সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পদোন্নতির সুবাতাস

শিক্ষাঙ্গন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো দেশের শিক্ষাদানে সুনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। গণ্যমান্য অনেক ব্যক্তির হাতেখড়ি এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে। পাশাপাশি শিক্ষাদানে শিক্ষকদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই বলে উচ্চ প্রশংসাও করে শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষকদের সাথে কথোপকথনে জানা যায়, শিক্ষকতা পেশাকে তারা মহান ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। তবে অন্যান্য পেশার মতো তাদের জন্য একটি পদসোপান রাখা হলে কাজে আনন্দ পেতেন। তারা অনুযোগ করেন, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ও দীর্ঘদিন যাবত চাকুরি করা একজন শিক্ষকের সাথে পদমর্যাদায় এখানে কোনো পার্থক্য নেই। কেননা দুইজনই সহকারী শিক্ষক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক শিক্ষক দাবি করেন, সরকারি মাধ্যমিক স্তরে পদোন্নতির হার অতীতে খুব কম ছিল। তবে বর্তমান সরকারের আমলে ২০১৫ সালে সিনিয়র শিক্ষক পদ তৈরি হলে ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষকের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হয়। তবে ১৯৯৫ সালে চৌদ্দ গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত কৃষি বিষয়ের শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ২০০৪ সালে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হলে তারা যোগদান থেকে সিনিয়রিটি দাবি করে। এই প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার তারিখ ধরে সিনিয়রিটি নির্ধারণ করলে উক্ত পরিপত্রকে চ্যালেঞ্জ করে কৃষি শিক্ষকরা প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে একটি মামলা করে। মামলাটি প্রায় দুই বছর চলার পর নিষ্পত্তি হয়। এতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। দীর্ঘদিন স্থবির সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির কার্যক্রম গত বছরের নভেম্বরে পুনরায় শুরু হলে গ্রেডেশন তালিকায় সিনিয়রিটি গণনা নিয়ে কর্মরত শিক্ষকেরা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পর্যায়ক্রমে সময়ে সময়ে শো ডাউন পাল্টা শো ডাউন করে বিভক্ত দুটি গ্রুপ। একজন শিক্ষক বলেন, দুই গ্রুপের পরস্পর অনাস্থার কারণে কর্মকর্তারা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। তারা বলেন, কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। শিক্ষকদের দাবি, সুনির্দিষ্ট পদোন্নতি নীতিমালা থাকার পরও সেগুলো অনুসরণ না করায় জটিলতা বেড়েই চলেছে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি গ্রুপ শর্ত মোতাবেক সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের পাঁচ বছরের মধ্যে পেশাগত বিএড ডিগ্রি অর্জনের শর্ত পালন করেছে। তারা সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভের পাঁচ বছরের মধ্যে বিএড না করা শিক্ষকদের নাম পদোন্নতি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করে আসছে।অপরদিকে শর্ত ভঙ্গকারী শিক্ষকদের দাবি, সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতির জন্য আট বছরের চাকুরির অভিজ্ঞতা ও বিএড ডিগ্রি থাকলেই চলবে। এতে নিয়োগ শর্ত মানা না মানা কোনো বিষয় নয়।
একজন শর্ত পালনকারী শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা পদোন্নতির শৃঙ্খলা চায়। যারা সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী পাঁচ বছরের মধ্যে পেশাগত বিএড ডিগ্রি অর্জন করে নাই তাদের চাকুরিকাল সন্তোষজনক হতে পারে না। সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকুরিকাল সন্তোষজনক না হলে সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতি অস্বাভাবিক। তার মতে, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সদ্য এমপিও নীতিমালাতেও নিয়োগের পাঁচ বছরের মধ্যে বিএড করলে ১০ম গ্রেডে বেতনভাতাদি পাবে উল্লেখ রয়েছে।
সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি ক্রমাগত বাড়ছে। একপক্ষ অপর পক্ষকে দোষারোপ করলেও উভয় পক্ষ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি প্রত্যাশা করে। গত কয়েক মাস ধরে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি সবদিক বিবেচনা করে সম্প্রতি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড পদ থেকে প্রথম শ্রেণির পদে পদোন্নতির জন্য পিএসসি’র সুপারিশ প্রয়োজন হয়। সে অনুযায়ী পদোন্নতির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কর্ম কমিশন সচিবালয়ের পাঠানো হয়েছে। পিএসসিতে যোগাযোগ করে জানা যায়, সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতির নেতৃত্ব একটি প্রতিনিধি দল তাদের সাথে যোগাযোগ করে সহযোগিতার আশ্বাস চেয়েছে। তবে শর্ত পালনকারী শিক্ষকদের দাবি, সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক সহ কয়েকজন শিক্ষক প্রতিনিধি শর্ত ভঙ্গকারী শিক্ষকদের পক্ষ নেয়ার কারণে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায় বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শর্ত পালনকারী শিক্ষকদের আশংকা ওয়েবসাইটে প্রদর্শন করা গ্রেডেশন তালিকায় ‘যোগদানের পাঁচ বছর পর বিএড করেছে’ উল্লেখ করা মন্তব্য কলামটি পিএসসিতে পাঠানো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করায় বিষয়টি আইনী জটিলতায় পড়তে পারে। তারা পিএসসি’র দৃষ্টি আকর্ষন করে এই বিষয়ে কমিশনের চেকলিস্ট অনুযায়ী মন্তব্য কলামে খসড়া তালিকায় উল্লেখিত তথ্যটি অন্তর্ভুক্ত পূর্বক স্বচ্ছ গ্রেডেশন তালিকার উপর ন্যায্য সুপারিশ প্রত্যাশা করে। তারা আরো বলেন, ২০১৩ সালে সহকারী শিক্ষক পদে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে গেজেট প্রকাশিত হয় সেখানে ৩১৭জন শিক্ষক গেজেটভুক্ত হয়নি। তাদের বেশ কয়েকজনের নাম পদোন্নতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে সাধারণ শিক্ষকরা জানিয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত না হয়ে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ থাকা নিয়েও অনেকে সন্দিহান।
তবে কালক্ষেপণের কারণে দীর্ঘদিন চাকুরি করে বিনা পদোন্নতিতে পিআরএলে যাওয়া শিক্ষকদের দীর্ঘশ্বাস এই দপ্তরে কর্মরতদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত একটি ন্যায্য পদোন্নতির জন্য দাবি জানিয়ে আসছে। সর্বশেষ জানা যায়, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সেক্টরে একটি বড় ধরনের পদোন্নতি হবে। এই পদোন্নতির মাধ্যমে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পদোন্নতির সুবাতাস বইতে শুরু করবে বলে সকলের প্রত্যাশা। অনেকে এই পদোন্নতিকে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারের অনেক বড় উপহার হিসেবেও আখ্যায়িত করেছে।