দুদক এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের অভিযান

অপরাধ

নিজস্ব প্রতিবেদক : রংপুর জেলার গংগাচড়া উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল কবিরের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল সার্ভিস প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনপূর্বক আত্মসাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক, সজেকা, রংপুর-এর সহকারী পরিচালক মোঃ হোসাইন শরীফ-এর নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনের লক্ষ্যে দুদক টিম সরজমিনে গংগাচড়া উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয় পরিদর্শনপূর্বক প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, কাগজপত্র পরীক্ষা ও তথ্যানুসন্ধান করেছে। সত্য উদঘাটনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল কবিরসহ অন্যান্য ব্যক্তিদের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে রেকর্ড করেছে দুদক টিম। উক্ত দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত আরও তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে উক্ত অফিস থেকে আরও রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে হবে। এ ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কিনা এবং তা হয়ে থাকলে এর সাথে কারা জড়িত তা উদঘাটনের জন্য সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র ও তথ্য প্রমাণসমূহ পরীক্ষা করে কমিশন বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করবে দুদক টিম।

এছাড়া, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে বহুতল ভবন নির্মাণে অনুমতি প্রদান, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি রাশিদা সুলতানা-এর বিরুদ্ধে রাজউক-এর নকশা বহির্ভূত বহুতল ভবন নির্মাণ, ডেভেলপার কোম্পানীর বিরুদ্ধে রাজউক অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত বহুতল ভবন নির্মাণ, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের ইএফটি করতে ঘুষ দাবি, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে ‘স্লিপ কার্যক্রমে’ ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার-এর বিরুদ্ধে বিবিধ সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ কোন কাজ না করে উত্তোলন পূর্বক আত্মসাৎ, সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে নদী হতে বালু উত্তোলন, ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিবের বিরুদ্ধে ভূমির খাজনা আদায়ে নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত ফি আদায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই ইট-ভাটা নির্মাণের অভিযোগের প্রক্ষিতে চেয়ারম্যান-রাজউক; মহাপরিচালক-প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর; জেলা প্রশাসক, জামালপুর-যশোর-কুষ্টিয়া-কে বিষয়সমূহ অবহিত করে যথাপোযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট থেকে তাগিদপত্র প্রেরণ করা হয়েছে।

 

দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারর্পূবক ঘুস দাবী ও উক্ত ঘুসের টাকা গ্রহণকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি ট্রাপ টিম বৃহস্পতিবার আসামী মো: আলমগীর হোসনে, অডিটর, উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিস, ডুমুরিয়া, খুলনা হতে গ্রেফতার করে।

উপসহকারী কমিউনিটি মডেকেল অফিসার (পিআরিএল ভোগরত) জনাব রনজিত কুমার নন্দীর জিবি ফান্ডের হিসাবকৃত ২০,৮০,০৩৫/- টাকা এর বিপরীতে বিধি মোতাবেক প্রাপ্য ২২,০৬,৭২৫/- টাকা প্রাপ্তির হিসাব নিশ্চিত করার জন্য অডিটর আসামী মো: আলমগীর হোসেনের ১৫০০০/- টাকা ঘুস দাবী ও গ্রহণের অপরাধে কমিশনের অনুমোদক্রমে ঘুসের টাকাসহ আসামীকে গ্রেফতার করেছে। দুদকের খুলনা বিভাগের পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদের তত্বাবধানে ও উপপরিচালক জনাব নাজমুল হাসানের নেতৃত্বে একটি ফাঁদ দল আসামীকে ঘুসের টাকাসহ গ্রেফতার করেছে। উল্লেখ্য, ঘুস দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ বা ক্ষতিগ্রস্থ যে কোন ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনের হটলাইন (১০৬)-এ অভিযোগ জানানোর মাধ্যমে ঘুস দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার প্রাপ্তির সুযোগ নিতে পারেন।

দুদক কর্তৃক মামলা দায়েরঃ ৭৭,৫২,৯৭৬ (সাতাত্তর লক্ষ বায়ান্ন হাজার নয়শত ছিয়াত্তর) টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ব্যয় ও অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং উক্ত সম্পদকে স্থানান্তর, হস্তান্তর, রুপান্তর করার দায়ে নিম্নোক্ত আসামির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ (২) ধারায় আজ মামলা দায়ের করেছে দুদক।

আসামিঃ
জনাব তৈমুর ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক, কালিবাড়ি পুলিশ ফাড়িঁ, জোড়াগেট, কেএমপি, খুলনা, পিতা: এস. এম. এ. মজিদ, স্থায়ী ঠিকানা: ৭০ খান জাহান আলী রোড, খুলনা সদর, খুলনা।

অভিযোগটি অনুসন্ধানকালীন প্রাপ্ত তথ্যাদির সংক্ষিপ্ত বিবরণঃ
অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট জনাব তৈমুর ইসলাম ১৯৯৫ সালে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরিতেতে নিয়োগ পান। ২৩/৬/২০০২ তারিখে ধানমন্ডি থানায় কর্মরত থাকাকালীন তাকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি বরখাস্ত আদেশের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে মামলা করে জয়লাভ করেন এবং ১৩/০১/২০১০ তারিখে পুনরায় ডিএমপিতে যোগদান করেন। ১৩-০৬-২০১৩ খ্রি. তারিখে তিনি পুলিশ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। ২০১৫ সালে তাকে সাতক্ষীরা জেলায় বদলি করা হয়।২০০২ সালে চাকরি থেকে বরখাস্ত অবস্থায় তিনি Apartment Design and Development (ADDL) নামক কোম্পানীতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। কোম্পানীর এমডি জনাব আজিজুর রহমান তার ছোট বোনের স্বামী। ০৫/০১/২০১০ খ্রি. তারিখে আ্যসিস্টেন্ট জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় চাকরি হতে অব্যাহতি নেন। ১৩/০১/২০১০ তারিখে পুনরায় ডিএমপিতে যোগদান করেন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে স্ত্রীকে ৬৫,০০,০০০/- টাকা দান হিসেবে দেখিয়েছেন।

২০১০ সালে চাকরিতে যোগদান করায় পূর্বের ৮ বছরের বেতন-ভাতা ৮ লক্ষ টাকা একসাথে পান। তিনি বেশকিছু জমি ক্রয়-বিক্রয় করেছেন। তার পিতা এস এম এ মজিদ, ৭০ খান জাহান আলী রোড, টুটপাড়া, খুলনায় ৩৭ শতক জমি ক্রয় করে ৪ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। উক্ত জমি থেকে ১৩ শতক জমি ও একটি ফ্লাট তার পিতা তাকে দান করেছেন। যেসব জমি ও ফ্লাট তার পিতা তাকে দান করেছেন সেগুলোর মূল্য তিনিই প্রদান করেছেন। এসব অর্থ গোপন করার উদ্দেশ্যেই তিনি এগুলো দান হিসেবে দেখিয়েছেন। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট জনাব তৈমুর ইসলাম এর নামে ক্রয়কৃত মোট ১.৭৩৫ একর জমির তথ্য পাওয়া গেছে। যার মূল্য ৩৫,৭০,০০০/- (পঁয়ত্রিশ লক্ষ সত্তর হাজার) টাকা পাওয়া যায়। উক্ত জমিতে ১৪,০০,০০০ (চৌদ্দ লক্ষ) টাকা খরচে অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। অর্থাৎ অবকাঠামো সহ তার মোট ৪৯,৭০,০০০/- (উনপঞ্চাশ লক্ষ সত্তর হাজার) টাকার স্থাবর সম্পদ পাওয়া যায়। বড়ডাঙ্গা, ডুমুরিয়ায় ক্রয়কৃত ৬২ শতক জমিতে তিনি ১টি দোতলা ভবন তৈরি করেন। উক্ত ভবনের ব্যয় হিসেবে তিনি সম্পদ বিবরণীতে ১২ লক্ষ টাকা ব্যয় দেখালেও আয়কর নথিতে ২০ লক্ষ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন।

তৈমুর ইসলাম এর নামে মোট ৫৩,৮০,০০০/- (তেপ্তান্ন লক্ষ আশি হাজার) টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায়। তিনি ২০/০৩/২০১১ তারিখে ৩২,৫০,০০০/- টাকা ব্যয়ে ১ টি টয়োটা এলিয়ন গাড়ি ক্রয় করেন। যা তার পরিবার ঢাকায় ব্যবহার করে থাকে। ২০১১ থেকে ২০১৭ এই ছয় বছরে মাসিক ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হিসাবে অন্তত ২১ লক্ষ টাকা উক্ত গাড়ির পিছনে ব্যয় হয়েছে। যা তিনি আয়কর নথিতে দেখাননি। উক্ত টাকা তার অবৈধ আয় হিসেবে ধরা হলো। তিনি আয়কর নথিতে যে পারিবারিক ব্যয় দেখিয়েছেন তাই গ্রহণ করা হয়েছে। আয়কর নথি পর্যালোচনায় তার ৫১,৪২,৫৩০/-টাকা আয়ের থেকে ব্যয় বেশি পাওয়া যায়। এ টাকাও তার অবৈধ আয় হিসেবে ধরা হলো। এছাড়া তিনি ২০১১-২০১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ বার থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন। উক্ত ভ্রমণে তিনি তার প্রাইম ব্যাংক লিঃ এর ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মাস্টারকার্ড কার্ড নং ৫৫৪৭-৯৩৪৭-২৩২৮-৮০৫৫ এর মাধ্যমে যথাক্রমে $৪৯৩১.০৮ ও $১৪৪৯.৫০ ইউএস ডলার খরচ করেন। ডলার প্রতি ৮০ টাকা দরে এতে ব্যয় পাওয়া যায় যথাক্রমে ৩,৯৪,৪৮৬/- ও ১,১৫,৯৬০/- টাকা। অর্থাৎ মোট (৩,৯৪,৪৮৬ + ১,১৫,৯৬০)= ৫,১০,৪৪৬/- (পাঁচ লক্ষ দশ হাজার চারশত ছিচল্লিশ) টাকা উক্ত ভ্রমণে সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি ব্যয় করেন। এ অর্থ তিনি দেশে এসে সুদসহ পরিশোধ করেন। এই খরচের হিসাব বা আয়ের উৎস তিনি দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী বা আয়কর নথিতে দেখাননি। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে গমন করে এই বিপুল অংকের ব্যয় অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে মানিলন্ডারিং এর স্পষ্ট আলামত রয়েছে। এ টাকাও তার অবৈধ আয় হিসেবে ধরা হলো।

সার্বিকভাবে তার (৫১,৪২,৫৩০+ ২১,০০,০০০+ ৫,১০,৪৪৬) = ৭৭,৫২,৯৭৬ (সাতাত্তর লক্ষ বায়ান্ন হাজার নয়শত ছিয়াত্তর) টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ব্যয় পাওয়া যায়। উক্ত অর্থ তিনি অবৈধভাবে অর্জন এবং উক্ত সম্পদকে স্থানান্তর, হস্তান্তর, রুপান্তর করার দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারা অনুযায়ী অপরাধ করেছেন। এছাড়া উক্ত অর্থ দেশে-বিদেশে স্থানান্তর, হস্তান্তর, রুপান্তর করে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ (২) ধারায় অপরাধ করেছেন।

এমতাবস্থায়, আসামি তৈমুর ইসলাম, পুলিশ পরিদর্শক, কালিবাড়ি পুলিশ ফাড়িঁ, জোড়াগেট, কেএমপি, খুলনা, পিতা: এস. এম. এ. মজিদ, স্থায়ী ঠিকানা: ৭০ খান জাহান আলী রোড, খুলনা সদর, খুলনার বিরুদ্ধে ৭৭,৫২,৯৭৬ (সাতাত্তর লক্ষ বায়ান্ন হাজার নয়শত ছিয়াত্তর) টাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ব্যয় ও অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং উক্ত সম্পদকে স্থানান্তর, হস্তান্তর, রুপান্তর করার দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ (২) ধারায় আপনার কার্যালয়ে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়। তদন্তকালে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বা আরও সম্পদের তথ্য উদঘাটিত হলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

ঘটনাস্থল :ঢাকা ও খুলনা।

ঘটনার সময়কাল : ২০১০-২০১৭ সাল।

এজাহার দায়েরকারী কর্মকর্তাঃ মোঃ শাওন মিয়া, উপপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিভাগীয় কার্যালয়, খুলনা।