সাজাপ্রাপ্ত গ্রেফতারী পরোয়ানাসহ ৩৮ মামলার আসামী গ্রেফতার

অপরাধ রাজধানী

নিজস্ব প্রতিনিধি : এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাব আত্মপ্রকাশের সূচনালগ্ন থেকেই আইনের শাসন সমুন্নত রেখে দেশের সকল নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপরাধ চিহ্নিতকরণ, প্রতিরোধ, শান্তি ও জনশৃংখলা রক্ষায় কাজ করে আসছে। সাম্প্রতিককালে প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ জনগনের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণীর প্রতারক চক্র। জঙ্গীবাদ, খুন, ধর্ষণ, নাশকতা এবং অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি সাম্প্রতিক এসব প্রতারক চক্রের সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য RAB সদা তৎপর।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৬/০৩/২০২১ তারিখ ২২:৩০ ঘটিকার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে, শাহআলী থানাধীন মিরপুর-১ এলাকায় সাজাপ্রাপ্ত গ্রেফতারী পরোয়ানাসহ ৩৮ মামলার আসামী অবস্থান করছে। উক্ত সংবাদের ভিত্তিতে RAB-4 এর একটি আভিযানিক দল ঢাকা মহানগরস্থ উক্ত এলাকায় ১৬/০৩/২০২১ ইং তারিখ ২৩.৩০ ঘটিকায় অভিযান পরিচালনা করে নিম্নোক্ত ০১ জন প্রতারক’কে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়।

১। এসএম শামসুদ্দোহা চৌধুরী বিপ্লব @ দোহা (৪২), জেলাঃ পাবনা।

এসএম শামসুদ্দোহা চৌধুরী বিপ্লব @ দোহা এর উত্থানঃ

এসএম শামসুদ্দোহা চৌধুরী বিপ্লব @ দোহা পাবনা জেলার চাটমোহর থানাধীন ফৈলজানা গ্রামে জম্মগ্রহণ করে। এস এম শামসুদ্দোহা চৌধুরী বিপ্লব (৪৫) যে কখনো নেহাল চৌধুরী কখনো আদিল কখনো অনিক কখনো কায়সার এরকম হাজার নামের বাহার তার। মাত্র পঞ্চম শ্রেনী পাশ করে কোন এক সময় দক্ষিন কোরিয়ায় শ্রমিক হিসাবে পাড়ি দেয়। যদিও তিনি কোরিয়া থেকে বিবিএ পাশ বলে প্রচার করেন ও কিছু ভূয়া সার্টিফিকেট নিয়ে ঘোরেন। সেখানেই তিনি ইংরেজি ও কোরিয়ান ভাষা বেশ ভালভাবে রপ্ত করে নিজের নাম রেখে দেন “লি সান হো (Lee San Ho)”। কোরিয়ানদের সাথে প্রতারণা করে কোরিয়া থেকে চলে আসেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন কোরিয়ানদের ট্যুর গাইড হিসাবে কাজ করার সুবাদে আবারো কোরিয়ানদের জন্য ফাঁদ পেতে বিভিন্ন জনের সর্বনাশ করেন। এরপর তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন নাম সর্বস্ব WAO Group of Company, এর মালিক হিসেবে অফিস নেন বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায়। সেখানে সমান তালে চলে প্রতারণা, চাকরির প্রলোভন, সরকারি দপ্তরে তদবির, বিদেশি প্রজেক্ট দেখিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা। আগে একাধিকবার সাজা প্রাপ্ত দোহার নামে বর্তমানে তিনটি গ্রেফতারী ওয়ারেন্ট জারি আছে। বারিধারায় গত দুই বছরে সে ৭-৮ বার তার অফিসের ঠিকানা পরিবর্তন করেছে। প্রত্যেকটি বাসায় আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে। জানা যায় তার বাসা এবং অফিসের ঠিকানায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে। কাউকে চাকরির কথা বলে টাকা নেয়া, কাউকে বিদেশ পাঠানো, কারো কাছ থেকে বিনিয়োগ নিয়ে লাপাত্তা, কাউকে ঠকানোই ছিল দোহার প্রতিদিনের কাজ। সে চলাফেরা করেন আলিশান গাড়িতে, সব সময় যেনো মিটিং লেগেই আছে। সে গুলশান, বনানী, উত্তরা কেন্দ্রিক এঞ্জেল সার্ভিসের নাটের গুরু। এই দোহা তিনি তার সুন্দর চেহারার মোহে বিভিন্ন নারীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে সেগুলোর গোপন ভিভিও ধারণ করে তাদেরকে ফাঁদে ফেলত এবং সেই ভিডিও কাজে লাগিয়ে দোহা এঞ্জেল সার্ভিসে নারীদেরকে কাজ করতে বাধ্য করত। তার ০৩ টি স্ত্রীর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও বিভিন্ন নারীর সাথে বিবাহ বহিভর্‚ত অনৈতিক সম্পর্ক আছে বলে জানা যায়। দোহার কোম্পানির নাম কখনো WAO, কখনও Powet Plant Service বলে প্রচার করত। এই প্রতারণাকে কাজে লাগিয়ে দোহা সম্প্রতি বিদেশি কোম্পানির একটি প্রজেক্টো হাতিয়ে নিয়েছে। চতুর দোহা তার WAO নামক কোম্পানির ওয়েবসাইটে নিজের যে প্রোফাইল দিয়েছেন তা দেখে বুঝার উপায় নেই যে তিনি আসলেই একজন প্রতারক। ভুক্তভোগী মানুষেরা তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মামলা করে যার প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণাসহ বিভিন্ন মামলার ৩৮টি গ্রেফতারী পরোয়ানা রয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে থানায় প্রতারণা সংক্রান্ত অসংখ্য জিডি ও অভিযোগ রয়েছে।

দেশে ফিরে প্রতারণামূলক কার্যক্রমঃ

মূলত কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার পর সে অভিনবভাবে প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে নিজেকে কথিত “WAO GROUP OF COMPANY” কোম্পানির মালিক পরিচয়ে সাইনবোর্ড টানায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্র প্রদর্শনপূর্বক ভয়-ভীতি দেখাত। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় অন্যের জমি, খাস জমি দখল করে নিজের নামে ভুয়া দলিল তৈরী করে তা অন্যের নিকট বিক্রি করে প্রায় কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। তার মালিকানাধীন নিম্নের ০৪ টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছেঃ

১। WAO DREDGING COMPANY LTD
২। WAO POWER PLANT LTD
৩। WAO SOLAR PANEAL LTD
৪। ANGEL SERVICE LTD

এসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নিম্নোক্ত ভূক্তভোগিদের কাজ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ঃ

১। অন্যের জমি ভুয়া দলিলপত্র নিজের নামে দেখিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিঃ জেনারেল জামিল খানের কাছ থেকে ৮৫ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়।
২। বিভিন্ন ব্যাংক এর সাথে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে।
৩। ধানমন্ডিতে বসবাসরত জনৈক হারুনের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৯৬ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে।
৪। সুইজারল্যান্ড প্রবাসী জনাব তানভীর এর নিকট থেকে ৩০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে।
৫। ঢাকার জুরাইন এলাকার জনাব আলমগীর এর নিকট থেকে প্রায় ১.৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।
৬। ঢাকার উত্তরা এলাকার জনাব আহসান এর ব্যবসায়িক পার্টনারের নিকট থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।
৭। কোরিয়ান নাগরিক মিঃ জং এর নিকট থেকে ব্যবসায়িক পার্টনার সেজে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।

প্রতারণার কৌশলঃ

গ্রেফতারকৃত আসামী নিম্নোক্ত অভিনব প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করে সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করে আসছিলোঃ

ক। টার্গেট/গ্রাহক সংগ্রহ ঃ প্রতারকচক্রের এ শ্রেণীর সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে থাকে। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাজধানীর সরকারী, বেসরকারী, অবসারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ধনাট্য ব্যক্তিবর্গে সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে।