বাংলাদেশি তরুণীকে যৌন নির্যাতন আসামিদের ফেরত দেবে ভারত?

অপরাধ আইন ও আদালত আন্তর্জাতিক

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণীকে বিবস্ত্র করে তিন-চারজন যুবকের শারীরিক ও বিকৃত যৌন নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওটি ধারণ করা হয় ভারতের কেরালা রাজ্যে। এ ঘটনার মূলহোতা রিফাতুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবুসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে বেঙ্গালুরু পুলিশ। এছাড়াও সর্বশেষ গত ২৮ মে যৌন নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি সেই তরুণীকে উদ্ধার করে ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ। এ ঘটনায় দুই দেশেই পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়।
বাংলাদেশি আসামি ও ভুক্তভোগী তরুণীকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গত কয়েকদিন আলোচনা হলে আদৌ ভারত আসামিদের বাংলাদেশে পাঠাবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নৃশংস ঘটনাটি যেহেতু ভারতের মাটিতে ঘটেছে এবং সেই দেশে মামলাও হয়েছে সেক্ষেত্রে ভারতের আইন অনুযায়ী বিচার হওয়ার কথা রয়েছে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বলছেন, জড়িতদের ভারত থেকে ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হচ্ছে। গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে ভারতেও মামলা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু তারা বাংলাদেশি এবং এখানে মামলা হয়েছে তাই তাদের ফিরিয়ে আনতে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
তবে পুলিশ সদর দফতর বলছে, যখন কোনো দেশে অপরাধ সংঘটিত হয় তখন সেই দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হয়। বাংলাদেশেও অনেক বিদেশি অপরাধী রয়েছে। তাদেরও বাংলাদেশের আইনে বিচার চলমান। তাদেরকে স্ব-দেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। এ ঘটনায় ভারতে অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে এবং মামলাও হয়েছে সুতরাং তাদের দেশের আইনেই বিচার হওয়ার কথা।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, ভিডিও ভাইরালের পর ভারতেও বিষয়টি আলোচিত হয়। পরে ভারতীয় পুলিশ দ্রুত সময়ে তাদের গ্রেফতার করে। ভুক্তভোগী তরুণীকে উদ্ধারসহ মূল অভিযুক্ত টিকটক হৃদয় এবং আরও চারজনকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া গেছে। যারা প্রত্যেকেই অবৈধভাবে ভারতে গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের কাছে ভিসা কিংবা পাসপোর্ট কিছুই ছিল না। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে দেখা যাবে, আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি জটিল। একদিকে, ভারতের মাটিতে নৃশংস অপরাধ, অন্যদিকে আসামিদের কাছে ভিসা কিংবা পাসপোর্ট কিছুই ছিল না। একটি অপরাধ তদন্ত করতে গিয়ে আরও কয়েকটি অপরাধ সামনে চলে আসতে পারে।
সূত্রে আরও জানা যায়, ভারত থেকে আসামি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইনের মাধ্যমেই ব্যবস্থা করতে হবে। তবে বাংলাদেশি আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি উভয় দেশের বিদ্যমান আইনের আলোকে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মো. সোহেল রানা বলেন, বাংলাদেশি আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি উভয় দেশের বিদ্যমান আইনের আলোকে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পক্রিয়া হবে। দুই দেশের পুলিশ এক্ষেত্রে মামলা সংক্রান্ত দালিলিক ও সংশ্লিষ্ট কার্যাবলি সম্পাদন করবে।
ভারতে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর থানা এলাকায়। দরিদ্র পরিবারে জন্ম বলে মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তিনি পড়ালেখা করতে পেরেছেন। ২০১৪ সালে প্রেম করে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের কুয়েত প্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে ওই নারীকে শ্বশুরবাড়ির কেউ মেনে নেয়নি। তাকে বিভিন্ন সময় শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন ও অত্যাচার সহ্য করতে হতো। যে কারণে তিনি বিয়ের প্রায় ৫ বছর পর পর্যন্ত বাবার বাড়ি কিশোরঞ্জে থাকতেন। স্বামীও কোনো খোঁজ খবর নিত না। বাবার আর্থিক অনাটনের কথা চিন্তা করে ওই নারী সৌদি আরব যাওয়ার চিন্তা করেন। ঢাকায় কয়েক মাস হাতিঝিল এলাকায় ছিলেন। ঢাকায় থাকা অবস্থায় সৌদি যাওয়ার জন্য একবার এক দালালকে ত্রিশ হাজার টাকাও দেন ওই নারী ও তার বাবা। তবে দালাল তাদের টাকা আত্মসাৎ করে। এরপর কাউকে কিছু না জানিয়ে কয়েকমাস আগে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান ওই নারী। তার ৪ বছরের একটি পুত্র সন্তান আছে। সে বর্তমানে চাঁদপুরে তার দাদা-দাদির কাছে রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে ওই নারীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়, হৃদয় তাকে ভালো বেতনে চাকরিসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পাচার করে। এরপর সেখানে যৌন ব্যবসা করতে বাধ্য করা হয়।
রাজধানীর মগবাজার ও হাতিরঝিল এলাকায় টিকটক হৃদয়কে সবাই বখাটে হিসেবে চেনে। সে গ্রুপ নিয়ে হাতিরঝিল এলাকায় টিকটক করে বেড়াতো। কোনো কাজ করতো না, সারাদিন বন্ধুদের নিয়ে টিকটক ভিডিও তৈরি করতো। কোনো কাজ না করার কারণে তার মা তাকে চার মাস আগে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ধারণা করা হচ্ছে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কিছুদিন পরই হৃদয় ভারতে চলে যায়। দেশে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে রমনা থানায় ডাকাতি প্রস্তুতি মামলা হয়েছিল।
যৌন নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর হৃদয়ের খোঁজে পুলিশ তাদের বাসায় যায়। এরপর হৃদয়কে তারা ভিডিও দেখে শনাক্ত করে।
বুধবার রাতে হাতিরঝিল থানা পুলিশ হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালায়। তখন তার জেএসসির এডমিট কার্ড, রেজিস্টেশন কার্ড ও একটি জাতীয় পরিচয় পত্র জব্দ করে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তার বাবা মা, মামা ও চাচাদের। রাতে তাদের অনেককেই থানায় নিয়ে আসা হয়।
মামা ফরহাদ হোসেনের মোবাইল দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে ছদ্মবেশে বুধবার রাতে যোগাযোগ করে পুলিশ। পুলিশ তাকে যৌন নির্যাতনের ভিডিও সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, হৃদয় জানায় ঘটনাটি ১৫/১৬ দিন আগের। তারা ভারতের পুনেতে রয়েছে।
এরপর বাংলাদেশের পুলিশ ভারতের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ভারতের পুলিশ অভিযান শুরু করে। বৃহস্পতিবার হৃদয়সহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে ভারতের বেঙ্গালুরুর পুলিশ।
এদিকে, শুক্রবার ভারতে যৌন নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি সেই তরুণীকে উদ্ধার করেছে ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ভারতে এক বাংলাদেশি তরুণীকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরালের ঘটনা তদন্তে নেমে আন্তর্জাতিক নারীপাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ভারতে এ চক্রটির মূল আস্তানা ব্যাঙ্গালুরুর আনন্দপুর এলাকায়। মূলত দেহ ব্যবসায় বাধ্য করতেই বিভিন্ন বয়সী তরুণীদের ভারতে পাচার করা হয়। তারা সেখানকার স্থানীয় কিছু হোটেলের সাথে চুক্তিতে টাকার বিনিময়ে নারী সরবরাহ করে।
তিনি বলেন, পাচার হওয়া তরুণীদের দেহ ব্যবসায় বাধ্য করতে তাদের নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে বিবস্ত্র করে ছবি-ভিডিও করা হয় কিংবা নির্যাতন করা হয়। তাদের কথামতো অনৈতিক কাজ করতে রাজি না হলে সেসব ছবি-ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। তাদের হাতে রাখতে এবং বাধ্যতামূলকভাবে অনৈতিক কাজ করতে এটা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কৌশল।
ডিসি শহিদুল্লাহ বলেন, ভিডিও ভাইরালের পর ভারতেও বিষয়টি আলোচিত হয়। পরে ভারতীয় পুলিশ দ্রুত তাদের গ্রেফতার করে। ভুক্তভোগী তরুণীকে উদ্ধারসহ মূল অভিযুক্ত টিকটক হৃদয় এবং আরও চারজনকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া গেছে। যারা প্রত্যেকেই অবৈধভাবে ভারতে গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের কাছে ভিসা-পাসপোর্ট কিছুই ছিল না।
তিনি আরও বলেন, টিকটকের একটি গ্রুপের অ্যাডমিনের তত্ত্বাবধানে গত বছরের শেষ দিকে ঢাকার পাশের একটি জেলায় পুলপার্টির আয়োজন করা হয়। ওই পার্টিতে প্রায় ৭০০-৮০০ তরুণ-তরুণী অংশ নেন। এই গ্রুপ থেকেই নারীদের টার্গেট করে বিভিন্ন মার্কেট, সুপারশপ, বিউটি পার্লারে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভনে পাচার করা হয়।
ভারতের ওই তরুণীকে নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে এ চক্রের মাধ্যমে আরও অনেক তরুণী পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর সঠিক সংখ্যা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পাচার হওয়া তরুণীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এমন আরও গ্রুপ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।