ঢামেকে দালাল-প্রতারক পতিতাদের আনাগোনা

অপরাধ এইমাত্র

র‌্যাবের অভিযানে ২৪ দালাল আটক

বিশেষ প্রতিবেদক : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালাল প্রতারকচক্রের তৎপরতা ছাড়াও ভাসমান পতিতাদের আনাগোনা থামছেই না। আবার হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ফাঁকা রুমে জুয়া খেলা ও মাদকের আসর বসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার হাসপাতাল প্রশাসন একশ্রেণীর ঠিকাদারদের কাছে নাজেহাল হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
ঢামেক এর কর্মচারী নেতাদের সহযোগিতায় ওষুধ, খাবার ও যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনাও ঘটছে। আর এসব অবৈধ কর্মকান্ডের সঙ্গে হাসপাতালে দায়িত্বরত আনসারের প্লাটন কমান্ডার জড়িত বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। তবে গতকাল র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ২৪জন দালাল চক্রের সদস্যদের আটকের পর ভ্রাম্যমান আদালত তাদেরকে সাজা প্রদান করেছেন।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা জানান, কিছু কর্মচারী হাসপাতালের ভেতরে আগে জুয়ার আসর বসাতো। এ বিষয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসার পর তা গত ৩/৪ মাস আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অপরাধমূলক কর্মকান্ড বন্ধের জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে বিভিন্ন জায়গায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সি সি টিভি) স্থাপন করলেও তা কাজে আসছে না। বিভিন্ন ওয়ার্ডের পাশের খালী রুম ও ওয়ার্ড মাস্টারদের রুমে জুয়া খেলা ও মাদক সেবনসহ অসামাজিক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে।
জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালের তৃতীয় তলার ইএনটি ওটির পাশের রুম, ডেন্টাল ওয়ার্ড, চতুর্থ তলার ছাদ, আইসিইউ এর পাশের একটি রুম, পোস্ট অপারেটিভের পাশের ওয়ার্ডের রুম, ২জন সর্দারের স্টোর রুম, ক্যাজিওলিটি ওয়ার্ডের সর্দারের রুম, পুরাতন ডক্টর ক্যাফিটোরিয়া ও আউটডোরের সর্দারের রুমসহ বিভিন্ন জায়গায় মদ, জুয়াসহ অসামাজিক কাজকর্ম চালানো হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে ভোর রাত পর্যন্ত হাসপাতালের প্রভাবশালী কর্মচারী বহিরাগত লোকজন নিয়ে জুয়া ও মদের আসর বসিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, ভাসমান পতিতাদের নিয়ে সেখানে আমোদ-ফুর্তি করার অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ পাওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে হাসপাতালের রুগীরা এদের কাছে মাঝে মধ্যে নানা ধরণের হয়রানীর শিকার হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২১১ নম্বর ওয়ার্ডের শফিকুল ইসলাম শফিক, ইদ্রিস, রাজিব, ২১২ নম্বর ওয়ার্ডের শিপন, কাশেম, হাজেরা, শামছুন্নাহার ও শাহানা যোগসাজসে হাসপাতাল থেকে রোগিদের ভাগিয়ে নিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিকে পাচার করছে। আবার এসব দালালদের মাধ্যমে হাসপাতালের আইসিইউ এর ব্যবসা চালিয়ে আসছে।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দালাল নির্মূলে অভিযান চালিয়ে ২৪ জনকে গ্রেফতার করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়েছেন র‌্যাব-৩-এর ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বৃহস্পতিবার র‌্যাব-৩ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু এ কারাদ- প্রদাণ করেন। ঢামেক হাসপাতালে দালালচক্রের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়েছে। এই দালালরা ঢামেক হাসপাতালে আসা রোগীদের সরকারি হাসপাতালের চেয়েও কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও খ্যাতনামা অধ্যাপকদের দিয়ে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সুব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যেত। এদেরকে হাতেনাতে গ্রেফতারের পর তারা সবাই অভিযোগ স্বীকার করেছেন।
ঢামেক সূত্র জানায়, ঢামেক হাসপাতাল-১, ২ এবং বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটকে ঘিরে সংঘবদ্ধ দালালচক্র গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই দালাল চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ছোট বড় ও নামসর্বস্ব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্ড ঝুঁলিয়ে ঢামেকের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, ওটি, আইসিইউ, ওয়ার্ড ও কেবিনের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নিরীহ, দরিদ্র ও অসহায়দের টার্গেট করে কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচার করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। অনেক সময় জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যায় এসব দালালরা। আবার তারা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরেও রোগীদের টার্গেট করে।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা এ দালালচক্রের পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষক। দালালচক্রের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নিয়ে হাসপাতালে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ করে দেন তারা। তবে অভিযানের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দালালদের সঙ্গে হাসপাতালের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ভ্রাম্যমান আদালত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু জানিয়েছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী পরিচালক ড. আশরাফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। আজকের অভিযানটিও মনিটরিংয়ের একটা অংশ। আমাদের এই মনিটরিং চলমান থাকবে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. আলাউদ্দিন-আল-আজাদ ও ঠিকাদার মিয়া মো. খালেদ রাজুর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার জেরে হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে গত ২৩ মে রুদ্ধদ্বার বৈঠক এরপর তা মিমাংসা করা হয়েছে।