ফাঁসছেন বসুন্ধরার এমডি

অপরাধ আইন ও আদালত এইমাত্র রাজধানী

গুলশানে তরুণীর লাশ উদ্ধার
লাখ টাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে
অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ
বসুন্ধরার এমডির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : গুলশানে লাখ টাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে কলেজ পড়–য়া তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকান্ড করতে গিয়ে ফেঁসে যাচ্ছেন বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীর। সোমবার রাতে গুলশানের ওই ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান ওরফে মুনিয়া নামে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এঘটনায় নিহতের বড় বোন বাদি হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে গুলশান থানায় মামলা করেছেন।
এর আগে গত ২০০৬ সালের ৪ জুলাই রাতে গুলশানে খুন হন বসুন্ধরা টেলিকমিউনিকেশসন্স নেটওয়ার্ক লিমিটেডের পরিচালক সাব্বির আহমেদ। ওই ঘটনায় নিহতের ভগ্নিপতি এ এফ এম আসিফ বাদি হয়ে বসুন্ধরার মালিকের ছেলে সাফিয়াত সোবহান সানবীর কে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়।
জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যার পর গুলশান-২-এর ১২০ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান (মুনিয়া) নামের এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান। কুমিল্লার উজির দিঘিরপাড়-এ তাদের বাড়ি। এক লাখ টাকা ভাড়ায় মাস দুয়েক আগে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন মোসারাত।
গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেছেন, ঠিক কি কারণে তরুণী আত্মহত্যা করেছেন তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। লাশ উদ্ধারের পরপরই রাতেই ফ্ল্যাটবাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে।
জানা গেছে, কলেজ শিক্ষার্থী মোসারাত জাহান (২১) মিরপুর ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। গত দুই বছর আগে বসুন্ধরা মালিকের ছেলে সায়েম সোবহান আনভীরের (৪২) সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের পর থেকেই তারা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় দেখা করা এবং প্রতিনিয়ত মোবাইলে কথা বলতেন। একপর্যায়ে দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
নিহত তরুণীর বোন নুসরাত বলেছেন, ২০১৯ সালে তার মোসারাতকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আনভীর বনানীতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন। ২০২০ সালে আনভিরের পরিবার এক নারীর মাধ্যমে তাদের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারে। এরপর আসামির মা মোসারাতকে ডেকে নিয়ে বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি দেখিয়ে ঢাকা ছাড়ার জন্য বলেন। পরে আনভীর কৌশলে তার বোনকে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দিয়ে পরে বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দেন।
তিনি আরো বলেন, গত ১মার্চ তার বোন মোসারাতকে প্ররোচিত করেন আনভীর। তিনি বাসা ভাড়া নিতে নুসরাত ও তার স্বামীর পরিচয়পত্র নেন। পরে ফুঁসলিয়ে মোসারাতকে ঢাকায় এনে তিনি গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কে বাসা (ফ্ল্যাট-বি-৩) ভাড়া নেন। ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে আসামি ও তার (বাদীর) বোনের স্বামী-স্ত্রীর মতো ছবি তুলে তা বাঁধিয়ে রাখা হয়।
মামলার সূত্র জানায়, মামলার বাদি তার বোনের মাধ্যমে জানতে পারেন, আসামি তাকে বিয়ে করে বিদেশে স্থায়ী হবেন। দেশে থাকলে আনভীরের মা-বাবা তাকে কিছু না করলেও তার বোনকে মেরে ফেলবেন। গত ১ মার্চ থেকে আনভীর মাঝেমধ্যে ফ্ল্যাটে আসা-যাওয়া করতেন।
গত ২৩ এপ্রিল মোসারাত তাকে ফোন করে বলেছেন, ফ্ল্যাটের মালিকের বাসায় গিয়ে ইফতার করে ছবি তোলার কারণে আনভীর তাকে বকা দিয়েছেন। আর সেই ছবি ফ্ল্যাটের মালিকের স্ত্রী ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। এ ছবি আনভীরের স্ত্রী পিয়াসা দেখেছেন। পিয়াসা মালিকের স্ত্রীর ফেসবুক বন্ধু। এখন পিয়াসা তার মাকে সবকিছু জানিয়ে দেবেন। আনভীর দুবাই যাচ্ছেন, মোসারাত যেন কুমিল্লায় চলে যান। আসামির মা জানতে পারলে তাকে মেরে ফেলবেন। এর দু’দিন পর ২৫ এপ্রিল মোসারাত তাকে ফোন করে কান্নাকাটি করে বলেছেন, আনভীর তাকে বিয়ে করবেন না, শুধু ভোগ করেছেন। আর তাকে বলা হয়েছে, তিনি শত্রুর সঙ্গে দেখা করেছেন। এজন্য তাকে (মোসারাতকে) তিনি ছাড়বেন না। এরপর মোসারাত চিৎকার করে বাদিকে বলেছেন, আসামি তাকে ধোঁকা দিয়েছেন। যেকোনো সময় তার বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারা যেন দ্রুত ঢাকায় আসেন।
এরপর তার বোন নুসরাত আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসেন। গুলশানের বাসায় পৌঁছে দরজায় নক করলে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিচে নেমে যান। সেখানে তারা নিরাপত্তা রক্ষীর কক্ষ থেকে বাসার ইন্টারকমে ফোন করেন। পরে ফ্ল্যাটের মালিকের নম্বরে ফোন দিলে তিনি মিস্ত্রি এনে তালা ভেঙে ঘরে ঢোকার পরামর্শ দেন। পরে মিস্ত্রি ডেকে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখতে পান, তার বোন গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শোয়ার ঘরের সিলিংয়ে ঝুলে আছেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে ওড়না কেটে নিহত মোসারাতের লাশ, আলামত হিসেবে আসামির সঙ্গে ছবি, আসামির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে লেখা ডায়েরি ও তার ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন জব্দ করেছেন। সূত্র জানায়, মামলার আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনায় গত ২৬ এপ্রিল বেলা ১১টা থেকে বিকেল সোয়া ৪টার মধ্যে যেকোনো সময় মোসারাত মারা যান। বাদী নুসরাত মামলার আসামির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
বসুন্ধরার এমডির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : এদিকে গুলশানে তরুণীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মঙ্গলবার আবেদন করেছে পুলিশ। আদালত পুলিশের আবেদন মঞ্জুর করেছেন।
আদালত সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) জাফর হোসেন বলেন, সায়েম সোবহানের দেশত্যাগে পুলিশের করা আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, কারও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আদালতের অনুমতির প্রয়োজন। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিবাসন কর্তৃপক্ষকেও সায়েম সোবহান যাতে দেশ ছাড়তে না পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এই মামলায় পুলিশ সায়েম সোবহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনার বিষয়ে সায়েম সোবহানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগে চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
উল্লেখ, রাষ্ট্রপক্ষ উপযুক্ত সাক্ষী হাজির করতে ‘ব্যর্থ হওয়ায়’ বসুন্ধরা টেলিকমের পরিচালক হুমায়ুন কবীর সাব্বির হত্যা মামলায় পাঁচ আসামির সবাইকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। ঢাকার ৪ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোতাহার হোসেন বৃহস্পতিবার দুপুরে এই রায় দেন।
বসুন্ধরার মালিকের ছেলে সাফিয়াত সোবহান সানবীর ছিলেন এ মামলার প্রধান আসামি। তিনি ছাড়াও নূরে আলম ও হুমায়ূন কবীর নামে দুই জন পলাতক ছিলেন। বাকি দুই আসামি খায়রুল হাসান উজ্জ্বল ও শামসুদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
২০০৬ সালের ৪ জুলাই রাতে গুলশানের এক বাড়িতে খুন হন বসুন্ধরা টেলিকমিউনিকেশসন্স নেটওয়ার্ক লিমিটেডের পরিচালক সাব্বির। নিহতের ভগ্নিপতি এএফএম আসিফ এই হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট মো. আরমান আলী ২০০৮ সালের ১২ মে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেন। তাতে বলা হয়, গুলশানের ১০৪ নম্বর সড়কে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ৩/জি নম্বর বাসার ছাদ থেকে সাব্বিরকে ফেলে দেওয়া হয়। বিচারক মোতাহার হোসেন রায়ে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ বস্তুনিষ্ঠ, প্রকৃত ও বাস্তব সাক্ষী উপস্থাপনে ব্যর্থ হওয়ায় পাঁচ আসামির সবাইকে বেকসুর খালাস দেওয়া হলো।