নাগরিক অধিকার সুরক্ষাঃ জনআন্দোলনে রাজনৈতিক দলের দায়বদ্ধতা

Uncategorized জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান  :  বাংলাদেশ বর্তমান সময়ে এক গভীর ও বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে বিগত দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক ব্যাংক ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার তীব্র সংকট—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে তৈরি হয়েছে এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বাস্তবতা। এমন একটি পরিস্থিতিতে সাধারণ পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের নিজেদের বাঁচার দাবি নিয়ে রাজপথে নামা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে এই ধরনের জন-অসন্তোষকে পুঁজি করে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টাও একটি নির্মম বাস্তবতা।


বিজ্ঞাপন

অপরাধবিজ্ঞান (Criminology) এবং সুশাসনের (Governance) তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, একটি সদ্য-স্বৈরাচারমুক্ত সমাজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে যেকোনো জনজোয়ার বা বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ। এই ক্রান্তিকালে ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত—তা অত্যন্ত নিবিড় আলোচনার দাবি রাখে। অতীতের ‘হেলমেট বাহিনী’ কিংবা লাঠিয়াল সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে নৈরাজ্য দমন করতে যাওয়া কেবল আত্মঘাতীই নয়, বরং তা ফ্যাসিবাদেরই ভিন্ন রূপ। এর বিপরীতে, অহিংসা, সেবা এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে কীভাবে রাজনৈতিক কর্মীরা সংকট মোকাবেলা করতে পারেন, তা এখানে তাত্ত্বিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হলো।

অহিংস প্রতিরোধ ও সহমর্মিতার তত্ত্ব (Theory of Non-violent Resistance and Empathy)  : আন্দোলনরত নাগরিকদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর পরিবর্তে তাদের পাশে সহমর্মী হিসেবে দাঁড়ানোই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত। মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার অহিংস আন্দোলনের দর্শন এটাই শেখায় যে, প্রতিপক্ষ বা আন্দোলনকারীকে প্রতিহত করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব ও মানবিক সেবা।

নেতাকর্মীরা যখন রাজপথে দাবি আদায়ে সোচ্চার মানুষের কাছে ফুল, খাবার ও পানীয় জল নিয়ে হাজির হন, তখন আন্দোলনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা উগ্রতা বা সংঘাতের উপাদানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রশমিত হয়ে যায়। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র যেমনটি বলেছিলেন:


বিজ্ঞাপন

“Darkness cannot drive out darkness; only light can do that. Hate cannot drive out hate; only love can do that.” (অন্ধকার দিয়ে অন্ধকার দূর করা যায় না, কেবল আলোই তা পারে। ঘৃণা দিয়ে ঘৃণা দূর করা যায় না, কেবল ভালোবাসাই তা পারে।)


বিজ্ঞাপন

কমিউনিটি পোলিসিং ও অপরাধ প্রতিরোধে নাগরিকের অংশগ্রহণ (Democratic Policing and Social Defiance)  :  পেশাজীবী ও শ্রমজীবীদের ন্যায়সংগত আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস বা অরাজকতা তৈরি করতে চায়, তারা মূলত ‘সুবিধাবাদী অপরাধী’ (Opportunistic Offenders)। অপরাধবিজ্ঞানের রাউটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি (Routine Activity Theory) অনুযায়ী, যেকোনো অপরাধ সংঘটনের জন্য একটি উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু, একজন আগ্রহী অপরাধী এবং একজন সক্ষম অভিভাবকের (Capable Guardian) অনুপস্থিতির প্রয়োজন হয়।

রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর সীমাবদ্ধতা থাকলে, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সেখানে ‘সামাজিক অভিভাবক’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে তা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নয়। আন্দোলনকারীদের ছত্রছায়ায় মিশে থাকা নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া একটি সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীর দায়িত্ব। এটি সমাজে এক ধরনের ‘কমিউনিটি ওয়াচ ডগ’ বা সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা সহিংসতা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর।

বৈশ্বিক উপাত্ত ও তুলনামূলক চিত্র: অর্থনৈতিক সংকট ও গণ-অসন্তোষ  : অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে শ্রমজীবী মানুষের বিক্ষোভ দমনে বলপ্রয়োগ যে হিতে বিপরীত হয়, তা বিশ্বের বহু দেশের ইতিহাস প্রমাণ করে।

শ্রীলঙ্কার উদাহরণ (২০২২): অর্থনৈতিক ধসের পর সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে তৎকালীন সরকারি দলের ক্যাডার বাহিনী যখন হামলা চালায়, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তা গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়।

তিউনিসিয়ার জেসমিন রেভল্যুশন (২০১১): জনআন্দোলনকে বুলেটের জোরে দমনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত পুরো শাসনব্যবস্থার পতন ডেকে এনেছিল।

উপাত্ত: গলোবাল পিস ইনডেক্স (Global Peace Index) এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব দেশে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের অর্থনৈতিক অসন্তোষকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করতে গেছে, সেসব দেশে দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ২.৫% হ্রাস পেয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

এর বিপরীতে, সংলাপ এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ও সরকার যখন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে, সেখানে রূপান্তর প্রক্রিয়া হয়েছে মসৃণ ও টেকসই।

সুশাসন ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আবশ্যকতা  : বাংলাদেশের সমসাময়িক বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়, মতামত কলাম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যালোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—জনগণ আর কোনো ধরনের পেশিশক্তির রাজনীতি বা ‘হেলমেট সংস্কৃতির’ পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। সমসাময়িক কলামিস্টদের মতে, রাষ্ট্র মেরামতের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে রাজনৈতিক কর্মীদের আচরণে গুণগত পরিবর্তন না এলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অর্জিত বিজয় কলঙ্কিত হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রখ্যাত পণ্ডিত ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘Political Order and Political Decay’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পরিবর্তিত সামাজিক চাহিদার সাথে খাপ খাওয়াতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের পতন অবধারিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখন পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মোক্ষম সময়। কর্মীদের লাঠির বদলে ফুল হাতে সেবার মানসিকতা প্রমাণের মাধ্যমে জনগণের সাথে দলের একাত্মতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন (Good Governance) নিশ্চিত করে।

একটি মানবিক ও স্থিতিশীল আগামীর প্রত্যয়  :  বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সংবেদনশীল। শ্রমজীবী ও পেশাজীবীদের আন্দোলনকে কেবল ‘আইন-শৃঙ্খলার সংকট’ হিসেবে না দেখে একে ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের দাবি’ হিসেবে দেখতে হবে।

সরকারি দল বা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা হবে সংকটের অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে নয়, বরং সংকটের সমাধানকারী (Problem Solver) হিসেবে। আন্দোলনরত ভাইবোনদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, মানবিক সেবা দেওয়া এবং একই সাথে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় নাশকতার বিরুদ্ধে সতর্ক পাহারা বসানো—এটাই হোক একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। এই অহিংস ও মানবিক পথেই নিশ্চিত হবে আমাদের কাঙ্ক্ষিত টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও সুশাসন। (লেখক  : প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান, অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ)

👁️ 15 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *