৪ বিষয় সামনে রেখে তদন্ত নেমেছে পুলিশ

অপরাধ আইন ও আদালত এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন

মুনিয়ার বিষয়ে জানতে হুইপপুত্র শারুনকে জিজ্ঞাসা

 

বিশেষ প্রতিবেদক : গুলশানে লাখটাকায় ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান ওরফে মুনিয়ার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচণার মামলার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
এদিকে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় কারও অপরাধ থেকে থাকলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। আর কারও অপরাধ থাকলে তার শাস্তি হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজের বাসায় এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, আইন অনুযায়ী তদন্ত আইন চলবে। যে অপরাধী হয়, তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তবে বিষয়টি যেহেতু তদন্তাধীন, তা শেষ হলেই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে’।
সূত্র জানায়, গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে তরুণীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি চার বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করছে পুলিশ। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বুধবার এ তথ্য জানান। তিনি বলেছেন, তরুণীর লাশ উদ্ধারের ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে নানামুখী তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে যা যা করার দরকার সবই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘আত্মহত্যায় প্ররোচণার’ অভিযোগে মামলা হলেও এটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো ঘটনা আছে তাও পুলিশ খতিয়ে দেখছে।
গত সোমবার সন্ধ্যায় মোসারাত জাহান মুনিয়া (২১) এর তরুণীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনা ‘আত্মহত্যায় প্ররোচণার’ অভিযোগে তরুণীর বোন মামলা করেন। মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। আর পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মঙ্গলবার আনভীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূলত চারটি বিষয় রেখে মামলাটির তদন্ত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মুনিয়ার সঙ্গে ম্যাসেঞ্জারসহ এ ধরণের প্ল্যাটফর্মে কাদের যোগাযোগ ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া মামলার এজাহারে পিয়াসা নামে এক মেয়ের নাম এসেছে, যার পুরো নাম ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা। তিনি আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের সাবেক স্ত্রী। মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার যোগসূত্র কীভাবে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধার ও এ নিয়ে মামলা হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কিছু উপকরণ ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ সূত্রগুলো খতিয়ে দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীর সঙ্গে মুনিয়ার কিছু কথোপকথনের স্ক্রিনশটের সূত্র ধরে মঙ্গলবার বিকেলে একটি সূত্র তার কাছে কিছু তথ্য জানতে চেয়েছিল। এ বিষয়ে শারুন গণমাধ্যমে বলেছেন, সূত্রের জানতে চাওয়া বিষয়গুলো তিনি জানিয়েছেন। তবে কে তাকে ফোন করেছিলেন, সে ব্যাপারে হুইপপুত্র কিছু বলতে চাননি। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হতে থাকে, মৃত্যুর আগে শারুন চৌধুরীর সঙ্গে মোসারাত জাহান মুনিয়ার কথা হয়েছিল। এ কারণেই শারুনের সঙ্গে কথা বলে ওই সূত্র। শারুন সরকারদলীয় হুইপ ও চট্টগ্রামের সাংসদ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে।
তিনি আরো বলেছেন, তার কাছ থেকে একটি সূত্র মোসারাতের সঙ্গে কথোপকথনের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে জানতে চেয়েছে, তিনি মোসারাতকে চেনেন কি না। মাসারাতের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। আর মোসারাত ফেসবুকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনিই তাকে জানান, বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে তার সাবেক স্ত্রীর সম্পর্ক হয়েছে। তবে শারুনের দাবি, মোসারাতের মৃত্যুর পর ফেসবুকে তার সঙ্গে কথোপকথনের যে স্ক্রিনশট ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো মিথ্যা। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে এই কথোপকথনগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করারও দাবি জানিয়েছেন শারুন।
গত ২৬ এপ্রিল গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাতের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, ওই ফ্ল্যাটে বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের যাতায়াত ছিল। কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুনিয়া আত্মহত্যা করেছেন, তা তদন্ত করে দেখবে পুলিশ।
চট্টগ্রাম-১২ আসনের সাংসদ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে শারুন চৌধুরী। সম্প্রতি চট্টগ্রামের এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচণা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। শারুন ওই অভিযোগও অস্বীকার করে আসছেন।
ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটে কথোপকথন কত তারিখের, তা স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটা বাজার কিছু আগে। খুদে বার্তার ওই কথোপকথনে মোসারাত মুনিয়া শারুনকে লেখেন, তিনি ভালো নেই। এরপর লেখেন, ‘উনি তো আমাকে বিয়ে করবে না। কী করব আমি?’ জবাবে শারুন লেখেন, ‘আগেই বলেছিলাম, ওর কথা শুইনো না। ও আমার বউকে বলছে বিয়ে করবে, কিন্তু করে নাই। মাঝখানে আমার মেয়েটা মা ছাড়া হয়ে গেছে। অবশ্য এই কথোপকথনের কোথাও মুনিয়া বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের নাম উল্লেখ করেননি। ‘উনি’ বলে সম্বোধন করেছেন। আর তাদের এই কথোপকথনের সত্যতা সকালের সময়ের পক্ষ থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যদিও একটি সূত্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ওই কথোপকথনটি বানানো নয়। এ বিষয়ে সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ চন্দ্র চক্রবর্তী বলেছেন, এই বিষয়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে এর সত্যতা সম্পর্কে বলা যাচ্ছে না। ফেসবুক লাইভে যা বললেন মুনিয়ার বড় বোন
অপরদিকে নিহত মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান গত মঙ্গলবার রাতে ফেসবুক লাইভে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।তিনি বলেছেন, মুনিয়া ঘটনার দিন ফোন করে বলছিল, ‘আপু তোমরা কখন আসবা, আমার অনেক বিপদ। নুসরাত জাহান জানান, মঙ্গলবার মুনিয়ার কুমিল্লায় চলে আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগের দিনেই বিপদের কথা ফোনে জানতে পারি।
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা যখন গুলশানের ফ্ল্যাটে ছুটে যাই, দেখি ভিতর থেকে দরজা বন্ধ। ওই সময় ফোনও বন্ধ ছিল মুনিয়ার। পরে দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করি আমরা। দরজা ভাঙতে গিয়ে এতো জোরে শব্দ হচ্ছে অথচ ভিতর থেকে কোনো শব্দ হচ্ছিল না। নুসরাত জাহানের ভাষায়, এসময় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পরি। দরজা ভেঙ্গেই দেখি ঝুলন্ত অবস্থায় মুনিয়া। পা দুটি বিছানায়, হালকা বাঁকানো ছিল। বিছানা একদম পরিপাটি ছিল। মনে হচ্ছিল কেউ সেট করে রেখে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
নুসরাত আরো বলেন, মুনিয়ার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ মুনিয়ার সাথে সর্বশেষ কথা হয়। তার বোনকে বিয়ের আশ্বাস দিয়েছিল অভিযুক্ত শিল্পপতি। কিন্তু বিষয়টা গোপন রাখতে হবে এই শর্ত দেওয়া হয়েছিল মুনিয়াকে। এমনকি বিয়ের পরও বিষয়টি গোপন রাখার কথা ছিল।
গুলশানের ফ্ল্যাটের বিষয়ে নুসরাত বলেছেন, গুলশানের ফ্ল্যাট ভাড়ার বিষয়টি আমরা জানতাম। আমরা মুনিয়াকে নিষেধও করেছি। কিন্তু মুনিয়া সরল মনে সব বিশ্বাস করেছে। ওই শিল্পপতি প্রতি তার বিশ্বাসই কাল হয়েছে। এছাড়া ডায়েরির বিষয়ে বড় বোন বলেন, ডায়েরিতে অনেক ছবি আঁকা, আঁকার সাথে সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়েও অনেক কথা ছিল। সকল ডকুমেন্ট পুলিশের হেফাজতে আছে। তিনি জোর গলায় বলেন, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকা-। এর সুষ্ঠু তদন্ত চান তিনি।
গত সোমবার রাজধানীর গুলশানে অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার পর সোমবার রাত দেড়টার দিকে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান। গত মাসের ১তারিখে গুলশানের ১২০ নম্বর রোডের একটি বাড়ি ভাড়া নেন মোসারাত জাহান মুনিয়া। বাসাটির ভাড়া ছিল ১ লাখ টাকা। বাসায় একাই থাকতেন মুনিয়া। সোমবার সন্ধ্যায় বাসার তিন তলার ফ্ল্যাট থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ কুমিল্লায় নেওয়া হয়। পরে মা-বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
উল্লেখ্য, সোমবার রাতে ঢাকার গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় ২১ বছর বয়সী মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে তার বোন ইসরাত জাহান তানিয়া গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচণার’ অভিযোগ আনা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, ওই তরুণীর সঙ্গে ‘প্রেমের সম্পর্ক’ ছিল আনভীরের। গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে তার যাতায়াতও ছিল। তবে এসব বিষয়ে সায়েম সোবহানের কোনো বক্তব্য কোনো গণমাধ্যমই পায়নি।