সৌদিতে ফাস্টফুডের চাকরির টোপ, ৬ লাখ টাকা নিয়ে নির্যাতন : মানবপাচার চক্রের সদস্য গ্রেফতার

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  সৌদি আরবে ফাস্টফুডের দোকানে ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন। বিনিময়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় ৬ লাখ টাকা। কিন্তু সৌদিতে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি তো দূরের কথা, ভুক্তভোগীকে একটি বাসায় আটকে রেখে আকামা করে দেওয়ার নামে পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা দাবি করা হয়। টাকা আদায়ে চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত কৌশলে পালিয়ে মরুভূমি এলাকায় আশ্রয় নিলেও সৌদি পুলিশের হাতে আটক হয়ে দেশে ফিরতে হয় তাকে।

এ ঘটনায় মানবপাচারকারী চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সোমবার (৩১ আগস্ট ২০২৬) দুপুরের দিকে বিমানবন্দর থানাধীন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডির মানবপাচার ইউনিট (টিএইচবি)।

গ্রেফতার ব্যক্তির নাম মো. সালমান হোসেন (৩৩)। তিনি সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ থানার শংকরপুর (গাইনপাড়া) এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা মো. শহীদ শেখ এবং মা মৃতা ফরিদা খাতুন।

চাকরির প্রলোভনে ৬ লাখ টাকা :  মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, একটি মানবপাচারকারী চক্র সৌদি আরবে ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে রাজি হলে চক্রটি তার কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা গ্রহণ করে।

এরপর ২০২৫ সালের ৭ জুন ভুক্তভোগীকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো চাকরিতে নিয়োগ না দিয়ে তাকে একটি বাসায় আটকে রাখা হয়।

আকামার কথা বলে আরও টাকা দাবি, নির্যাতনের অভিযোগ :  মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গ্রেফতার সালমান হোসেন চক্রের অন্যান্য সদস্যদের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীকে ওই বাসায় আটকে রাখেন। পরে তার আকামা করে দেওয়ার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা দাবি করা হয়।

টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে ভুক্তভোগীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলেও মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, সুযোগ বুঝে ওই বাসা থেকে পালিয়ে যান ভুক্তভোগী। পরে তিনি একটি মরুভূমি এলাকায় গিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তির আশ্রয় নেন।

মরুভূমি থেকে দেশে ফেরত :  পরে সৌদি পুলিশের মাধ্যমে ভুক্তভোগী আটক হন। এরপর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ২২ জুলাই তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্ত্রী বাদী হয়ে সাভার (ঢাকা) থানায় মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ৩২, তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০২৬। এতে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৬(২)/৭/৮ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

সিআইডির তদন্তে মিলেছে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা :  সিআইডি জানিয়েছে, মামলার প্রাথমিক তদন্তে গ্রেফতার সালমান হোসেনের সঙ্গে ঘটনার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সৌদি আরবে ভুক্তভোগী যে বাসায় আটক ছিলেন, সেটি সালমান হোসেনের বাসা ছিল।

এ ঘটনায় গ্রেফতারের পর এখন মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডির মানবপাচার শাখা। তদন্তকারীরা চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্য, পলাতক আসামি এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে এই চক্রের মাধ্যমে পাচারের শিকার হয়ে থাকতে পারেন—এমন সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগীদেরও শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।

বিদেশে যাওয়ার আগে সতর্ক থাকার আহ্বান :  এ ধরনের প্রতারণা ও মানবপাচার থেকে রক্ষা পেতে বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন কিংবা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি।

বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যথাযথভাবে যাচাই করার জন্য নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সিআইডি আরও জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভিসা পাইয়ে দেওয়ার নামে অস্বাভাবিক অঙ্কের অর্থ দাবি করলে, পাসপোর্ট জিম্মি করে রাখলে কিংবা ভিসা জালিয়াতি, মানবপাচার বা অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহ হলে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সিআইডিকে বিষয়টি জানাতে হবে।

চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানো, এরপর আটকে রেখে অর্থ আদায় ও নির্যাতন—সালমান হোসেনের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এই চক্রের একটি অংশের সন্ধান মিলেছে। এখন তদন্তকারীদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ চক্রটির পুরো নেটওয়ার্ক, দেশি-বিদেশি সহযোগী এবং সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা।

👁️ 38 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *