সামান্তা শারমিনের পদত্যাগঃ এনসিপির রাজনৈতিক সংকট

Uncategorized জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান   :   সূচনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট  : ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে তরুণ সমাজের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক নবজাগরণের প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। পুরোনো শাসকগোষ্ঠীর ফ্যাসিবাদী আচারন, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের যে প্রতিশ্রুতি এনসিপি দিয়েছিল, তা তরুণ প্রজন্মসহ আপামর জনগণকে এক নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু অতি সম্প্রতি দলের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক ও মুখপ্রাত্র সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ সেই সম্ভাবনার মুখে এক বিরাট রাজনৈতিক ধাক্কা এবং নীতিগত সংকটের উদঘাটন করেছে।


বিজ্ঞাপন

পদত্যাগপত্রের প্রারম্ভেই সামান্তা শারমিনের সুস্পষ্ট ঘোষণা: “আজ প্রায় এক বছরের এই সংগ্রামের ইতি ঘোষণা করলাম কারণ এনসিপির পক্ষে তার দলের প্রারম্ভের মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক হওয়া সম্ভব বলে মনে করি না।” এটি কেবল একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত দলত্যাগের বয়ান নয়; বরং এটি দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চার অবক্ষয়, নীতিগত বিচ্যুতি এবং রাজনৈতিক কাঠামোর দেউলিয়াত্বকে নিবিড়ভাবে ব্যবচ্ছেদ করার এক ঐতিহাসিক দলিল।

১. কৌশলগত আপস নাকি আদর্শিক বিচ্যুতি: জামায়াত-এনসিপি সমীকরণ  : গণঅভ্যুত্থানের মূল দর্শন ছিল একটি উদার, মানবিক, সার্বভৌম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের বিনির্মাণ। সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে এনসিপির রাজনৈতিক ও কৌশলগত জোট।

উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রদর্শন ও রাজনৈতিক অপরাধবিজ্ঞানের (Political Criminology) আলোকে যেকোনো বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনে প্রধান শর্ত হলো মিত্র শক্তির নীতিগত স্বচ্ছতা। জামায়াতের মূলভিত্তি, প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপ্রকল্প এবং ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক গণহত্যার অপরাধ স্বীকার না করার প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান—কোনোটাই গণতান্ত্রিক ও সংস্কারমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সামান্তা শারমিন অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে দেখিয়েছেন, জামায়াতের কথিত সংস্কারের আলোচনা মূলত গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে কুক্ষিগত করার এক কৌশলগত ভানমাত্র।


বিজ্ঞাপন

ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র্ (Jean-Paul Sartre) বলেছিলেন: “Commitment is an act, not a word.” (অঙ্গীকার কেবল মুখের কথা নয়, তা কাজের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়।)


বিজ্ঞাপন

এনসিপি যখন নিজের স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন না রেখে জামায়াতের সাথে সমঝোতা করেছে, তখন গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তিসমূহ—যারা স্বভাবজাতভাবেই উদার ও গণতান্ত্রিক—তারা এই রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে এনসিপি তার স্বকীয়তা হারিয়ে জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের অনুঘটক হিসেবে পর্যবসিত হয়েছে।

২. রাজনৈতিক নির্বাচন বনাম ক্ষমতার সমীকরণ: ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া  :  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৭০ কিংবা ১৯৯০ সালের নির্বাচনগুলো ছিল নিছক সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়; বরং প্রতিটি নির্বাচনই ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল রূপান্তরের এক একটি ‘রাজনৈতিক নির্বাচন’। ২০২৬ সালের নির্বাচনটিকেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক নির্বাচনে রূপান্তরের সুযোগ এনসিপির সামনে উন্মুক্ত ছিল।

কিন্তু এনসিপি সেই সুযোগ হাতছাড়া করে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর তৈরি করা ক্ষমতা বদলের ছকে পা দিয়েছে। ‘বড় পার্টির লেজুড়বৃত্তি’ এবং ১১ দলীয় ঐক্যের মতো অগণতান্ত্রিক ও পুরোনো কৌশল বেছে নিয়ে দলটি তার অভ্যুত্থানোত্তর নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছে। শহীদ ওসমান হাদির মতো নির্ভীক যোদ্ধাদের ত্যাগকে জোটবদ্ধতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করাটা কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই নয়, ইতিহাস ও ত্যাগের প্রতি চরম অসম্মানজনক। রাজনৈতিক বিজয়ের চেয়ে কেবল আসনভিত্তিক জয়কে প্রাধান্য দেওয়ায় এনসিপি তার নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা উভয়ই হারিয়েছে।

