তরমুজ চাষিরা বিপাকে, সিন্ডিকেট ব্যবসায় ক্রেতাদের চরম দুর্ভোগ

বানিজ্য

সুমন হোসেন, খুলনা ব্যুরো : মৌসুমি ফল তরমুজ। গ্রীষ্মকালে তরমুজের চাহিদা বেড়ে যায়। এ বছর রমজান ও গ্রীষ্মকালের তাপদাহ একসঙ্গে শুরু হওয়ায় অন্যান্য বছরের চেয়ে তরমুজের চাহিদা বেশি। পাশাপাশি করোনাকালীন ফ্রিজিং পানীয়, আইসক্রিম খেতে নিরুৎসাহিত করায় তরমুজের ওপর চাপ বেড়েছে। এ সুযোগে তরমুজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। বিক্রি করছেন কেজি দরে। কেনা দামের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মুনাফা করছেন তারা।
জরিপ বলছে, দেশে চাহিদার ৬৫ শতাংশ তরমুজ উৎপাদিত হয় দক্ষিণাঞ্চলে। কিন্তু সেই দক্ষিণাঞ্চলেই তরমুজের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
কৃষি অধিদফতর জানিয়েছেন, বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, লোকসান কাটছে না। লোকসান পোষাতে কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে তরমুজ। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায় এই সুস্বাদু ফল তরমুজ।
এরই মধ্যে বরিশাল জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ক্রেতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেজি দরে বিক্রেতাদের জরিমানা করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। মানুষ এ অভিযানকে সাধুবাদ জানায়। একই সঙ্গে দেশব্যাপী অভিযান শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন। তারপরও থামছে না কেজি দরে তরমুজ বিক্রির সিন্ডিকেটের জাল। আজকের দেশ’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তরমুজের দাম বাড়ার নেপথ্যের কাহিনি।
বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খামার বাড়ির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বিভাগের ছয় জেলায় ২৪ হাজার ৪৮১ হেক্টর জমিতে তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। সর্বোচ্চ ফলন হয়েছে পটুয়াখালীতে। এ জেলায় ১৪ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে তরমুজের ফলন হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় এ বছর দ্বিগুণ।
বিভাগের বাকি পাঁচ জেলায় কম-বেশি তরমুজের ফলন হয়েছে। এর মধ্যে বরিশালে ৪৬৩ হেক্টর, পিরোজপুরে ১৪৮ হেক্টর, ঝালকাঠিতে ৩৫ হেক্টর, বরগুনায় চার হাজার ৪৩ হেক্টর এবং ভোলায় পাঁচ হাজার ৫৫৬ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। বিভাগে তৃতীয় অবস্থানে থাকা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা, বাবুগঞ্জ এবং বরিশাল সদরে বেশি তরমুজ উৎপাদিত হয়েছে।
মেহেন্দীগঞ্জের চর লড়াইপুর, তালুকদার হাট, জাঙ্গালিয়া এবং বরিশাল সদর উপজেলার চরআইচা, লাহারহাট চর ঘুরে দেখা যায়, ক্ষেতে তরমুজ নেই। টানা সাড়ে তিন মাস পরিশ্রমের পর বাড়িতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন চাষিরা। কেউ কেউ দাদন, সুদ ব্যবসায়ীদের দেনা পরিশোধ করছেন। আবার মূলধন উঠেনি বলে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন অনেক তরমুজ চাষি।
চাষিরা জানিয়েছেন, ১৩ দিন আগে সর্বশেষ ক্ষেত থেকে তরমুজ তুলে নিয়ে গেছেন পাইকাররা। বাজারে যে তরমুজ পাওয়া যাচ্ছে তা মাঠের শেষ সময়ের তরমুজ।
তরমুজের বাজার কারসাজি:
চাষিরা তিন সাইজের তরমুজ শ’ হিসেবে আড়তে বিক্রি করেন। তবে অধিকাংশ চাষি দাদন ও সুদের জালে বন্দি। ১২-১৫ কেজি ওজনের তরমুজের শ’ সর্বোচ্চ ১৮,০০০ টাকা, ৬-১০ কেজি ওজনের তরমুজের শ’ ১০,০০০ টাকা এবং ৩-৬ কেজি ওজনের তরমুজের শ’ ৫,০০০ টাকা বিক্রি করেন চাষিরা। আড়তদাররা দাম বাড়িয়ে শ’ হিসেবে তরমুজ বিক্রি করেন। ব্যবসায়ীরা মূলত কেজিতে তরমুজ বিক্রি করেন বেশি মুনাফার আশায়।
