জলজটে নাকাল রাজধানীবাসী

এইমাত্র জাতীয় রাজধানী

৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা

 

বিশেষ প্রতিবেদক : সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তা। এতে করে যান চলাচলে সৃষ্টি হয়েছে ধীর গতি। বিপাকে পড়েছে অফিসগামী নাগরিক।
মঙ্গলবার সকালে নগরীর ধানমন্ডি, আজিমপুর, মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার, বাড্ডা ও বারিধারার মতো বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতার কারণে নাগরিকদের ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সামনে, মালিবাগ, মৌচাক, মতিঝিল, গুলিস্তান, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, রামপুরা, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
এসব এলাকা হয়ে যারা অফিস বা কাজে যোগ দিতে বের হয়েছেন তাদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। অনেক কর্মজীবী মানুষকে পানির মধ্যে প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। আবার অনেক মানুষকে পানি ডিঙিয়ে অফিসে পথে যাত্রা করতে দেখা গেছে। পরিবহনের জন্য মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে অনেককে।
প্রতি বছরই জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় রাজধানীবাসীকে। কিন্তু কার্যত কোনও পদক্ষেপ নেই দুই সিটি করপোরেশনের। অথচ এই খাতে বছরে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে সংস্থা দুটি। বৃষ্টি হলেই নগরীর অলিগলি ও ছোট পরিসরের রাস্তাগুলোতেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন পথগুলো আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকায় দ্রুত পানি নামতে পারছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
সকালে রাজারবাগ, খিলগাঁও রেলগেট, মালিবাগ রেলগেট ও মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকায় অফিসগামী মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু তারা পর্যাপ্ত গণপরিবহনও পাচ্ছেন না। ফলে প্রতিটি সিটে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি দাঁড়িয়েও যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে।
বাড্ডার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষার শুরু হলে দুই মেয়র ও মন্ত্রীদের আশ্বাস পেয়ে থাকি। কিন্তু কখনও জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান হয় না; বরং দিন দিন নদী থেকে সাগরে পরিণত হচ্ছে রাজধানী।’
নাসির উদ্দিন নামে একজন এনজিওকর্মী বলেন, ‘সকাল ৯টায় খিলক্ষেত থেকে বের হয়েছি। ধানমন্ডি ৭/এ-তে আসতে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় লেগে গেছে। রাস্তায় পানি, যানজট।’
কলাবাগান এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন শাহরিমা লিজা। তিনি ভোগান্তির বিষয়ে বলেন, মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে বৃষ্টির মধ্যেই বের হই। বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা না পেয়ে কিছু পথ হেঁটে বাসে উঠলাম। বাস নামিয়ে দিলো আড়ংয়ের সামনে। এরপর সাতাইশ নাম্বারের বিশাল জলরাশি পেরিয়ে রিকশা করে অফিসে পৌঁছেছি। তুমুল বৃষ্টির কারণে পুরো ভিজে গেছিলাম এখন আধ ভেজা হয়ে অফিস করছি।
ফার্মগেটে শোভন নামে এক পথচারী বলেন, প্রতিবছরই বৃষ্টি হলে রাজধানীতে এমন জলাবদ্ধতা হয়। সাধারণ মানুষ পড়ে ভোগান্তিতে। কিন্তু এই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। যার মাশুল দিতে হয় আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের। যারা আজ কাজে বের হয়েছেন তাদের প্রত্যেকে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এদিকে ধানমন্ডির অপেক্ষাকৃত কিছু নিছু এলাকায় রাস্তার পানি বাসা বাড়িতেও প্রবেশ করেছে। নিচ তলার মানুষজন এতে পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। ধানমন্ডি স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার বাড়ির মালিক জামাল উদ্দীন বলেন, সকালের বৃষ্টিতে বাসার নিচ তলায় পানি ঢুকে গিয়েছিলো। সেগুলো এখনো নানাভাবে ছেকে বের করার চেষ্টা করছি। একটু বৃষ্টি হলেই আমাদের এতটা ভোগান্তিতে পড়তে হয় যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এসব দেখার কেউ নাই, না কী?
৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা : কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে জলজট আর যানজটে নাকাল রাজধানীবাসী। বিভিন্ন সড়কে হাঁটুপানি ওঠায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যানবাহন না পেয়ে নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে ছুটতে দেখা গেছে অফিসগামী মানুষকে।
আবহাওয়া অফিস জানায়, ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকায় ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে জলাবদ্ধতার জন্য খাল দখল হয়ে যাওয়াকেই দুষলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র।
মাত্র ঘণ্টা তিনেকের বৃষ্টি। আর তাতেই অলি-গলি তো বটেই, রাজধানীর রাজপথও পানিতে তলিয়ে গেছে।
মঙ্গলবার ভোর থেকে শুরু হওয়া মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতে যারাই ঘর থেকে বের হয়েছেন তাদেরকেই পড়তে হয়েছে বিপাকে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে অফিসগামী মানুষ। পাড়া-মহল্লার ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে প্রধান সড়কে পৌঁছেও যানবাহনের সংকটে গন্তব্যে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। কেউ কাকভেজা হয়ে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে ছুটেছেন।
সড়কে সড়কে চোখে পড়ে আটকে থাকা বিভিন্ন যানবাহন। পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে বিপাকে পড়েন চালক ও যাত্রীরা। সেই সঙ্গে অদেখা খানা-খন্দের ঝক্কি বাড়িয়েছে ভোগান্তি। এই জলজটের কারণে রাজধানীজুড়েই যানজটে অসহনীয় পরিস্থিতি।
এক বাবা বলেন, আমার অসুস্থ ছেলে ডেল্টা হাসপাতালে ভর্তি। তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে রক্ত প্রয়োজন। সেজন্য হাঁটুপানি মাড়িয়ে যেতে হচ্ছে শান্তিনগরে। এখন যে অবস্থা তাতে চলার মতো না। ঢাকায় দুই দুটি সিটি করপোরেশন রয়েছে তারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, লঘুচাপের প্রভাবে এই বৃষ্টি সন্ধ্যা পর্যন্ত হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন বলেন, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের অনেক জায়গা মাঝারি থেকে বড় ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি হতে পারে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, আমাদেরকে বুঝতে হবে পানি কই যায়। পানিটা যেতে হবে রিটেনশন পয়েন্টে। আপনারা দেখেছেন কল্যাণপুর ক, খ, গ, ঘ, ঙ চ সহ ছয়টি রিটেনশন পয়েন্টের ডাউন স্টিটেমেন্ট পানি আসছে না। কেননা আপার স্টিটে খালগুলো দখল হয়ে গেছে।
আসন্ন বর্ষায় আরও খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কায় এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ নগরবাসীর
অপরদিকে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর ৬টার আগে ২৪ ঘণ্টার ঢাকায় ২১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরের জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, ঢাকা, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের উপর দিয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহবৃষ্টি এবং সেইসঙ্গে অস্থায়ীভাবে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।