যেখানে প্রকাশ্যে দিনরাত বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হিরোইন। বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হলেও অলৌকিকভাবে অধরাই থেকে যান সীমা। অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে তার ক্ষমতার উৎস এবং গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর কৌশল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিজের মাদক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে সীমা বেছে নিয়েছেন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের। বস্তির অভাবী পরিবারের কিশোরদের দিয়ে তিনি মাদক সরবরাহ ও বিক্রির কাজ করান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হওয়ার আভাস পেলেই এই শিশুরা আগাম খবর পৌঁছে দেয় সীমার কাছে।
আর যখন কোনো আকস্মিক অভিযান হয়, তখন সীমাকে বাঁচানোর জন্য এসব অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোররাই স্বেচ্ছায় ধরা দেয় এবং জেলে যায়। সীমা থাকেন সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকায় জামিনে ছাড়িয়ে এনে তাদেরকে আবারও একই ব্যবসায় নামানো হয়।
সীমার এই মাদক চক্রের শিকড় অনেক গভীরে। সূত্র জানায়, সীমার স্বামী পিংকুও একসময় মহাখালীর অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাথে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়। তবে ভেতরের খবর হলো—পিংকু কেবল নামমাত্র সামনে থাকত, নেপথ্যের মূল কলকাঠি নাড়তেন সীমাই। তখনকার দিনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে পিংকু স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে জেল খাটত, যেন সীমা বাইরে থেকে নির্বিঘ্নে মাদকের সিন্ডিকেট সচল রাখতে পারেন।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের জুন মাসে তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উদ্যোগে ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সাততলা বস্তির এই চিহ্নিত মাদক স্পটটি এক যৌথ অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সেখানে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে কেয়ার সেন্টার)। সেই সময় সীমা আত্মগোপনে চলে গেলেও সাম্প্রতিক ক্ষমতার পালাবদলে তিনি আবার পূর্ণ শক্তিতে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু অসাধু নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের ছত্রছায়ায় তার বেপরোয়া মাদক কারবার আগের চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাউদ্দিন বলেন, “মহাখালী এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি রয়েছে। সীমা বা যে-ই হোক না কেন, মাদক কারবারিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পূর্বেও অভিযান চালানো হয়েছে, দ্রুতই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এই সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল করা হবে।”
অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো (উত্তর) উপ-পরিচালক মো. রাজিউর রহমান জানান, “শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মাদক বিক্রির বিষয়টি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। আমরা সীমা ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যদের তালিকা হালনাগাদ করেছি। তাদের গ্রেপ্তারে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
সাততলা বস্তি ও আশপাশের সাধারণ বাসিন্দারা এখন তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কিশোর সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং বস্তির নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তারা দ্রুত এই মাদক সম্রাজ্ঞীকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।