ধারদেনায় আর কত দিন!

এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন

৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা চান পরিবহন মালিকরা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : মহামারি করোনার প্রভাবে চলমান কলডাউনে চরমবিপাকে পড়েছে নি¤œ আয়ের মানুষ। বিশেষ করে পরিবহন ও নির্মাণ শ্রমিকদের দিন কাটছে ধারদেনা করে। এভাবে আর কত দিন চলবে এমন দুশ্চিন্তায় এখন তারা মানষিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রফিকুল ইসলাম নামের এক নির্মাণ শ্রমিক সকালের সময়কে বলেন, চলমান লকডাউনে আমার প্রায় পাঁচ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। কথা হয় পরিবহন শ্রমিক নুর আমিনের সঙ্গে। চলমান লকডাউনে ধারদেনা আর মানুষের সহায়তায় খেয়ে না খেয়ে থাকার কথা জানান তিনি।
এদিকে, গণপরিবহন খুলে দেওয়ার দাবিতে নীলফামারীর সৈয়দপুরে সড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে সৈয়দপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ওই অবরোধ পালন করে শ্রমিকরা। এতে করে পণ্য বহনসহ সব ধরণের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শ্রমিক নেতারা বলেন, অব্যাহত লকডাউনে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তবে আমরা লকডাউনের বিরুদ্ধে নই। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় আমরা কর্মহীন হয়ে পড়েছি। শ্রমিকদের বাড়িতে চুলা জ্বলছে না। রমজানে শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা না খেয়ে রোজা রাখছেন।
তারা অভিযোগ করে বলেন, বাস বন্ধ থাকলেও ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও ব্যক্তিগত গাড়িতে যাত্রী পরিবহন চলছে। আন্তজেলা পথেও টেম্পু, অটোরিকশা ও ইজিবাইকে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। এসবে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই। শুধু চলছে না বাস। এ সময় তারা গণপরিবহন চালুর দাবি জানান।
জানা গেছে, তৃতীয় দফা লকডাউনের কারণে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের বিষয়টি আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। লকডাউনের মধ্যে ট্রেন চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দ্বিতীয় দফা লকডাউন শেষে ২৯এপ্রিল থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার ব্যাপারে রেল ভবন থেকে নির্দেশনা দেয়া হয় গত রোববার। কিন্তু সোমবার আবারো তৃতীয় দফা লকডাউন ঘোষণা করা হলে ট্রেন চলাচলের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওযায় প্রথমে প্রতিটি ট্রেনে অর্ধেক টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় রেল কর্তৃপক্ষ। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাত্রীদের মাঝে প্রতিটি ট্রেনের অর্ধেক সিট ফাঁকা রেখে অবশিষ্ট অর্ধেক সিট (এক সিট বাদ দিয়ে) যাত্রীদের মাঝে বিক্রি করা হয়। গত ১৪ এপ্রিল লকডাউন ঘোষণা করা হলে-দূর পাল্লার বাস থেকে শুরু করে সকল গণপরিবহন বন্ধ করা হয়। একই সাথে সকল যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।
অপরদিকে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে দ্রুত গণপরিবহন চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের ঈদের বেতন-ভাতা পরিশোধে পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বানও জানায় সংগঠনটি। বৃহস্পতিবার রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে এসব দাবি জানায় সংগঠনটির নেতারা।
নেতারা বলেন, ১৪ এপ্রিল থেকে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সারাদেশে ৫০ লাখ পরিবহন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দিনের আয়ে দিন চলা এই শ্রমিকদের পরিবারগুলো এখন অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার করে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে যত সিট তত যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন পরিচালনার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, বাস ছাড়া সবই তো চলছে। বাস চলাচল না করায় সাধারণ মানুষ বিকল্প পথে মাইক্রোবাস ভাড়া করে, ট্রাকে গাদাগাদি করে চলাচল করছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে। এর চেয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস চলাচল করা ভালো।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকার জনসমাগম এড়াতে প্রথমে ৫ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরে এ নিষেধাজ্ঞা আরো বাড়িয়ে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। তবে সে সময় সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিল্পকারখানা, গণপরিবহন চালু ছিল। এরপর সরকার ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউনে যায়, যাতে বন্ধ ছিল গণপরিবহন এবং দোকানপাট। সরকারের সর্বশেষ নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৫ মে পর্যন্ত গণপরিবন বন্ধ থাকছে।
লকডাউনের চলমান পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন নির্মাণশিল্পে জড়িত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। সুনির্দিষ্ট ডেটাবেইজ না থাকায় এসব শ্রমিক সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। কাজ না থাকায় বিভিন্ন এনজিও’র ক্ষুদ্রঋণে চলছে তাদের জীবনের চাকা। এই দুর্দিনে এসব শ্রমিককে নিয়ে রাজনীতি করা সংগঠনগুলোও ফান্ড না থাকার অজুহাতে কোনো সহযোগিতা করছে না। ফলে পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটছে এসব শ্রমিক পরিবারের। এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে নির্মাণসহ ৪টি শিল্পের ৮০ শতাংশ শ্রমিকের বেতন কমে গেছে। আর করোনা দীর্ঘায়িত হওয়ায় ধারদেনায় জর্জরিত হয়েছেন তারা। এসব শ্রমিককে নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর হিসেবে, এই খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ জড়িত। করোনার কারণে অন্য খাতের মতো নির্মাণ খাতেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। কাজ না থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই খাতের শ্রমিকরা।
বাংলাদেশ নির্মাণ শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ বি এম সিদ্দিক মিন্টু বলেন, এই খাতে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে ২০ লাখ শ্রমিক সরকারি মেগা প্রজেক্টে নিয়োজিত। বাকিরা বেসরকারি নির্মাণকাজের জড়িত। কিন্তু করোনার কারণে এক বছর ধরে দেশে বেসরকারি পর্যায়ের অধিকাংশ নির্মাণকাজ বন্ধ আছে। এসব শ্রমিকের সরকারি কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় সরকারের দেওয়া অর্থ কিংবা খাদ্য সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
নির্মাণ শ্রমিকসহ ৪টি খাতের শ্রমিকদের নিয়ে সম্প্রতি জরিপ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও সুইডেনের ওয়েজ ইন্ডিকেটর ফাউন্ডেশন (ডব্লিউআইএফ)। জরিপে করোনাভাইরাসের প্রভাবে চার শিল্প খাতের ৮০ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। এই জরিপেও পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রমিকরা ধার কিংবা ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব শ্রমিকদের অনেকেই আবার সরকারের দেওয়া খাদ্যসহায়তা নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মজুরি কমে যাওয়ার পরে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন, জরিপে এমন প্রশ্নের উত্তরে ৬৬শতাংশ শ্রমিক জানান, তারা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। ২৩শতাংশ বলেছেন সরকারের দেওয়া খাদ্যসহায়তা নেওয়ার কথা। আবার ২০শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন তারা। এ ছাড়া ৯শতাংশ নিয়োগকর্তার কাছ থেকে রেশন পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
জরিপে বলা হয়, তৈরি পোশাক, চামড়া, নির্মাণ ও চা-এই চার খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুরি পান নির্মাণশিল্পের শ্রমিকরা। তাদের মাথাপিছু গড় মজুরি সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৫৪৭ টাকা। আবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে কাজও করতে হয় তাদের। তারাই এখন সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় আছেন। কারণ এই শিল্পে কর্মরত কোনো শ্রমিকেরই যৌথ চুক্তি নেই। যদিও অন্য তিনটি খাতে যৌথ চুক্তি কিছুটা হলেও আছে।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে গত এক দশক ধরে সড়ক, মহাসড়ক, রেলওয়ে, বন্দর ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা- চলছে। ফলে নির্মাণশিল্পে কর্মীর কর্মসংস্থান বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে নির্মাণশিল্পে ৩৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন, সেখানে তা বেড়ে এখন ৪০ লাখে উঠেছে। জরিপ অনুযায়ী বিপুল এই শ্রমিকদের মাত্র এক-দশমাংশ স্থায়ী নিয়োগ চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন। বাকিরা কোনো ধরণের নিয়োগপত্র ছাড়াই কাজ করছেন। তারা সাধারণত সরবরাহকারী ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করেন।
জরিপের ফলাফল সম্পর্কে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মিনহাজ মাহমুদ বলেন, শ্রমিকরা যে খাতেরই হোন না কেন, তাদের অনেকেই চুক্তির আওতায় নেই। করোনার প্রভাবে শ্রমিকদের মজুরি কমে গেছে। যে কারণে সংসার পরিচালনায় আত্মীয়-স্বজনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সহযোগিতা নিতে হচ্ছে তাদের।