মুনিয়ার বোনকে মোবাইল ফোনে হুমকির অভিযোগ

অপরাধ এইমাত্র

বসুন্ধার এমডি’র স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ৮জন দুবাই গেলেন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : গুলশানে লক্ষ টাকায় ভাড়া বাসা থেকে শিক্ষার্থী মুনিয়ার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের পর আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা বাদিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহতের বড় বোন তানিয়া অভিযোগ করে বলেছেন, মামলা দায়েরের পর থেকে তার মোবাইলে বার বার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সুত্র জানায়, রাজধানীর গুলশানে কলেজ ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের পর কুমিল্লার বাগিচাগাঁওয়ে মুনিয়ার বোন তানিয়ার বাসায় শুধু কান্নার রোল পড়ে। ঘরের দেয়ালে মুনিয়ার আঁকা ছবি এবং ঘটনার দিন মুনিয়ার পাঠানো মোবাইলের ম্যাসেজ ও ডায়েরি দেখে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তানিয়া। মুনিয়ার বড় বোন তানিয়ার বিয়ে হয়েছে ১২বছর আগে। আর ছোট বোনকে দেখাশোনা করতে গিয়ে তার সন্তান নেওয়া পর্যন্ত হয়নি বলে জানান তিনি। তার ছোট বোন মুনিয়াই তাদের সন্তানের মতো ছিল।
তানিয়া বলেছেন, গুলশান থানায় মামলা করার পর থেকে মোবাইলে নানান হুমকি আসছে। এখন মোবাইলই বন্ধ করে দিয়েছি। ঘটনার দিন মুনিয়া সকালে গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিলো। বাড়ির মালিককে গাড়ি দিতে বলেছিলো। এমনকি বড়বোনের বান্ধবীর বাসায় দিয়ে আসতেও আকুতি জানিয়েছিলো মুনিয়া। কিন্তু তিনি সেই সুযোগই পাননি।
মুনিয়ার বড় বোনের স্বামী ব্যাংকার মিজানুর রহমান সানি গণমাধ্যমে বলেছেন, মনিয়ার খাটের চাদর ছিলো পরিপাটি। তার মরদেহে উদ্ধারের রুমটিও ছিলো গোছালো। মোবাইলগুলো ২টি একসাথে রাখা। মুনিয়ার পা বিছানার সাথে লাগানো। দেখে বোঝাই যায় হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখেছে। ফ্ল্যাটের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, বিভিন্ন সময়ের মুনিয়া আর আনভীর ছবি-সবগুলো বিবেচনা করে হত্যাকারীকে গ্রেফতারের দাবি জানান মুনিয়ার বোন ও তার বোনের স্বামী।
এদিকে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ৮সদস্য দুবাই পাড়ি দিয়েছেন। শুক্রবার রাত ১২টা ৮মিনিটে তাদের বহনকারী বিমান ভিপিসি-১১ দুবাইয়ের ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
তার আগে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৫৬ মিনিটে তারা দেশ ছাড়েন। আনভীরের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তিন দিনের মাথায় তারা দেশ ছাড়লেন। দুবাই তাদের প্রাথমিক গন্তব্য বলে জানা গেছে। সোবহান পরিবার কবে দেশে ফিরবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তবে প্লেনটি মে মাসের ৯তারিখ পর্যন্ত ভাড়া করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, সায়েম সোবহান আনভীর পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে যাওয়ার আবেদন করে একটি চার্টার্ড ফ্লাইটের অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। আবেদনে তারা ২৭এপ্রিল দেশত্যাগের কথা বলেছিলেন। মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত স্থগিত ছিল। তবে তাদের একটি চার্টার্ড ফ্লাইটের অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে ইমিগ্রেশনকে জানিয়ে দেওয়া হয় যাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা নেই কেবল তারাই ওই ফ্লাইটে যেতে পারবেন।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, চার্টার্ড ফ্লাইটটিতে দেশ ছেড়েছেন সায়েম সোবহান আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সোবহান, তাদের দুই সন্তান, ছোট ভাই সাফওয়ান সোবহানের স্ত্রী ইয়াশা সোবহান, তাদের মেয়ে ও পরিবারের তিনজন গৃহকর্মী ডায়ানা হার্নানডেজ চাকানান্দো, মোহাম্মদ কাদের মীর ও হোসনে আরা খাতুন। বৃহস্পতিবার বিকেলে সিঙ্গাপুর থেকে তাদের ভাড়া করা একটি প্লেন ঢাকায় আসে। পরে ভিপিসি-১১ ফ্লাইটে রাত ৮টা ৫৬ মিনিটে ঢাকা থেকে উড়ে যান তারা। বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় তারা বিমানবন্দরে পৌঁছে ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সারেন। দুবাইয়ে গিয়ে তাদের সবার করোনাভাইরাসের টিকা নেয়ার কথা ছিল।
কলেজ ছাত্রী মুনিয়ার ‘আত্মহত্যার প্ররোচনা’র মামলায় যাদের নাম এসেছে তাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ। তাদের জবানবন্দিসহ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা হবে। প্রাথমিকভাবে অনেককে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে বলে জানান পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ চক্রবর্তী।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইতিমধ্যে অনেকের নাম এসেছে। এজাহারেও অনেকের নাম রয়েছে। এই ঘটনায় তাদের কী ধরনের কর্মকা- ছিল তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর যাদের নাম এসেছে তাদেরকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। আমরা প্রাথমিকভাবে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। তথ্য নিচ্ছি। ১৬১ বা প্রাসঙ্গিক বক্তব্য আদালতে ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করার ব্যবস্থা করা হবে। এই মামলায় পুলিশ তৎপর থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, পুলিশের তৎপরতার কারণেই মামলাটি এ পর্যায়ে এসেছে। এটি অপমৃত্যু মামলা হতে পারতো। একটি প্রতিশ্রুতিশীল মেয়ে যার বয়স মাত্র ২১ বছর, সে কোনো কারণ ছাড়াই এভাবে আত্মহত্যা করতে পারে না। সেদিন খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা সেখানে ছুটে যাই। দেয়ালে অভিযুক্তের সঙ্গে মেয়েটির ছবি দেখে আমরা মনে করেছি, এর মধ্যে বড় ধরনের কোনো প্ররোচনা রয়েছে। এই আশঙ্কা থেকেই মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা নেয় পুলিশ। মোসারাতের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ সপ্রণোদিত ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করছে। ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে, ভিকটিমের পরিবারকে নিরাপত্তা যদি দিতে হয় এক্ষেত্রে যা যা করা দরকার পুলিশ তা করবে।
উল্লেখ্য গত ২৬এপ্রিল মোসারাত জাহান মুনিয়াকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে মামলা হয়। গত ২৭এপ্রিল আদালত তার বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী সায়েম সোবহান আনভীর এখনও দেশে রয়েছেন।