দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার মহাসচিবের বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ

অপরাধ

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় অন্ধ সংস্থার মহাসচিব আইয়ূব আলী হাওলাদারের বিরুদ্ধে মার্কেটের দোকান ভাড়া ও অন্ধদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তার এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জাতীয় অন্ধ সংস্থার সাবেক নেতা-কর্মীরা গত ৪ এপিল লিখিত অভিযোগ করেছেন।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় অন্ধ সংস্থার নাম পরিবর্তন করে এখন জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থা নামে রাজধানীর ৬ নম্বর ওরফানেজ রোর্ডস্থ (বকশী বাজার) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। আর ৯ কাঠা জায়গার মধ্যে সংস্থার কেন্দ্রীয় এই কার্যালয়ের ভেতরে পাউরুটি ও বিস্কুট তৈরীর কারখানা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানে নোংড়া ও অপরিচ্ছন্ন জায়গায় এবং নকল খাবার পণ্য তৈরী করা হচ্ছে। আর এসব খাদ্য সামগ্রী নামীদামী বিভিন্ন কোম্পানীর নামে লেভেল ছাপিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কোম্পানীর কোন প্রকার অনুমোদন নেই বলে অভিযোগে জানা গেছে।
জানা গেছে, জাতীয় অন্ধ সংস্থার নামে দেশের সাধারণ মানুষের সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে গত ১৯৭৮ সালে ঢাকা জেলার সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ৫ বিঘা জমি ক্রয় করা হয়। উক্ত জমির উপর ২টি তিন তলা পাকা মার্কেট স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত মার্কেটের দোকানের ভাড়ার টাকা অন্ধদের কল্যাণে ব্যয় করার কথা থাকলেও এখন আর তা অন্ধদের কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে না। বর্তমান অন্ধ সংস্থার মহাসচিব আইয়ুব আলী হাওলাদার তার সাথে কিছু ভাড়াটে সন্ত্রাসীচক্রের সহযোগিতায় উক্ত মার্কেট ২টি দখল করেছেন। গত ২০১৫ সালের উক্ত মার্কেটটিকে ডেভেলপার কোম্পানির সাথে বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে রেজিস্ট্রি করে চুক্তি করা হয়েছে। আর উক্ত রেজিস্ট্রেশনের বিরুদ্ধে তৎকালীন চেয়ারম্যান মিনহাজউদ্দিন উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। এরপর হাইকোর্ট ডিভিশন সন্তুষ্ট হয়ে উক্ত জমির উপর স্থিতি আদেশ জারী করেন। যার রিট নং-২২৬৮/২০১৬।
সূত্র জানায়, উক্ত জমির উপর উচ্চ আদালতের স্থিতি আদেশ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান মহাসচিব আইয়ুব আলী হাওলাদার ও তার সন্ত্রাসীচক্র সাভারের মার্কেটে দোকান নির্মাণ করেছেন। আর সেখানে নির্মিত দোকানগুলো থেকে দুইশতাধিক দোকান অবৈধভাবে বিক্রি করছেন। যার প্রতিটি দোকানের মূল্য ১৬ লাখ হতে ২০ লাখ টাকা। অর্থ এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোন হিসাব নেই। আর এসব আত্মসাতকৃত টাকা দিয়ে আইয়ূব আলী হাওলাদার তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল বাকেরগঞ্জ তিনতলা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া, রাজধানী ঢাকায় ফ্ল্যাট, সাভারে জামি ক্রয় করেছে। আর তিনি একাধিক গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছেন।
দুদকে দায়েরকৃত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আইয়ূব আলী ভুইয়া সরকারি বরাদ্দকৃত জায়গাটি অন্ধদের হাতছাড়া করতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সংস্থার নামটি পরিবর্তন করা হয়েছে। তারা সংস্থার নাম পরিবর্তন করে ‘জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থা’ নামকরণ করেছেন। আর সংস্থার গঠনতন্ত্রকে ব্যক্তি কেন্দ্রিক সংশোধন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাতীয় অন্ধ সংস্থার প্রধান কার্যালয়টি সরকার অন্ধদের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে অন্ধদের জন্য কোন প্রকল্পের কর্মসূচী নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু আইয়ুব আলী হাওলাদারের নিকট আত্মীয়-স্বজন সেখানে বসবাস করছেন। এছাড়া মোটা অংকের টাকা অগ্রিম নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে একটি রুটি-বিস্কুট ফ্যাক্টরি কোম্পানীকে ভাড়া দিয়েছেন। এ সব বিষয়ে সাধারণ অন্ধ সদস্যরা প্রতিবাদ করায় তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধমকি দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগে আরো জানান গেছে, বর্তমান জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থার মহাসচিব আইয়ুব আলী হাওয়াদার ও তার সন্ত্রাসীচক্র সাভারস্থ মার্কেটে দোকান বিক্রি, দোকান ভাড়া, প্রধান কার্যালয়ে রুটি-বিস্কুট ফ্যাক্টরী ভাড়া ছাড়াও দেশের বৃত্তবানদের সাহায্য-সহযোগিতার অর্থসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকা গত ৩ বছরে আত্মসাৎ করেছেন।
আর এই সব আত্মসাতকৃত অর্থ দিয়ে আইয়ুব আলী হাওলাদার এবং তার সন্ত্রাসীচক্র সাভারে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ক্রয় করেছেন বলে দুদকের অভিযোগে জানা গেছে। তাছাড়া, আইয়ুব আলী হাওলাদার রাজধানী ঢাকা শহরে একাধিক ফ্ল্যাট ও ২টি বিলাসবহুল গাড়ী ক্রয় করেছে। আর তার ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে, যা তদন্ত করলে সত্যতা পাওয়া যাবে।
জাতীয় অন্ধ সংস্থার সদস্য মাহফুজুর রহমান জানান, অন্ধ সংস্থার সাবেক মহাসচিব খলিলুর রহমান হত্যা মামলার সুস্থ তদন্ত করা হলে এই আইয়ূব আলীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে। উক্ত মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে বিচারাধীন ছিল। কিন্তু এই আইয়ূব আলী হাওলাদার গংরা সেই মামলাটি এলোমেলো করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান মহাসচিব দুর্নীতি লুটপাটে ব্যস্ত রয়েছে। অন্ধদের কল্যাণে কোন প্রকার কাজ করা হচ্ছে না। কাউকে কোন প্রকার সহযোগিতাও করছে না। সরকারী বেসরকারি যে সব অনুদান দেওয়া হচ্ছে। তার সব কিছুই আইয়ূব আলী ও তার লোকজন ভাগ বাটোয়ারা করে খাচ্ছে।
এছাড়া জাহাঙ্গীর হোসেন নামের অপর এক সদস্য জানান, জাতীয় অন্ধ সংস্থার কোটি কোটি টাকার সকল সম্পত্তি লুটপাট করা হচ্ছে। আর এসব সম্পত্তি আইয়ূব আলীর নেতৃত্বে তার সাঙ্গপাঙ্গরা খাচ্ছে। সাভারের ৫ বিঘা সম্পত্তির উপর তিন তলা মার্কেট রয়েছে। উক্ত মার্কেটের অতিরিক্ত দোকান নির্মাণ করে বিক্রি করছে। আর মার্কেটের দোকানগুলোর ভাড়ার টাকা আত্মসাৎ খাওয়া হচ্ছে। এছাড়া রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ৪২ কাঠা জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল। উক্ত সম্পত্তি অবৈধ কমিটি গঠণ করে তার বিক্রি করা হয়েছে। আর এসব সম্পত্তি আত্মসাৎ করে তার গ্রামের বাড়িতে তিনতলা বাড়ি ছাড়াও ঢাকা ও সাভারে জায়গা জমি, ফ্ল্যাট ও দু’টি গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে আইয়ুব আলী হাওলাদার ও তার সন্ত্রাসীচক্র মার্কেট এর টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। আর এই মতবিরোধকে কেন্দ্র করে সেখানে একটি হত্যাকা- সংগঠিত হয়। উক্ত সন্ত্রাসীরা হত্যাকা-ের আসামীরা উচ্চ থেকে ৪ সপ্তাহের আগাম জামিন নেয়। কিন্তু নিম্ন আদালতে হাজির না হয়ে এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আইয়ুব আলী হাওলাদার বলেন একটি গ্রুপ তার বিরুদ্ধে উঠে পরে লেগেছে। এবিষয় মঙ্গলবার সকালে তার কার্যালয়ে গিয়ে অনেক সময় অপেক্ষার পরও তার সাক্ষাত পাওয়া যায়নি। পরে তার অফিসের অফিস সহকারি মাসুম বলেন, স্যার আসবেন। কিন্তু অপেক্ষার পরও তিনি আর তার কার্যালয়ে আসেননি।