
নিজস্ব প্রতিনিধি (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রাম বন্দর—দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক আতঙ্কজনক বলয়। বন্দরের এস্টেট বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে উঠেছে ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ ইজারা, প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভাঙার গুরুতর অভিযোগ।

বসুন্ধরা জেটি অনুমোদন ঘিরে ৫০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ : বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় বসুন্ধরা গ্রুপের প্রস্তাবিত জেটি নির্মাণ অনুমোদনের ফাইল প্রসেসিংয়ের দায়িত্ব পান ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) শিহাব উদ্দিন।
অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি অন্তত ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। বিষয়টি নিয়ে বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষে উচ্চপর্যায়ের উত্তপ্ত আলোচনা পর্যন্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়।

ইনকনট্রেড ইজারা : ৪০০ কোটি টাকার জমি, দরপত্র ছাড়া চুক্তি ! ২০২৪ সালে আলোচিত এক ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৮ একর মূল্যবান জমি দরপত্র ছাড়াই ইনকনট্রেড লিমিটেডকে ইজারা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাদের তালিকায় ছিলেন তৎকালীন বন্দর চেয়ারম্যান এম সোহায়েল এবং ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) শিহাব উদ্দিন।

পরবর্তীতে বিষয়টি তদন্তের মুখে পড়ে এবং নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই ইজারা বাতিল করা হয়। এরপর শিহাব উদ্দিনকে এস্টেট বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মাতারবাড়ি বন্দরে সংযুক্ত করা হয়।
দুদকের তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ : ২০২৪ সালের মার্চ মাসে দুদকের চার সদস্যের একটি দল চট্টগ্রাম বন্দরে এসে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন।
একাধিক কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ :
অভিযোগপত্র অনুযায়ী— এসএ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ জেটি ভাড়া সংক্রান্ত ফাইলে ১০ লাখ টাকা, কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেড জেটি অনুমোদনে ১০ লাখ টাকা, এমইবি ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইলিয়াস ব্রাদার্স ফাইল নবায়নে ৫০ লাখ টাকা। এসব লেনদেন নাকি সম্পন্ন হয়েছে তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে—যিনি স্থানীয়ভাবে “হাফেজ” নামে পরিচিত।
প্রভাব বিস্তার ও প্রশাসনকে চাপে রাখার অভিযোগ : বন্দর সূত্রে অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে শিহাব উদ্দিন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় পদোন্নতির চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমনকি কিছু কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে বন্দরকে অস্থিতিশীল করতে একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বিষয়েও অভিযোগ এসেছে, যা প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বন্দর প্রশাসনের কঠোর অবস্থান বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে বিতর্কিত ইজারা বাতিল করেছেন এবং এস্টেট বিভাগে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যবস্থা নিয়েছেন।
বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, “বন্দর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে দুর্নীতির কোনো জায়গা নেই। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের হওয়া জরুরি।”
শেষ কথা : চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতি নয়—রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত।
এখন নজর দুদক ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার দিকে— দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, নাকি সবই প্রভাবশালী মহলের ছায়াযুদ্ধ—তা সময়ই বলবে।
