
জুয়েল খন্দকার (কুমিল্লা) : কুমিল্লার জাঙ্গালীয়া এলাকায় প্রিপেইড মিটার স্থাপনের পরও এক গ্রাহককে ৩৫ হাজার টাকার তথাকথিত ‘এনালগ বকেয়া বিল’ ধরিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে—অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এক গ্রাহককে আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম হয়রানির মুখে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর জাঙ্গালীয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগী কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামের মৃত বাবুল হোসেনের ছেলে মোঃ আনোয়ার হোসেনের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ রেজাউল কবির এই নোটিশ প্রেরণ করেন।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ : নোটিশে অভিযুক্ত করা হয়েছে—
পারভেজ আহম্মেদ, নির্বাহী প্রকৌশলী, পিডিবি, জাঙ্গালীয়া, কুমিল্লা, আইয়ুব আলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী, পিডিবি, জাঙ্গালীয়া, আনিছ, মিটার রিডার (শ্রীমন্তপুর এলাকা) এনালগ থেকে প্রিপেইড—তবু ‘বকেয়া’ কোথা থেকে?

নোটিশ সূত্রে জানা যায়, আনোয়ার হোসেন তার পিতার আমল থেকে মিটার নং- ৩১৬৯৪৬১২ ব্যবহার করে আসছিলেন। গত বছরের ৭ অক্টোবর বকেয়া ১০,২৮৫ টাকা পরিশোধের পর বিদ্যুৎ অফিসের পিরাপিরিতে এনালগ মিটার জমা দিয়ে প্রিপেইড মিটার (নং- ১২১০০৯৯৬৬৮০) স্থাপন করেন।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী প্রিপেইড মিটারে পূর্বের বকেয়া থাকার কথা নয়। কিন্তু চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই ৩৫,১৭৯ টাকার একটি এনালগ বকেয়া বিল দেখিয়ে তার সংযোগ ‘লক’ করে দেওয়া হয়।
প্রশ্ন উঠেছে— এনালগ মিটার জমা দেওয়ার পরও কীভাবে নতুন করে বকেয়া তৈরি হলো ? প্রিপেইড সিস্টেমে রিয়েল-টাইম ব্যালেন্স থাকলে ‘ভুতুড়ে বিল’ দেখানোর সুযোগ কোথায় ?
“ইউনিট জমিয়ে রেখে কম উল্লেখ”—স্বীকারোক্তির দাবি :
ভুক্তভোগীর দাবি, বিষয়টি জানতে চাইলে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আইয়ুব আলী তাকে বকেয়া পরিশোধের পরামর্শ দেন। পরে মিটার রিডার আনিছের সঙ্গে কথা বললে তিনি নাকি স্বীকার করেন—“মিটারে ইউনিট জমিয়ে রেখে কম উল্লেখ করা হয়েছিল।”
লিগ্যাল নোটিশে এই বক্তব্যকে গুরুতর অনিয়ম ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, ইচ্ছাকৃতভাবে ইউনিট কম দেখানো হলে তা সরাসরি রাজস্ব ক্ষতি ও গ্রাহক প্রতারণার শামিল।
টাকা দিলেও সংযোগ বন্ধ ! বাধ্য হয়ে আনোয়ার হোসেন গত মাসে কিস্তিতে মোট করসহ ৩৬,৪৬০ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এই সময় পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ফ্রিজে সংরক্ষিত প্রায় ৩২,১০০ টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য পচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তিনি চরম আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানবেতর পরিস্থিতির মুখে পড়েন।
ক্ষমতার অপব্যবহার নাকি সিস্টেমিক দুর্নীতি ? নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে—সরকারি কর্মচারী হয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে এক গ্রাহককে হয়রানি করেছেন। নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দায়েরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বড় প্রশ্নগুলো রয়ে গেল : প্রিপেইড মিটার স্থাপনের আগে চূড়ান্ত সমন্বয় (ফাইনাল রিকনসিলিয়েশন) কি করা হয়েছিল ? এনালগ থেকে প্রিপেইডে রূপান্তরের সময় ডাটাবেইজ হালনাগাদে গাফিলতি ছিল কি? একজন মিটার রিডারের একক সিদ্ধান্তে এমন আর্থিক জটিলতা তৈরি সম্ভব, নাকি এর পেছনে বড় চক্র কাজ করছে?
স্থানীয় গ্রাহকদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, প্রিপেইড মিটারকে স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত সেবা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে যদি এমন ‘ভুতুড়ে বিল’ আসে, তবে সাধারণ গ্রাহকের নিরাপত্তা কোথায়?
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্তে নামে কিনা—সেদিকেই এখন নজর স্থানীয়দের। বিদ্যুৎ সেবার মতো মৌলিক খাতে যদি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তবে তা শুধু একজন গ্রাহকের ক্ষতি নয়—প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুরো সেবাব্যবস্থার
