দেশে ফ্রিল্যান্সার কত সঠিক হিসাব নেই

জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে কী পরিমাণ জনশক্তি জড়িত আছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারও কাছে। তবে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অন্তত ৬ লাখ লোক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে জড়িত আছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) ২০২০ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে অনলাইন লেবার সাপ্লাই কমেছে। আইএলও তাদের প্রতিবেদনে শতাংশ হারে উল্লেখ করলেও প্রকৃত সংখ্যা কারও কাছে পাওয়া যায়নি।
আইএলও’র প্রতিবেদনে প্রথমেই আছে ভারত, অর্থাৎ মোট অনলাইন লেবার সাপ্লাইয়ের প্রায় ৩৩ শতাংশ ভারতের, ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৬ শতাংশ। এরপর বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আছে প্রায় ১৩ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল ২০ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশের পরই অবস্থান পাকিস্তানের অবস্থান, তবে ব্যবধান খুবই সামান্য। এরপর আছে যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপিন্স, যুক্তরাজ্য এবং ইউক্রেইন। আইএলও’র প্রতিবেদন বলছে, ফ্রিল্যান্সারদের চাহিদার দিক থেকে প্রথমেই আছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে ২০১৮ সালের তুলনায় এই চাহিদা প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা কমলেও অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ভারত এবং যুক্তরাজ্যে চাহিদা কিছুটা বেড়েছে বলে জানায় আইএলও। ফ্রিল্যান্সেরদের চাহিদার তালিকার প্রথম দিকে আরও আছে সিঙ্গাপুর এবং ইসরায়েল।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অনলাইন লেবার ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারত লেবাররা ৫৮ শতাংশই সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং প্রযুক্তিগত কাজ করে অনলাইনে। সেখানে বাংলাদেশের মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ করে এই সেক্টরে। অনলাইন লেবার ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান প্রথম এবং বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
সরকারের আইসিটি বিভাগ বলছে, দেশে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ, যারা অন্তত ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে। তবে এর মধ্যে ফুলটাইম ফ্রিল্যান্সার দেড়-দুই লাখ হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বিএফডিএস)। এই ফুলটাইম ফ্রিল্যান্সারদের সঙ্গে যারা ছোট ছোট দলে কাজ করেন, তারাসহ মোট সাড়ে ৩ লাখের মতো ফ্রিল্যান্সার আছেন। ঝরে পড়া ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা মিলিয়ে ছয় লাখের মতো হতে পারে বলে ধারণা বিএফডিএস’র।
ফ্রিল্যান্সারদের যে পরিসংখ্যান আছে, সেটা পুরোটাই অনুমাননির্ভর বলে জানা গেছে। ২০১৭ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটা স্টাডির তথ্যমতে, সাড়ে ৬ লাখের মতো ফ্রিল্যান্সার বাংলাদেশে কাজ করেন।
বিএফডিএস’র জেনারেল সেক্রেটারি মাহফুজ রহমান বলেন, ‘আমাদের ধারণা অনুযায়ী, ফুল টাইম ক্যারিয়ার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং করে দেড় থেকে ২ লাখ। এদের সঙ্গে অনেকেই ছোট ছোট টিমে কাজ করছেন, তাই সবমিলিয়ে সাড়ে ৩ লাখের মতো হবে বলে আমাদের ধারণা। আবার সিজনাল ফ্রিল্যান্সার আছে অনেকে, হয়তো তারা শুরু করেছে, কিছু টাকা আয় করেছে। আবার অন্য কোথাও চাকরি পেয়েছে এবং তারা চলে গেছে। সেগুলো মিলিয়ে আমাদের ধারণা মোট ফ্রিল্যান্সার ৬ লাখের মতো হবে।
ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আয়ের একটা বড় অংশ আসে পে-অনইয়ার অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে। আর তাদের পেমেন্ট বাংলাদেশে প্রসেস করে ব্যাংক এশিয়া। শতভাগ পেমেন্ট পে-অনইয়ারে না আসলেও সিংহভাগই আসে এই গেটওয়ের মাধ্যমে। ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাংক এশিয়া ওই বছরে ১৯৪ মিলিয়ন ডলার ছাড় দিয়েছে পে-অনইয়ারের মাধ্যমে আসা অর্থ। তবে ফ্রিল্যান্সারদের কাজের পরিধি যখন বেড়ে যায়, অনেকজন মিলে যখন কাজগুলো করেন, তাদের একটা বড় অংশই দেশে টাকা নিয়ে আসে না। ফলে সেই আয়ের কোনও হিসাব নেই। আর যাদের জন্য ফ্রিল্যান্সাররা কাজ করেন, তারা সবাই বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি।
