স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ—দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে একের পর এক অনিয়মের নগ্ন চিত্র উন্মোচিত

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরাতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এবার উঠে এসেছে স্বাস্থ্যখাত ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিস্ময়কর চিত্র। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা পর্যন্ত—দুদকের অভিযানে একের পর এক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে, যা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার ঘাটতির ভয়ংকর ইঙ্গিত দিচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : রোগীর খাবার নিম্নমানের, পরীক্ষাগার কার্যত অচল, চিকিৎসাসেবা প্রদানে হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পিরোজপুর একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অভিযানে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়।

অভিযান পরিচালনা কালে দুদক টিম দেখতে পায়—হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য সরবরাহকৃত খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং পরিমাণে অপর্যাপ্ত। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়।


বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে।


বিজ্ঞাপন

পরীক্ষার রেজিস্টার পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের অভাবে অদ্যাবধি মাত্র ৩টি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা কার্যত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে—যা সরাসরি রোগীদের জীবনঝুঁকির কারণ হতে পারে।

এছাড়াও, হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ পাওয়া গেছে অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা অবস্থায়, যা স্বাস্থ্যবিধির চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে দুদক টিম। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন বরাবর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: নিয়োগে স্বজনপ্রীতির বিস্ফোরক অভিযোগ, সিন্ডিকেট সভার নথি জব্দ : অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও অনিয়মের কালো ছায়া। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর একটি এনফোর্সমেন্ট টিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করেছে।

প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত প্রায় ১৫ মাসে একাধিক সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ, পদোন্নতি এবং স্থায়ীকরণ সম্পন্ন করা হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখিত ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় ৯টি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করা হয়।

চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো— ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন প্রো-ভিসি (একাডেমিক) এর কন্যা,  ক্রিমিনোলজি বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন প্রো-ভিসি (প্রশাসন) এর ভাগ্নে,  বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেয়েছেন রেজিস্ট্রারের ভাই,  এসব নিয়োগ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুদক টিম সংগ্রহ করেছে এবং যাচাই-বাছাই চলছে।

এছাড়া বাংলা বিভাগ এবং ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে বিভাগীয় প্লানিং কমিটির সুপারিশ ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে যোগ্যতা যাচাই, সিলেকশন বোর্ডের মূল্যায়ন পদ্ধতি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্র, প্রেজেন্টেশনসহ প্রতিটি ধাপে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে কিনা—তা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট সকল রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে।

দুদকের কঠোর বার্তা: অনিয়মকারীদের ছাড় নয় : স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—দুই গুরুত্বপূর্ণ খাতে একযোগে দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে স্পষ্ট হয়েছে, অনিয়ম এখন আর গোপন থাকছে না। কমিশন জানিয়েছে, সংগৃহীত রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ শেষে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শেষ কথা : রোগীর খাবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ—রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদকের সক্রিয় অভিযান নতুন আশার সঞ্চার করছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই অনিয়মের শিকড় কতদূর বিস্তৃত? তদন্ত শেষ হলে বেরিয়ে আসতে পারে আরও বিস্ফোরক তথ্য।

👁️ 24 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *