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থানান্তরিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল মেলা প্রাঙ্গণে। সেখানে ১৩৫টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দের পাশাপাশি ৫টি উন্মুক্ত স্টলসহ ১৪০টি স্টল দেয়া হয়েছে।
একক ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন, তাদের বই ও বিক্রি/প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে।
বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫% কমিশনে বই বিক্রি করবে। বাংলা একাডেমির ৩টি প্যাভিলিয়ন, শিশু-কিশাের উপযোগী বইয়ের জন্য ১টি এবং সাহিত্য মাসিক উত্তরাধিকার এর ১টি স্টল থাকবে।
উদ্যানের সামনের রাস্তায় মেট্রোরেলের কাজ চলায় এবার মেলায় প্রবেশ ও প্রস্থান জন্য অন্য আরেকটি নতুন পথ রমনার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট সংলগ্নে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া অন্য দুটি পথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন একটি, অন্যটি বাংলা একাডেমির বিপরীত দিকে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মােড়ক উন্মােচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। অমর একুশে বইমেলা-২০২১ এর প্রচার কার্যক্রমের জন্য একাডেমিতে বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে ১টি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৩টি তথ্যকেন্দ্র থাকবে।
সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধার্থে বইমেলায় মিডিয়া সেন্টার থাকবে তথ্যকেন্দ্রের উত্তর পাশে।
বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্তৃপক্ষ বইমেলায় তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি গ্রন্থেও মোড়ক উন্মোচন, তথ্যকেন্দ্রের সর্বশেষ খবরাখবর এবং মেলার মূল মঞ্চের সেমিনার প্রচারের ব্যবস্থা করবে। মেলায় ওয়াইফাই সুবিধা থাকবে।
বইমেলার প্রবেশ ও বাহিরপথে পর্যাপ্ত সংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ। নিñিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলার এলাকাজুড়ে ৩ শতাধিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বইমেলা সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।
১৯ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক আলােচনার পাশাপাশি বরেণ্য বাঙালি মনীষার জন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং গত এক বছরে প্রয়াত বিশিষ্টজনদের জীবন ও কৃতি নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিদিনই রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ এবং আবৃত্তি।
অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২০ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০২০ বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হবে।
এছাড়া ২০২০ সালে প্রকাশিত শিশুতােষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রােকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হবে।