হাজার কোটি টাকার সার, খোলা আকাশে ক্ষয় : ৩৪ বাফার গুদাম প্রকল্পে অনিয়মের ঘনঘটা !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রতি বছর কৃষকের হাতে মানসম্মত সার পৌঁছে দিতে সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমদানি ও দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ সার সঠিক সংরক্ষণের অভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে জমাট বেঁধে নষ্ট হয়। অনেক সময় প্রয়োজনীয় সময়ে সার না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক কৃষক।


বিজ্ঞাপন

এই প্রেক্ষাপটে আপৎকালীন ৮ লাখ টন সার মজুত ও দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে ২০১৮ সালে ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি এখনও অসম্পূর্ণ—বরং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত।

শুরুতেই জট, পরে রিটেন্ডারের ঘূর্ণিপাক : একাধিক সূত্র জানায়, প্রকল্পের শুরুতেই ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা দেখা দেয়। পরে সেই জট কাটলেও ঠিকাদার নির্বাচন নিয়ে শুরু হয় নতুন অধ্যায়।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) “খাই-খাই” মনোভাবের কারণে একাধিকবার রিটেন্ডার করতে হয়েছে। এতে সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়েছে। নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রকল্পের পিডি একাধিকবার বদল করা হয়।


বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় তদবিরে পিডি হিসেবে নিয়োগ পান মো: মঞ্জুরুল হক। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ অভিযোগ হয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তবে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

১৫ গুদাম ‘সমঝোতায়’: শতকোটি কমিশনের অভিযোগ : সম্প্রতি বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো: ফজলুর রহমান ও পিডি মো: মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে আওয়ামী সুবিধাভোগী তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১৫টি গুদাম নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে উল্লেখিত তিন প্রতিষ্ঠান হলো: সালাম কন্সট্রাকশন,,এস এস রহমান এবং মজিদ সন্স কন্সট্রাকশন। সূত্রের দাবি, সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ পাইয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ পেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাফিয়া ডন’খ্যাত ঠিকাদার ও ৬ জেলার গুদাম৷ : সূত্রমতে, কথিত ‘মাফিয়া ডন’খ্যাত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এস রহমানকে ৬টি জেলার ৬টি গুদাম নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে। জেলাগুলো হলো: সাতক্ষীরা, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, মেহেরপুর এবং চুয়াডাংগা এ সকল গুদামের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে আনুমানিক ৬০–৭০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ডিপিপির নিয়ম ভেঙে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিকালে তারা কন্ডিশনাল ব্যাংক কমিটমেন্ট জমা দিলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, প্রতিবাদে বদলি  : সাতক্ষীরার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, নির্ধারিত গ্রেডের পরিবর্তে নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। একইভাবে রড ও সিমেন্টের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আরও অভিযোগ—কোনো সাইট ইঞ্জিনিয়ার নির্মাণকাজে আপত্তি তুললে পিডির মাধ্যমে তাঁকে বদলি বা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে তদারকি ব্যবস্থাই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

নীরবতার রহস্য কী ? প্রকল্পের একাধিক সাইটে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও বিসিআইসির চেয়ারম্যান, পিডি ও ডিপিডি নীরব। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আর সেই কারণেই অভিযোগ পেলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এমনটাই দাবি সূত্রগুলোর।

কৃষক ও রাষ্ট্র—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাফার গুদাম প্রকল্পটি সময়মতো ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হলে—আপৎকালীন সার মজুত নিশ্চিত হতো, প্রান্তিক কৃষক সময়মতো সার পেতেন, সার নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমত, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে বড় অগ্রগতি সম্ভব হতো। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রকল্প বিলম্বিত হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকের ওপরও পড়বে এর সরাসরি প্রভাব।

দাবি উঠছে স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্তের : সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ অডিট ও স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। পাশাপাশি ঠিকাদারি কার্যক্রম, নির্মাণমান ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের সার, রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকা—আর তার মাঝখানে যদি থাকে কমিশনবাণিজ্য ও সমঝোতার ছায়া, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: ৩৪টি বাফার গুদাম প্রকল্প—কৃষকের স্বার্থে, নাকি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের জন্য?

👁️ 50 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *