
বিশেষ প্রতিবেদক : দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে আবারও তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। ব্যাংকটির সম্ভাব্য পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নিয়ন্ত্রণ প্রশ্ন এবং অতীতের বিতর্কিত মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’।

সংগঠনটির দাবি, বিতর্কিত গোষ্ঠীর প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, সমগ্র ব্যাংকিং খাতের জন্যও নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
২০১৭ সালের মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক : ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সেই সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অধিগ্রহণ এবং পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তার নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ওই পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ, করপোরেট এক্সপোজার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলেছে।

বেনামি ঋণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ : বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, বেনামি কোম্পানি ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষ বিভিন্ন সময়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আমানতকারীদের উদ্বেগ : সচেতন গ্রাহক ফোরামের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের সম্ভাবনা এবং অতীতের বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়ে নতুন আলোচনা সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ফোরামটির আহ্বায়ক নূর নবী মালিক স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত ও আস্থার প্রতীক।
৭ দফা দাবিতে কঠোর বার্তা : সংগঠনটি স্বাধীন ও যোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন, ২০১৭ সালের মালিকানা পরিবর্তনের পুনর্মূল্যায়ন, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
এছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পুনরায় ব্যাংক পরিচালনায় আসার পথ বন্ধ করার দাবিও জানানো হয়েছে।
এস আলম গ্রুপকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক : গত কয়েক বছরে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ব্যাংকিং খাতে প্রভাব বিস্তার, উচ্চমাত্রার ঋণ গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং ঋণ পুনঃতফসিল নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ বারবার এসব বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অনেক অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মত৷ : অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকি এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা শুধু একটি ব্যাংকের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত, আমানতকারীদের আস্থা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শেষ কথা : ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা, অতীতের বিতর্ক এবং পরিচালনা কাঠামো নিয়ে চলমান আলোচনা আবারও দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনানুগ ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে কেবল আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