ফ্রিনল্যান্সাররা জানান, আয়ের টাকা থেকে অনলাইনের টুলস কিনতে হয়। দেশে ইন্টারন্যশনাল ক্রেডিট কার্ডে একবারে (ওয়ানটাইম) সর্বোচ্চ পেমেন্ট করা যায় ৩০০ ডলার। কিন্তু সেগুলো কিনতে তাদের বেশি অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই অনেক টাকাই ফ্রিল্যান্সাররা অনলাইনে রেখে দেন। সব মিলিয়ে ধারণা করা হয়, প্রতি বছর ফ্রিল্যান্সারদের আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
এই প্রসঙ্গে বিএফডিএস’র জেনারেল সেক্রেটারি মাহফুজ রহমান বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের একটা অংশ পুনরায় তাদের বিনিয়োগ করা লাগে। একবার যখন ডলার বাংলাদেশে চলে আসে, তখন সেটা আবারও ইউএস ডলারে কনভার্ট করে চালাতে গেলে বিনিময় হারের কারণে কিছু টাকা নষ্ট হয়। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডে ৩০০ ডলারের বেশি পেমেন্ট করা যায় না। ফ্রিল্যান্সারদের অনেক টুলস আছে, যেগুলোর দামই শুরু হয় ৪০০ ডলার থেকে। সার্ভারের বিল দেওয়া লাগে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ডলার। সেক্ষেত্রে কার্ডে পেমেন্ট করা যায় না। এই কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে আয়ের একটা অংশ বাইরে রেখে দেন, যাতে পুনরায় সেটা কাজে লাগাতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছু সার্ভিস আছে ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার দেখা যাচ্ছে, সরাসরি ফোরেক্স ট্রেডিং না হলেও কোনও না কোনোভাবে সেটার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ হচ্ছে। যেখানে সেবা দিচ্ছি সেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সির যোগসূত্র আছে। অর্থাৎ যাদের কাজ তারা ক্রিপ্টোকারেন্সিতেই পেমেন্ট দেবে। আমাদের দেশের আইনে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন বৈধ না। অনেকে আবার তাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না— এসব সোর্স থেকে আয়ের টাকা নিয়ে আসতে। এই ভয় কাজ করে যে, আইনি সমস্যায় পড়বেন কিনা। সে কারণেও অনেকে টাকা বাংলাদেশ পর্যন্ত নিয়ে আসেন না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি ছিল ফ্রিল্যান্সারদের জন্য নগদ ভর্তুকি দেওয়া হোক। তাহলে আশা করা যায়, অনেকেই দেশের ভেতরে টাকা আনার জন্য উদ্বুদ্ধ হবেন। এছাড়া যেসব সমস্যার কারণে টাকাগুলো দেশে নিয়ে আসতে পারেন না, সে সমস্যার বাস্তব সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি আমরা।’
তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি মূল ইস্যু না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক ধরণের বিল পে, টুলস কেনার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হয়, সেটার সমাধান করতেই অনেকে দেশে টাকা আনেন না।’ যাদের কাজের পরিমাণ বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি বলে মনে করেন তিনি।
মাহফুজ রহমান বলেন, ‘আমরা আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে সবাইকেই বলেছি যে, ফ্রিল্যান্সাররা যেন প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার খরচ করতে পারেন।তবে সেটার জন্য একটা কাজ এগিয়ে এসেছে। এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) অ্যাকাউন্ট তৈরির কাজ চলছে। এটা চালু হলে ১০০ ডলার আয়ের ৭০ শতাংশ আবার ডলার হিসেবেই খরচ করা যাবে। অ্যাকাউন্ট হবে বাংলাদেশি ব্যাংকেই। একটি ডলার অ্যাকাউন্ট হবে, আরেকটি টাকার অ্যাকাউন্ট হবে। এই অ্যাকাউন্টের সুবিধা এতদিন পর্যন্ত যারা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সদস্য ছিলেন, কিংবা প্রাইভেট কোম্পানি ছিল, তাদের ছিল। কিন্তু দেখা গেছে, ইন্ডিভিজুয়াল ফ্রিল্যান্সারের জন্য কিংবা কম আয়ের ফ্রিল্যান্সারের জন্য লিমিটেড কোম্পানি করা অসাধ্য বিষয়। সরকারের সহায়তায় যারা ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড হোল্ডার, তাদের জন্য আমরা এই অ্যাকাউন্ট সহজলভ্য করার কাজ শুরু করেছি। ব্র্যাক ব্যাংক পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে কয়েকজন ফ্রি ল্যান্সারকে নিয়ে শুরু করেছে। আশা করছি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তারা পুরোদমে চালু করতে পারবে।’