# বন্ড কমিশনারেটে ৭০–৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দাবি # ৩৫ লাখ টাকার অডিট চুক্তি৷ # প্রায় ১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ধামাচাপার অভিযোগ # কমলাপুর আইসিডিতেও মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ # দুদকে লিখিত অভিযোগ # অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু # নজরদারি ও তদন্তের দাবি অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে #


নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ন্ত্রণাধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ এবং রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
কাস্টমস ক্যাডারের ১১ ব্যাচের এই কর্মকর্তার জন্ম ১ নভেম্বর ১৯৮৬। তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব পালনকালে রাসেল আল মামুনকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী অনিয়মের বলয় গড়ে ওঠে।

বন্ড কমিশনারেট, মোংলা কাস্টম হাউস এবং কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় ঘুষ আদায়, ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা এবং অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
বন্ড কমিশনারেটে ‘মাসোহারা সিন্ডিকেট’—তিন বছরে ৭০–৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ : অভিযোগে বলা হয়েছে, অবিভক্ত কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময় ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বন্ড ব্যবস্থার বিভিন্ন জটিলতা ও ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধের নামে প্রিভেন্টিভ টিম নিয়ে রাতের বেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান ও টহলের আয়োজন করা হতো। পরে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বন্ড ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক ‘মাসোহারা’ নির্ধারণ করে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক কমিশনারের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিতির অভিযোগ : অভিযোগে এনবিআরের এক সাবেক সদস্য ও তৎকালীন অবিভক্ত বন্ড কমিশনারের সঙ্গে রাসেল আল মামুনের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোংলা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে রাসেলের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে তিনি ওই কমিশনারের কথিত ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিতি পান। মোংলা কাস্টমসের মাধ্যমে খালাস হওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশসহ ভারী আমদানিপণ্যের ক্ষেত্রে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
পরবর্তীতে ওই কমিশনার ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে বদলি হয়ে এলে ২০১৮ সালে রাসেল আল মামুনকেও সেখানে নিয়ে আসা হয় এবং হেডকোয়ার্টার্স ও প্রিভেন্টিভের মতো স্পর্শকাতর শাখায় দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে খুলনা আপিল বিভাগ থেকে পুনরায় ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে পোস্টিং নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গুলশান-টঙ্গীতে মাসে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত ‘মাসোহারা’র অভিযোগ : ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে পোশাক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গুলশান ও টঙ্গীর বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলোকে ঘিরে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গুলশানের বিভিন্ন ওয়্যারহাউস থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা এবং টঙ্গী সার্কেল থেকে আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসিক মাসোহারা আদায় করা হতো। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পর্যালোচনা এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
৩৫ লাখ টাকার ‘অডিট চুক্তি’, ধামাচাপা প্রায় ১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ : রাসেল আল মামুনকে ঘিরে সাম্প্রতিক একটি অভিযোগ বন্ড কমিশনারেটের অভ্যন্তরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আনোয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন ‘হোসেন ডাইং’ প্রতিষ্ঠানের অডিট সম্পাদনের ক্ষেত্রে ৩৫ লাখ টাকার গোপন চুক্তি করা হয়।অভিযোগকারীদের দাবি, অডিটের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করার কথা থাকলেও ঘুষের বিনিময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ফাইল অনুমোদন করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে এনবিআরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ার পর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন করে পরিচালিত তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য উঠে আসে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, তদন্তে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আগের অডিটে তা কেন ধরা পড়েনি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা কী ছিল—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
এত গুরুতর অভিযোগের পরও রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কমলাপুর আইসিডিতে ‘সমান্তরাল রাজত্ব’—মাসে ১০–১৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ : বন্ড কমিশনারেটের বাইরে কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালেও রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আমদানিকৃত পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো।
ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে পণ্য আটকে দেওয়া, হয়রানি কিংবা মামলা দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব বিষয়ে তৎকালীন কমিশনার ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
‘টিনের ঘর থেকে রাজপ্রাসাদ’—নামে-বেনামে সম্পদের অভিযোগ : রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে শুধু ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগই নয়, এসব অর্থের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে বলা হয়েছে, সরকারি আয়কর বিবরণীতে যে পরিমাণ সম্পদ প্রদর্শন করা হয়েছে, বাস্তবে তার সম্পদের পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি হতে পারে।
গফরগাঁও, ময়মনসিংহে তার গ্রামের বাড়িতে একসময় সাধারণ টিনের ঘর থাকলেও বর্তমানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ এবং শত শত শতাংশ জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার অভিযোগও করা হয়েছে।
কালো টাকা আড়াল করতে পিতা-মাতা, ভাইবোন ও নিকট আত্মীয়দের নামে সম্পদ কেনাবেচা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পদের উৎস, ক্রয়মূল্য, মালিকানা এবং আয়কর নথিতে ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
পারিবারিক মামলাও আলোচনায় : রাসেল আল মামুনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অভিযোগে বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দাম্পত্য বিরোধের জেরে তার স্ত্রী নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন।
মামলাটি চলমান থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে তা ঝুলিয়ে রেখে দায়িত্ব পালন করছেন—এমন অভিযোগও করা হয়েছে। তবে পারিবারিক ও ফৌজদারি মামলার অভিযোগের ক্ষেত্রে আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতে পৃথকভাবে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদকে অভিযোগ—এবার কি হবে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ? রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলোর সঙ্গে সরকারি রাজস্ব আদায়, বন্ড ব্যবস্থাপনা, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।
বিশেষ করে ২০১৮–২০২১ সময়ে ৭০–৮০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ, গুলশান ও টঙ্গী থেকে মাসিক প্রায় দেড় কোটি টাকা মাসোহারা আদায়ের দাবি, ৩৫ লাখ টাকার কথিত অডিট চুক্তি এবং প্রায় ১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ—এসব তথ্যের স্বাধীন তদন্তের দাবি আরও জোরালো করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা এবং অভিযুক্ত সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ : এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের সরাসরি নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে রাসেল আল মামুনের দায়িত্ব পালনের সময়কার বন্ড প্রতিষ্ঠানের অডিট নথি, প্রিভেন্টিভ অভিযানের রেকর্ড, রাজস্ব আদায়ের তথ্য, আমদানি-খালাস সংক্রান্ত নথি, অভিযোগের ফাইল, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর রিটার্ন এবং তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, ঘুষ, রাজস্ব ফাঁকি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এর বিষয় টা শুধু মাত্র একজন কর্মকর্তার অনিয়ম নয়—রাজস্ব প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে দুদক, এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এখন সময়ের দাবি।
