অনেক স্বপ্নপূরণের অপেক্ষা

এইমাত্র জাতীয়

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

মৎস্য আহরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মালদ্বীপের সঙ্গে ৪ স্মারক সই

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : মালদ্বীপের সঙ্গে মৎস্য আহরণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে চারটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহর বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকগুলো সই হয়। অন্য দুটি সমঝোতা স্মারক হল- যৌথ কমিশন গঠন (জেসিসি) ও পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক।
যৌথ কমিশন গঠনের বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও মালদ্বীপের পররাষ্টমন্ত্রী আবদুল্লাহ শহিদ। আর পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠকের সমঝোতা স্মারকে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব স্বাক্ষর করেন। মৎস্য ও পেলেজিক ফিশিংয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এতে বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ও মালদ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রী স্বাক্ষর করেন।
পাশাপাশি ২০২২-২০২৫ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক বিনিময়ে সহযোগিতার জন্য সমঝোতা স্মারক সই হয়। এতে বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ হাসান ও ও মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ শহিদ সই করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। এ সময় তাকে কার্যালয়ের টাইগার গেটে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে গত বুধবার সকালে বাংলাদেশে আসেন মোহাম্মদ সলিহ এবং তার স্ত্রী ফাজনা আহমেদ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৈশভোজে অংশ নেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, ২০১১ সালেই তিস্তা চুক্তি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। তবে যে কারণে বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সেটির সমাধান হলেই তিস্তার পানি আসবে।
সূত্র জানায়, স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে তিস্তার পানি নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের দ্বিতীয় সভায় আলোচনা হয়। ১৯৮৩ সালে অন্তর্র্বতীকালীন একটি চুক্তিও হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ছিল ৩৬ শতাংশ, ভারত ৩৯ শতাংশ আর ২৫ শতাংশ পানি ছিল নদীর নাব্য বজায় রাখার জন্য। ১৯৮৫ সালে সেই অন্তর্র্বতীকালীন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। ১৯৮৭ সালে মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানো হয়েছিল। এরপর আর কোনো চুক্তি হয়নি।
২০০৯ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে তিস্তা চুক্তি নিয়ে আবারো আলোচনা শুরু হয়। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়ারই কথা ছিল। তখন পুরো দেশের মানুষ আশায় বুক বাঁধে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসঙ্গেই বাংলাদেশ সফরে আসার কথা ছিল। হঠাৎ করেই বাংলাদেশ সফরে না আসার ঘোষণা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে ২০১৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশে এলে আরেকবার আশা তৈরি হয়। কিন্তু তিনি কলকাতা ছেড়ে আসার সময় সাংবাদিকদের সাফ জানিয়ে ছিলেন, তিস্তা নিয়ে কোনো কথাই বলবেন না। তবে তিনি বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, আমার ওপর আস্থা রাখুন।
তবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে তিস্তা চুক্তি নিয়ে আবারো আশা তৈরী হয়। দীর্ঘদিনের এ সমস্যা নিয়ে দেশের মানুষ আশায় বুক বাঁধে এবার হয়তো এটির সফলতা আসবে। কিন্তু এবারো সেই আশার প্রতিফলন হচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পানি সচিব এমনকি ভারতীয় রাষ্ট্রদূতও বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, কোনো রাখঢাক না করেই সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী জনসভায় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে বিরোধিতার কথা জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত ১০ বছরেও যে এই ইস্যুতে মনোভাব বদলাননি, তা স্পষ্ট হয়েছে গত রোববার বক্তৃতায়।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকে না জানিয়েই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তার পানিচুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তিনি এটি মেনে নেবেন না। পশ্চিমবঙ্গের চাহিদা মিটিয়ে পানি থাকলে পরে বাংলাদেশকে তিনি দেবেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিটি সফরেই আলাপ-আলোচনায় অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি প্রসঙ্গ ওঠে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই চুক্তির ব্যাপারে ভারত অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও চুক্তির বিষয়ে ভারত অবগত।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য ছাড়া ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এককভাবে ওই চুক্তি করা সম্ভব নয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এ মাসেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। চলবে আগামী ২ মে পর্যন্ত। এই নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি আবারো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতায় আসেন, তবে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে তার মনোভাব রাতারাতি দূর হয়ে যাবে এমনটি আশা করা কঠিন। আর মমতার দলের বাইরে অন্য কেউ সেখানে ক্ষমতায় এলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা ইস্যুতে তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে ভারত। ভারতের সাথে পানিসম্পদ বিষয়ক সচিব পর্যায়ের বৈঠকের বিস্তারিত নিয়ে বুধবার (১৭ মার্চ) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
তিস্তা চুক্তির বিষয়ে এক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কবির বিন আনোয়ার বলেন, ‘ভারত বলেছে, তাদের যে আগের অবস্থান অর্থাৎ ২০১১ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল সেটাই রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মতপার্থক্যের কারণে বিষয়টি আটকে আছে।
কবির বিন আনোয়ার জানান, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনের কারণে এই মুহূর্তে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর বা পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিয়ে তারা বলছে, নির্বাচনের পর তারা এটা করতে সক্ষম হবেন।
ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, তিস্তা চুক্তি না হওয়াটা একটা দুঃখজনক বাস্তবতা। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। তাদের কারণে চুক্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।