বাঙালির মননে গাঁথা হে বঙ্গবন্ধু

এইমাত্র জাতীয়

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞচিত্তে তোমায় স্মরণ

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ ১৭ মার্চ, জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে আয়োজনে থাকছে অনেক কিছুই। দিবসটির যথাযথ উদ্যাপনের নানা আয়োজন চলছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও দিবসটি উদ্যাপিত হচ্ছে বছরজুড়ে।
‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই…’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু কিংবা জন্মবার্ষিকীতে এ গানটি বাজানো হয় অবধারিতভাবেই। আজও সারা দেশে তা শোনা যাবে। এই গানের আকুতির মতোই সত্যিই যদি বঙ্গবন্ধু মারা না যেতেন, তাহলে আজ শতবর্ষী হতেন তিনি। জনতার নেতা মুজিব না থাকলেও তাঁর আদর্শ ও অনুপ্রেরণা আজও বাঙালির মননে গেঁথে আছে। শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, কৃতজ্ঞচিত্তে আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করবে বাঙালি।
‘বঙ্গবন্ধু মানে একজন সাহসী নেতা, একজন দৃঢ়চেতা মানুষ, একজন ঋষিতুল্য শান্তিদূত, একজন ন্যায়, সাম্য ও মর্যাদার রক্ষাকর্তা, একজন পাশবিকতাবিরোধী এবং যে কোনো জোর-জুলুমের বিরুদ্ধে একজন ঢাল।’ জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের শুভেচ্ছা বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন এ কথাগুলো।
বাঙালির মুক্তি আন্দোলন তৃতীয় বিশ্বের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অন্তর্গত, সে আন্দোলনের অবিচ্ছিন্ন স্রোতোধারা। ১৯৭১-এর ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ প্রশ্নে বিতর্কের সময় সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ইয়াকফ মালিক বলেছিলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা তৃতীয় বিশ্বের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের আরেকটি প্রকাশ, এর আর অন্য কোনো পরিচয় নেই। এ গণমুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ফলে, মোটেই বিস্ময়ের কথা নয় যে মুক্তিপ্রয়াসী মানুষ তা তারা যেখানেই থাকুক তাঁর জন্মদিবস উদ্যাপনে আগ্রহী হবে।
১৯২০ সালের এই দিনে রাত আটটায় টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ পরিবারের আদরের খোকা। তদানীন্তন ফরিদপুর মহকুমার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতা সায়েরা খাতুনের ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। চার বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। যিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির ‘মুজিব ভাই’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু’। তাঁর হাত ধরেই আসে বাঙালির স্বাধীনতা, জন্ম নেয় বাংলাদেশ। ৫৫ বছর বয়সে কিছু বিপথগামী সেনা কেড়ে নেন তাঁর প্রাণ। কিন্তু দেশের প্রতিটি কোনায় আজ উচ্চারিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন ১০ জানুয়ারি থেকেই জন্মশতবর্ষের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও জনপরিসরে ক্ষণগণনার জন্য কাউন্টডাউন ঘড়ি বসানো হয়েছিল। ক্রিকেট ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ বিপিএল এবার বঙ্গবন্ধুর নামে আয়োজন করা হয়। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ৭৭টি দূতাবাসে ২৬১টি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নেয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের জন্য এক মহান বার্তা। আমরা সবাই ভালো করে জানি, কীভাবে একটি নিপীড়ক ও দমনকারী সরকার সমস্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে বাংলা ভূমির ওপর অবিচারের রাজত্ব চালিয়ে জনগণের সর্বনাশ করেছিল। সেসময় যে ধ্বংসলীলা ও গণহত্যা হয়েছিল, সেই অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে বের করে এনে একটি ইতিবাচক ও প্রগতিশীল সমাজে পরিণত করার জন্য তিনি তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ঘৃণা এবং নেতিবাচকতা কখনই কোনো দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না। কিন্তু তাঁর এই ধারণা ও প্রচেষ্টা কিছু লোক পছন্দ করেনি এবং আমাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ এবং আমরা সবাই ভাগ্যবান যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা ঈশ্বরের আশীর্বাদে রক্ষা পেয়েছিলেন। নয়তো সহিংসতা ও ঘৃণার সমর্থকরা চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ যেভাবে অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং উন্নয়নমুখী নীতিমালা অনুসরণ করে এগিয়ে চলছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। অর্থনীতি থেকে শুরু করে অন্য সামাজিক সূচক, যেমন : ক্রীড়াক্ষেত্র কিংবা দক্ষতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন, মাইক্রোফিন্যান্সের মতো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে।
১৭ মার্চ সুরে, ছন্দে সেজে উঠবে ঢাকা। আর সেখানে তিনি পারফর্ম করবেন। উচ্ছ্বসিত সঙ্গীতশিল্পী নস্টালজিক দেবজ্যোতি মিশ্র বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান নামটার সঙ্গে ছেলেবেলা থেকে পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধের খবর আসত রেডিওতে। দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় খবর পড়তেন। সারা পাড়ায় রেডিও চলত। বাড়িতে মা, বাবা, ঠাকুমা সবাই মিলে রেডিওর সামনে বসে থাকতাম। সেই সব ফেলে আসা দিনগুলো মনে পড়ে। তখনকার পূর্ববঙ্গ আমার মায়ের, বাবার দেশ। ভাবলেই একটা আবেগ কাজ করে। আর মুজিবুর রহমান যিনি নাকি সেই বাংলাদেশের রূপকার, তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে আমি, আমার ভারত-বাংলাদেশের মিউজিশিয়ান বন্ধুদের নিয়ে পারফর্ম করব, এটাতেই গর্ব হচ্ছে।
উল্লেখ্য, স্বায়ত্তশাসনসহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির ছয়টি দাবি নিয়ে, ১৯৬৬ সালে, ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। এর অল্প সময়ের মধ্যেই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। চষে বেড়াতে শুরু করেন বাংলার মাঠ-প্রান্তর। এসময় ‘ছয় দফা: আমাদের বাঁচার দাবি’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে দেশজুড়ে বিলি করা হয়। তুমুল গণজোয়ার শুরু হয় ছয় দফার পক্ষে। তা দেখে ভয় সৃষ্টি হয় পাকিস্তানি জান্তাদের মনে। ছয় দফা ঘোষণার পরের তিন মাসে দেশজুড়ে ৩২টি জনসভা করেন বঙ্গবন্ধু এবং প্রায় প্রতিবারই তাকে আটক করা হয়। অবশেষে বাঙালির জাগরণ দমানোর জন্য দীর্ঘ মেয়াদের জন্য জেলে ঢোকানো হয় জাতির স্বপ্নপুরুষ শেখ মুজিবকে। কিন্তু লাভ হয়নি। ছয় দফা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির যে বীজমন্ত্র তিনি রোপণ করেছিলেন, তা ততদিনে শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে গেছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।
এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করেই স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে পুরো জাতি। যার প্রভাব পড়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আওয়ামী লীগ। নৌকা প্রতীকের কা-ারি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে হয়ে ওঠেন অখ- পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা ও নির্বাচনের পরাজিত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিকরা ষড়যন্ত্র করতে থাকে। অনেক টালবাহানার পর, ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, স্বৈরাচার জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ দুপুরে, সেই অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এরপরই ফুঁসে ওঠে আপামর বাঙালি। চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু করার নির্দেশ দেন সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির আস্থা ও বিশ্বাসের অভিভাবক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।