
নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল থেকে দেশব্যাপী একের পর এক এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সর্বশেষ ফরিদপুর, বরগুনা-পটুয়াখালী ও রাজধানীকেন্দ্রিক পৃথক তিনটি অভিযানে স্বাস্থ্যসেবা, গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিদেশগামী শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থায় ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা নিয়ে হয়রানি, ওষুধ লোপাট ও পরিত্যক্ত এক্স-রে মেশিন : ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা প্রদানে হয়রানি ও নানা অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক ফরিদপুর জেলা কার্যালয় একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযান পরিচালনা কালে দুদক টিম ছদ্মবেশে রোগী সেজে হাসপাতালে প্রবেশ করে চিকিৎসক, নার্সদের সেবা প্রদান, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং রোগীদের জন্য সরবরাহকৃত খাবারের মান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, প্যাথলজি বিভাগ, স্টোররুম, ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থা ও রান্নাঘর সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়।

রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত সব ওষুধ নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে না। ওষুধের মজুদ ও বিতরণ সংক্রান্ত রেজিস্টার পর্যালোচনায় একাধিক অনিয়ম ধরা পড়ে।

পরিদর্শনকালে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ এক্স-রে মেশিনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, যা দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকার ইঙ্গিত দেয়। সংগৃহীত রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দুদক কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে এনফোর্সমেন্ট টিম।
বরগুনার আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নে ‘কাগুজে উন্নয়ন’: ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন, রাস্তার অস্তিত্ব নেই ! অন্যদিকে বরগুনা জেলার সদর উপজেলার ৫নং আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়ন পরিষদে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে প্রায় ৩৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক পটুয়াখালী জেলা কার্যালয় অভিযান পরিচালনা করে।
পরিদর্শনে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি মাটির রাস্তা সংস্কারের জন্য ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা সরকারি বরাদ্দ দেয়া হলেও বাস্তবে একটি রাস্তারও কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। অথচ প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ—রাস্তা নেই, কিন্তু টাকা উত্তোলন সম্পন্ন ! এই ঘটনায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক টিম।
এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় বাজার এলাকায় স্থাপনের কথা থাকা ৩৬টি সিসি ক্যামেরার বিপরীতে সরেজমিনে মাত্র ৫-৬টির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বাকি ক্যামেরাগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। সংগৃহীত রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে কমিশনে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
ভুয়া ভিসায় মানবপাচার: রিক্রুটিং এজেন্সি ও সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ : দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের আশায় প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে রাজধানীকেন্দ্রিক আরেকটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে দুদক প্রধান কার্যালয়।
অভিযানে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, রিক্রুটিং এজেন্সি ও থানাগুলো থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক তথ্যে ভুয়া ভিসার মাধ্যমে মানবপাচার, প্রতারণা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
নথি পর্যালোচনা শেষে কমিশনের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে জানিয়েছে এনফোর্সমেন্ট টিম।
দুদকের বার্তা স্পষ্ট: দুর্নীতির আশ্রয় আর মিলবে না : স্বাস্থ্যসেবা থেকে গ্রামীণ উন্নয়ন কিংবা বিদেশগামী শ্রমিক নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
সাম্প্রতিক এই তিন অভিযানে উঠে আসা তথ্য প্রমাণ করে, সরকারি অর্থ লুটপাট ও জনগণের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে দুদক এখন মাঠে সক্রিয় এবং আপসহীন।
অভিযান-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে কমিশন সূত্র জানিয়েছে।
