
নিজস্ব প্রতিবেদক :রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে অবস্থিত বিটিসিএল আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরে আলম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম এবং ছাত্রীদের সাথে অপেশাদার আচরণের পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কোচিং বাণিজ্য চালানো, দফায় দফায় ফি বৃদ্ধি এবং ক্লাসরুমে ছাত্রীদের মানসিকভাবে হেনস্তা করার ঘটনায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

গরমে ফ্যান বন্ধ রেখে ‘সবক’, ছাত্রীদের কটূক্তি : সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষকের পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে। শিক্ষার্থীরা জানায়, নূরে আলম সিদ্দিকী যখন ক্লাসে যান, তখন পুরো সময় ফ্যান বন্ধ রাখতে বাধ্য করেন। প্রচণ্ড গরমে ছাত্রীরা হাঁসফাঁস করলেও তার যুক্তি— ‘গরমে পড়ালেখা ভালো হয়’। শুধু তাই নয়, ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে তিনি বিদ্রূপ করে বলেন, “শ্বশুরবাড়িতে গেলে ফ্যান পাবি কি না ঠিক নেই, এখন থেকেই অভ্যাস কর।” তিনি নিজের ছাত্রজীবনের ফ্যানহীন কষ্টের গল্প শুনিয়ে ছাত্রীদের ওপর এই নিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছেন, যা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম অমানবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিষিদ্ধ কোচিং ও ফি বৃদ্ধির মহোৎসব : হাইকোর্টের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও স্কুলে বাধ্যতামূলক কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য মাসিক ২,০০০ টাকা ফি দিয়ে কোচিং করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর বাইরেও প্রতি বছর সেশন ফি, বেতন ও পরীক্ষার ফি দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে। কোনো অভিভাবক প্রতিবাদ করলে তাদের কপালে জুটছে অপমান। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক নিজেকে প্রভাবশালী দাবি করে অভিভাবকদের হুমকি দিয়ে বলেন, “আমার নামে অভিযোগ দিয়ে লাভ নেই, গুন্ডা-পান্ডা আমার পকেটেই থাকে।”

শিক্ষা সফরেও ‘বাধ্যতামূলক’ কোটা : সর্বশেষ চলতি বছরে তিনি নতুন ফরমান জারি করেছেন। ১ থেকে ২০ রোল নম্বরধারী ছাত্রীদের জন্য স্কুলে আয়োজিত শিক্ষা সফরে যাওয়া বাধ্যতামূলক। এর জন্য জনপ্রতি ২,০০০ টাকা চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। অস্বচ্ছল পরিবারের মেধাবী ছাত্রীদের ওপর এই আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে অভিভাবকরা দিশেহারা।

এছাড়া আদায়কৃত ফি এর চেয়ে অনেক নিন্ম মানের আইডি কার্ড, বার্ষিক ক্যালেন্ডার, ডায়রি প্রদান। এবং স্কুল থেকে খাতা কেনা বাধ্যতামূলক। এসব অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা সন্তানদের এখানে পাঠাই শিক্ষার জন্য, কিন্তু প্রধান শিক্ষকের আচরণ অনেকটা জমিদারের মতো। তার কথা বলার ধরন অত্যন্ত আপত্তিকর। আমরা শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
মোহাম্মদ গোলাম রাব্বি নামে একজন অভিভাবক বলেন,
“স্কুল ছুটি হওয়ার পরে বিশেষ ক্লাস নামে একটা ব্যবসা করতেছে। তারা সেই বিশেষ ক্লাসে মাসে ১৫দিন ক্লাস করায় এবং ২ বিষয়ে ক্লাস নেয়। প্রতি ক্লাসে তার বিনিময়ে ১৫০০, ১৬০০ টাকা নিচ্ছে এটা কী যৌক্তিক? যেখানে স্কুলে মাসে প্রতিদিন ক্লাস করিয়ে (শুক্র, শনিবার এবং সরকারি ছুটি ব্যতিত কোনো বন্ধ না দিয়ে ৯০০-১০০০ টাকা বেতন নিচ্ছে। আর ২টা ক্লাস করিয়ে তাও মাসে ১৫দিন ১৫০০-১৬০০ টাকা নেওয়ার ব্যাপারটা মিলাতে পারলাম না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, “আমি প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলার জন্য কিছু কঠোর নিয়ম করেছি। ফ্যান বন্ধ রাখাটা ধৈর্যশক্তির পরীক্ষা মাত্র। আর কোচিং করানো হচ্ছে রেজাল্ট ভালো করার জন্য। কিছু লোক ব্যক্তিগত আক্রোশে আমার নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসের একজন কর্মকর্তা (কাল্পনিক) জানান, “স্কুলের ফ্যান বন্ধ রাখা বা ছাত্রীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কথা বলা গুরুতর অপরাধ। কোচিং বাণিজ্য নিয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”
বিটিসিএল আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং প্রধান শিক্ষকের এহেন ‘খামখেয়ালি’ বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