রূপাতলী বাজারের ব্যবসায়ী সিদ্দিুকর রহমান বলেন, ব্যবসার চালান উঠাতে কষ্ট হচ্ছে আমাদের। তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি ওজনের ১০০ তরমুজ ২০ হাজার টাকায় কিনেছি। পিস পড়েছে ২০০ টাকা। সেই সঙ্গে গাড়ি ভাড়া। এরপর তরমুজ পচে যাচ্ছে। গাড়িতে ওঠাতে-নামাতে নষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা লোকসানে আছেন। বাজারে তরমুজের দাম বৃদ্ধি এবং কেজি দরে বিক্রিতে বাধ্য করছেন আড়তদাররা। তারা চাষিদের কাছ থেকে তরমুজ কিনে চালানের সব চেয়ে ছোট তরমুজ আর সব চেয়ে বড় তরমুজটি পরিমাপ করেন। এরপরে ছোট-বড় মিলিয়ে একই দামে লটে তরমুজ বিক্রি করেন। আড়তদারদের কারসাজি বন্ধ হলে তরমুজ পিস হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব।
খুচরা তরমুজ বিক্রেতা উজ্জল হাওলাদার বলেন, আড়ত থেকে বেশি দামে তরমুজ কিনতে হয়। আড়তদাররা আমাদের ঠকাচ্ছে। তাদের কেউ কিছু বলে না। তারা দাম কমালে আমরা পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রি করতে পারি। কিন্তু তারাই তো কেজি দরে বিক্রিতে বাধ্য করছে।
এই বিক্রেতা বলেন, আগের চালানে ২০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে আমার। লটে তরমুজ কিনে দেখি ছোট-বড় মেলানো। অথচ প্রতি তরমুজের দাম পড়েছে একই। কিন্তু বিক্রি করতে গেলে সাইজ দেখে দাম বলেন ক্রেতারা। এজন্য কেজি দরে বিক্রি করি। এতে আমাদের একটু লাভ হয়।
তরমুজ ব্যবসায়ী কিসমত আলী বলেন, আমরা আড়ৎ থেকে শ’ হিসেবে তরমুজ কিনি। ছোট-বড় মেলানো থাকে। ক্ষতি পোষানোর জন্য মূলত কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করছি।
বরিশাল নগরীর পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ আড়তে তরমুজ শেষের দিকে। এখানে কেজি দরে তরমুজ বিক্রি হয় না। আড়তদাররা চাষির কাছ থেকে শ’ হিসেবে কিনে আড়তে শ’ হিসেবে বিক্রি করেন। বিক্রির আগে লটের তরমুজ ভালোভাবে যাছাই-বাছাই করে দেখেন ব্যবসায়ীরা। তারপরে পছন্দ হলে দরদাম করে নিয়ে যান।
পোর্ট রোডের মেসার্স সাজোয়ান ফুরুটসের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান উজ্জল বলেন, চাষিদের কাছ থেকে আমরা পিস হিসেবে তরমুজ কিনি। ব্যবসায়ীদের কাছে সেভাবেই বিক্রি করি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা কেন কেজি দরে বিক্রি করছেন তা আমরা বলতে পারব না।
আতিকুর রহমান বলেন, ১২-১৫ কেজি ওজনের তরমুজ কৃষকের ক্ষেত থেকে ২৪০-২৬০ টাকায় কিনেছি। পরিবহন খরচ, শ্রমিক খরচ এবং আমাদের লভ্যাংশ যুক্ত করে সেটিকে বাড়িয়ে বিক্রি করছি। তবে আমরা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করি না।
মেসার্স বরিশাল ফল ভান্ডারের আড়তদার সৌরভ ব্যাপারী বলেন, আড়তে কখনো কেজি দরে তরমুজ বিক্রি হয় না। আমরা চাষিদের কাছ থেকে লটে কিনে নিয়ে আসি এবং লটেই বিক্রি করি।
পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তরমুজ চাষিরা:
তরমুজের বাজার যখন সরগরম তখন অনুসন্ধানে জানা গেল অবাক করা খবর। বরিশালের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরমুজ চাষি মূলধন তুলতে পারেননি। অনেকেই দাদন, কর্জ আর সুদের টাকা দিতে পারছেন না। ফলে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।
ভোলা থেকে এসে তরমুজ চাষের জন্য মেহেন্দীগঞ্জের চরে ঘর বেঁধেছেন শাহজাহান হাওলাদার। তিনি বলেন, ৭৫ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। ১২-১৫ কেজি ওজনের ১০০ তরমুজ ১৮-২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। কেজি দরে তরমুজ বিক্রির প্রশ্নই আসে না।
কেজি দরে যারা তরমুজ বিক্রি করছেন তারা প্রতারণা করছেন উল্লেখ করে এই চাষি বলেন, এক মৌসুমে ৩০ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়েছি। তিন মাস তিনজন শ্রমিককে বেতন দিয়ে রেখে পরিবারের চারজন সদস্য সার্বক্ষণিক ক্ষেতে পরিশ্রম করে ১৫ হাজার টাকা ব্যবসা হয়েছে।
লাহারহাটের নরকাঠি গ্রামের তরমুজ চাষি ইউসুফ ব্যাপারী বলেন, চলতি বছর ৩২০ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ৮-১০ কেজি ওজনের ১০০ তরমুজ ১৭-১৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। ৫-৬ কেজি ওজনের তরমুজ ৮-৯ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। ১-৩ কেজি ওজনের তরমুজ দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করেছি।
তিনি বলেন, ১৫ হাজার টাকা বেতনে কয়েকজন শ্রমিক রেখেছি। পরিবারের পাঁচজন সদস্য তিন মাস খেটেছি। এরপরও তেমন লাভ হয়নি। তরমুজ চাষে কোনোমতে জীবন চলে। কিন্তু উন্নতি নেই।
লড়াইপুর চরে কথা হয় বাউফলের বাসিন্দা জসীম ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে তরমুজ চাষ করি। এর মধ্যে এক বছর লাভের মুখ দেখেছি। বাকি চার বছর লাভের মুখ দেখিনি। চলতি বছর ৬৪০ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। একবার তোলার পর জোয়ারের পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে ক্ষেতের সব তরমুজ। এখন আমি লোকসানে পড়েছি।
জসীম ব্যাপারী বলেন, সুদের ওপর টাকা নিয়ে তরমুজ চাষ করে টাকা ফেরত দিতে পারিনি। ফলে বাউফল ছেড়ে এখন আমি লড়াইপুর চরে পালিয়ে রয়েছি। এখানে আত্মগোপনে আছি। এলাকায় গেলে পাওনাদার টাকার জন্য ধরবে। ক্ষেতের তরমুজ নষ্ট হয়ে গেছে। টাকা দেব কীভাবে?
আরেক চাষি মো. মিলন বলেন, জোয়ারের পানি আর করোনার কারণে তরমুজের ন্যায্যমূল্য পাইনি। ক্ষেত থেকে তরমুজ তুলে ট্রলার ভাড়া করে আড়তে পৌঁছে দিলে ১২-১৫ কেজি ওজনের ১০০ পিস তরমুজের দাম ধরা হয় ৮-১০ হাজার টাকা। ৬-১০ কেজি ওজনের তরমুজের পিস ধরে ৬-৭ হাজার টাকা। তারা আমাদের ঠকিয়ে ঠিকই ব্যবসা করে যাচ্ছে। আর আমি সুদের টাকা দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
লড়াইপুর চরের আরেক চাষি সুমন তালুকদার বলেন, সাত বছর তরমুজ চাষ করে ছয় বছরই লোকসান দিয়েছি। মূলত আমাদের ঠকান আড়তদাররা। তারা দাম কমিয়ে দেন। পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে দাদন নেওয়া থাকে। এজন্য ন্যায্যদাম পাই না। তরমুজ চাষ করে আমি নিঃস্ব। চরে তরমুজ ছাড়া আর কিছুই ভালো হয় না।
তরমুজ চাষি হাচেন ব্যাপারী বলেন, চার বছর ধরে তরমুজ চাষ করেছি। দুই বছরই লোকসানে পড়েছি। এবার এক বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। লাভের মুখ দেখিনি।
জাঙ্গালিয়ার চাষি ইব্রাহিম ব্যাপারী বলেন, ৩-৪ কেজি ওজনের তরমুজের শ’ দুই-তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। আসলে তরমুজ চাষিদের দুঃখের কথা কেউ শোনে না। আমরা তরমুজ চাষ করি, অথচ আমাদের ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন আড়াতদাররা।
জিম্মি ক্রেতারা:
ক্রেতাদের অভিযোগ, আমাদের জিম্মি করে তরমুজের খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করেছেন। বাজারভিত্তিক সিন্ডিকেট গড়ে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জুয়েল বলেন, ব্যবসায়ীরা আড়ত থেকে শ’ হিসেবে তরমুজ কিনে কেজি দরে বিক্রি করেন। অতি মুনাফার লোভে এ কাজ করছেন তারা। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তরমুজ কিনতে আসা পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মন্ডল দিলীপ কুমার বলেন, আমার জীবনে এই প্রথম কেজি দরে তরমুজ কিনেছি। বাধ্য হয়ে কিনলাম।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য:
ইতোমধ্যে বরিশাল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজারে অভিযান চালানো হয়েছে। দুই দিনে কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করায় ২২ জনকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার বলেন, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে কোনো পণ্য বিক্রির চেষ্টা যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। রমজানে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার হয়েছে।