৩. গণঅভ্যুত্থানে নারীর ভূমিকা ও কাঠামোগত বৈষম্য  : রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের অমোঘ সত্য হলো—জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি অংশকে বাদ দিয়ে কোনো টেকসই রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা, অনুঘটক ও রক্ষাকর্তা। ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে তারা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন।

নারীবাদী রাষ্ট্রচিন্তা ও সুশাসনের মূলকথা হলো পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন (Positive Discrimination) বা ইতিবাচক বৈষম্যের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অর্ধেকের বেশি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। কিন্তু বিজয়ের পর ঐতিহ্যগত রক্ষণশীল শক্তি এবং এনসিপির অভ্যন্তরীণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীদের সেই রাজনৈতিক অর্জনকে অস্বীকার করেছে।

মানবাধিকার নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের সেই অমর বাণীটি এখানে প্রণিধানযোগ্য  : “We cannot all succeed when half of us are held back.” (আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে পেছনে ফেলে আমরা কখনোই সফল হতে পারি না।) এনসিপি আন্দোলনের সংকটময় মুহূর্তে নারীদের নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহার করলেও, বিজয়ের পর তাদের নীতি নির্ধারণী স্থান থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে পুরোনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে।

৪. অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রহীনতা: ‘কাউন্সিল’ এড়িয়ে দল পুনর্গঠন  : সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, যে দল নিজের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারে না, সেই দল রাষ্ট্রে সুশাসন কায়েম করবে—এমনটা বিশ্বাস করা অসম্ভব।

পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ব্যাধি ছিল—স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্ব, পারিবারিক প্রভাব, আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং কাউন্সিল এড়িয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা। এনসিপি সেই একই পুরোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নির্ধারিত সময়ের কাউন্সিল না করে পুনরায় আহবায়ক কমিটি ‘রিস্ট্রাকচার’ (Restructuring) করেছে। এই ধরনের পদক্ষেপ দলের ভেতরের ভিন্নমত দমনের এক চরম অগণতান্ত্রিক বহিঃপ্রকাশ। নিজ দলের অভ্যন্তরে অবাধ নেতৃত্ব নির্বাচনের পরিবেশ না দিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দাবি তোলা যে এক ধরনের রাজনৈতিক দ্বিচারিতা, সামান্তা শারমিন সেটি সাহসের সাথে প্রকাশ্যে এনেছেন।

৫. আগামীর রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা: বিভাজন নয়, ‘বাংলাদেশপন্থা’  :  সামান্তা শারমিনের পদত্যাগপত্রটি কেবল একটি দলের সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর এক ব্লু-প্রিন্ট বা নির্দেশিকা প্রদান করেছে।

দেশকে নানা ধারায় বিভক্ত করার পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলের বিপরীতে আজ প্রয়োজন ‘বাংলাদেশপন্থা’ এবং প্রকৃত জাতীয় ঐক্য। এই জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি হবে:

স্বাধীন ও স্বাধীনচেতা পররাষ্ট্রনীতি: ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে আমেরিকার পক্ষ নেওয়া কিংবা আমেরিকাবিরোধিতা করতে গিয়ে চীনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা ‘বাংলাদেশপন্থা’ নয়। ভারতের সাথে যেমন সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে চুক্তি করতে হবে, তেমনি আমেরিকা বা চীনের সাথেও একই নীতি প্রয়োগ করতে হবে। কোনো দেশের ক্ষেত্রেই তোষণ বা নীরবতার নীতি গ্রহণ করা যাবে না।

জাতীয় পুঁজি ও দেশীয় অর্থনীতির সুরক্ষা: পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ।

অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক রাজনীতি: ধর্ম, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কেবল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের অভিন্ন অঙ্গীকারে তরুণ সমাজকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ করা।

উপসংহার  : সামান্তা শারমিনের পদত্যাগ কেবল এনসিপির কাঠামোগত ও নীতিগত দেউলিয়াত্বকে উন্মোচিত করেনি, বরং তা গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিকে সঠিক ট্র্যাকে ফেরানোর এক প্রজ্ঞাপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট দল বা কিছু নেতার পথভ্রষ্টতা মানেই ২৪-এর রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের চেতনা বা মানুষের আকাঙ্ক্ষার সলিল সমাধি নয়।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে যদি সত্যিই পুরোনো ব্যবস্থার শেকল ভাঙতে হয়, তবে বিগত দিনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আদর্শিক স্বচ্ছতা, নারীর পূর্ণ অধিকার, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং ‘বাংলাদেশপন্থা’কে ধারণ করে নতুন পথ চলতে হবে। সামান্তা শারমিনের এই বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত সেই নতুন রাজনৈতিক অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ও মাইলফলক হয়ে থাকবে।

(লেখকঃ প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ)

👁️ 14 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *